জন্মদিনে আলম শাইনের সঙ্গে আলাপচারিতা

বাংলাবাজার পত্রিকা
ঢাকা: বাংলাদেশে প্রকৃতি ও পাখি নিয়ে যে কয়জন লেখালেখি করেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন আলম শাইন। তার পুরো নাম শামছুল আলম। ডাকনাম ছিল শাহীন। কিন্তু বাবা-মা ‘হীন’ শব্দ উচ্চারণ না করে ‘ইন’ শব্দ উচ্চারণ করতেন।

এতে তার মধ্যে এক ধরণের ভালোলাগা কাজ করতো। বাবা-মায়ের মুখে নিজের নামের ভিন্ন উচ্চারণ কতোটা মধুর তা পৃথিবীর কোন ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাইতো যখন লেখালেখি শুরু করেন তখন শামছুল বাদ দিয়ে ‘আলম শাহীন’ লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ‘আলম শাইন’ লেখা শুরু করেন। তারপর থেকে তিনি নামের মূল অংশ শামছুল আলম বাদ দিয়ে পরিচিত হন আলম শাইন নামে।

বাংলাদেশের যে কয়জন বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ আছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার অসংখ্য লেখা দেশ বিদেশে সমাদৃত হয়েছে।

১৮ জানুয়ারি তার জন্মদিন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতেছিল বাংলাবাজার পত্রিকা। সেই আলাপচারিকার চুম্বক অংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো।

বাংলাবাজার পত্রিকা: শুরুতেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা রইল। সঙ্গে জানতে চাইব এটি আপনার কততম জন্মদিন?
আলম শাইন: ধন্যবাদ। ঊনপঞ্চাশ পেরিয়ে আজ পঞ্চাশে পা রাখলাম। অবশ্য এটি বাংলা সন-তারিখের হিসেব মোতাবেক। ৫মাঘ ১৩৭৭ সালের মঙ্গলবার আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছি। সে মোতাবেক ইংরেজী তারিখ হচ্ছে ১৯৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি। কিন্তু বাবার ডায়েরিতে লেখাছিল ৫ মাঘ ১৯ জানুয়ারি। যা এখন ১৮ জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে। তবে আমি ৫ মাঘই জন্ম তারিখ হিসেবে ধরছি।

বাংলাবাজার পত্রিকা: যে গাঁয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন সেটি কোন জেলায় অবস্থিত?
আলম শাইন: লক্ষ্মীপুর জেলা। রায়পুর উপজেলার পূর্বচরপাতা গ্রামে আমি জন্ম গ্রহণ করেছিলাম।

বাংলাবাজার পত্রিকা: ভাই-বোনদের মধ্যে আপনার অবস্থান কততম? পারিবারিক বিস্তারিত জানতে চাই
আলম শাইন: আমরা দুই ভাই এক বোন। তারমধ্যে আমি বড়। ছোট ভাই এ বি এম রিপন দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি। আর বোন গৃহিনী।অপরদিকে এক ছেলে দুই কন্যা সন্তান রয়েছে আমার। ছেলে (রাইন আলম) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় অধ্যয়নরত। বড় মেয়ে (অরণ্য) এসএসসি পরীক্ষার্থী। স্ত্রী হাসিনা আক্তার গৃহিনী। সবার ছোট লাবণ্য।

বাংলাবাজার পত্রিকা: এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। দৈনিক মানবকণ্ঠে বিপ্রতীপ শিরোনামে একটি কলাম লিখছেন; যা ব্যপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে কিছু জানতে চাই।
আলম শাইন: বিপ্রতীপ শিরোনামের কলামটি ভিন্নধর্মী লেখা ছিল। মূলত ওই পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক জোবায়ের আহমেদ নবীন ভাইয়ের (তিনি এখন বাংলাদেশ জার্নাল-এর ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক) উদ্যোগে বিশেষ কলামটি শুরু করি। এ জন্য তার যথেষ্ট প্রেরণা ছিল। যে লেখা পাঠক মহলেও বেশসমাদৃত হয়েছিল তখন।

বাংলাবাজার পত্রিকা: জানতে চাই জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে আপনার লেখা বই ‘৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস’ সম্পর্কে।
আলম শাইন: ‘৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস’নির্বাচিত কলাম নিয়ে বই। প্রবন্ধগুলো ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, সমকাল, ভোরের কাগজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, মানবকণ্ঠ ও আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল। বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করছি।

আমরা জানি, ধীরে ধীরে বরফযুগের সমাপ্তি ঘটিয়ে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। চলতি বছর ৮ জুন, ২০১৯ সালে কুয়েতের তাপমাত্রা বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সেখানেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। ওই তাপে গাড়ির চাকার টায়ারও গলে গেছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ছায়াযুক্ত স্থানেও ছিল ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। যেই তাপমাত্রায় একজন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে পড়ে।

উদাহরণহচ্ছে, তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলেই ডিমসিদ্ধ হতে থাকে, সেক্ষেত্রে ৬৩ ডিগ্রি থেকে ৭০ ডিগ্রি অতিনিকটেই। কাজেই আমরা বলতে পারি, এটি বিশ্বের জন্য অতি ভয়ানক একটি অশনিসংকেত। এই বইয়ে জলবায়ু বিপর্যয়ের বিভিন্ন ভয়ানক দিক তুলে ধরেছি।

বাংলাবাজার পত্রিকা: ফেসবুকে বইটির মুদ্রণ সংখ্যা নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন, সে বিষয়ে খুলে বলুন?
আলম শাইন: অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি বইটির প্রথম মুদ্রণ সংখ্যা হয়েছে ১০ হাজার কপি। পরবর্তীতে ৫০ হাজার কপি বা তারও অধিক। এটি শরৎপাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হলেও পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ আন্দোলনের অর্থায়নে মুদ্রিত হচ্ছে। বই বিক্রির লভ্যাংশ বৃক্ষরোপনের ক্ষেত্রে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সবুজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বাপ্পি সরদার। শুধু তাই-ই নয়, বইটি তিনি ইংরেজি অনুবাদের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আরেকটি কথা হচ্ছে, এই বইটি থেকে আমি রয়েলেটি না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বাংলাবাজার পত্রিকা: আপনার রচিত উপন্যাস, গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা কত তা জানতে চাই।
আলম শাইন: মোট গ্রন্থসংখ্যা ১৪টি। উপন্যাস ৯টি। রম্য গ্রন্থ ৩টি। ভ্রমণ ১টি। ছোটগল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ফিচারের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০টি। তন্মধ্যে পাখি নিয়ে ফিচারের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। লেখাগুলো দেশের প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে, ওরাই এখন মুক্তিযোদ্ধা, ঘুষনিয়ে ঘুষাঘুষি, দৌড়, সুন্দরবনে দু’রাত, চিতাশালার মোড়ে, ওস্তা, মাইট্যা ব্যাংকের গভর্নর, নিষিদ্ধ বাড়ি, নিশিকন্যা, আমি খাই জুতা, নীলকুঠি হ্রদ, লালবালির দ্বীপ, ঘুণে খাওয়া বাঁশি ও ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বাংলাবাজার পত্রিকা: ‘হাজাম’ সম্প্রদায় নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন, সে বিষয়ে এবং পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়ে কিছু জানতে চাই।
আলম শাইন: হাজাম সস্প্রদায় নিয়ে লেখা উপন্যাসটি দৈনিক জনকণ্ঠ ও কলকাতার উদ্দালক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উদ্দালক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, এটি নাকি দুইবাংলায় মিলিয়ে লেখা প্রথম হাজাম সম্প্রদায় নিয়ে লেখা উপন্যাস। এরআগে হাজাম সম্প্রদায় নিয়ে গল্প লেখা হলেও আজ অবধি কেউ উপন্যাস লিখেননি। পরবর্তীতে উপন্যাসটি ‘ড. মঞ্জুশ্রী সাহিত্য-২০০৮’ পুরস্কারেও ভূষিত হয়। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবর্তিত ‘বোস্টন বাংলা নিউজ অ্যাওয়ার্ড-২০১৫’ ভূষিত হয়েছি। ভূষিত হয়েছি ‘ক্যানভাস অব বাংলাদেশ বিজয় দিবস সম্মাননা-২০১৭।’ জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও জনসচেতনা বৃদ্ধির প্রয়াসে আমাকে গ্রিনম্যান অ্যাওয়ার্ডে-২০১৯ ভূষিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এটি দেশের প্রথম গ্রিনম্যান অ্যাওয়ার্ড।

বাংলাবাজার পত্রিকা: বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেন, প্রকৃতি নিয়ে লেখেন, সাহিত্য চর্চাও অব্যাহত রেখেছেন। কোনটি নিয়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?
আলম শাইন: সত্যি বলতে আমি দু’টি বিষয়েই সমান আগ্রহী। এই দু’টি বিষয় নিয়ে লিখতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আসলে এখানে আগ্রহটাই প্রধান। আপনি যে কাজই করেন না কেন, তা আগ্রহ নিয়ে করতে হবে। তাতে করে এক সময় শীর্ষে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাবাজার পত্রিকা: লেখালেখিতে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন কিনা?
আলম শাইন: খুব হয়েছি। যার জন্য ভেতরে জিদও বেঁধেছে। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার তাগিদ বোধ করছি। ভালো কিছু করতে পারলে প্রতিবন্ধকতাকেই প্রেরণা হিসেবে নিব, আমার যাবতীয় ভালো অর্জন ওই শব্দটাকেই উৎসর্গ করব।
প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের কল্যাণে আসতে পারে সেটি প্রমাণ করে দেব সুযোগেই।

বাংলাবাজার পত্রিকা: প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলুন
আলম শাইন: বন-বনানী-বন্যপ্রাণী আমাকে সব সময় হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেই ডাকে আমি নিজকে ধরে রাখতে পারি না। সময় সুযোগ পেলে প্রকৃতির সন্ধানে ছুটে যাই তাই। সেটি দূরে কোথাও কিংবা আশপাশের গ্রামাঞ্চলও হতে পারে।

বাংলাবাজার পত্রিকা: জীবনে যা ভুলতে চান না
আলম শাইন: লক্ষ্মীপুর ডায়েরি নামে ৬২৪ পাতার একটি গ্রন্থে আমার সংক্ষিপ্ত জীবনী দেখে আমি ভীষণ অভিভূত হয়েছি বছর খানেক আগে। গ্রন্থপ্রণেতা হচ্ছেন তরুণ সাংবাদিক এবং মেধাবি শিক্ষক সানাউল্লাহ সানু। উক্ত গ্রন্থে তিনি জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি দেড় শতাধিক গুণীজনের সঙ্গে আমাকেও মলাটবন্দী করেছেন।

বাংলাবাজার পত্রিকা: অনেক কিছু জানা গেল, ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
আলম শাইন: ধন্যবাদ বাংলাবাজার পত্রিকাকেও।