শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা হামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড

চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর আহতদের খোঁজ-খবর নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা- ইন্টারনেট

বাংলাবাজার পত্রিকা
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে ৩২ বছর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জনসভার আগে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

চট্টগ্রামের বিশেষ জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ মো. ইসমাইল হোসেন সোমবার বিকেলে চার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডিতরা হলেন- চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি অঞ্চলের তৎকালীন পেট্রল ইন্সপেক্টর জে সি মণ্ডল, কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, শাহ মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন। প্রথম জন পলাতক আছেন।

রায়ের পর এই আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদানই সমীচীন বলে আদালত জানিয়েছেন।

আমরা এই শাস্তিই প্রার্থনা করেছিলাম। নানা কারণে বিচার বিলম্বিত হলেও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলে মনে করি।

রায় ঘোষণার আগে বিচারক বলেন, ৫৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এ মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সাক্ষী। নিরপত্তাজনিত কারণে তিনি সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেননি। চার আসামিই সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রমাণ হয়েছে কোনো ধরনের সহিংস ঘটনার আগেই কিলিং শুরু হয়।

পাশাপাশি বিনা উসকানিতে গুলি করে শত শত নিরীহ লোককে আহত করায় বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি বন্দরনগরীর লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভার দিন বেলা ১টার দিকে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাক আদালত ভবনের দিকে এগোলে নির্বিচার গুলি ছোড়া শুরু হয়।

আইনজীবীরা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে ঘিরে মানববেষ্টনী তৈরি করে তাকে নিরাপদে আইনজীবী সমিতি ভবনে নিয়ে যাওয়ায় তিনি রক্ষা পান।

৩২ বছর আগের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, মূল্য লক্ষ্য ছিলেন নেত্রী। পুলিশ সদস্য সাক্ষীরা আদালতে বলেছেন, আগের রাতের সভাতে ঘটনার পরিকল্পনা হয়।

দীর্ঘদিন পরে রায় হলেও আনন্দিত এ কারণে যে স্বৈরাচারীভাবে দমন-পীড়ন করে গণতন্ত্রকে দমনের যে ষড়যন্ত্র এবং তাদের রক্ষায় যারা চেষ্টা করেছিল তাদের বিচার হয়েছে—এটা দৃষ্টান্তমূলক।

ওই ঘটনায় মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আবদুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত হোসেন নিহত হন।

নিহতদের কারও লাশ পরিবারকে নিতে দেয়নি স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার; সবাইকে বলুয়ার দীঘি শ্মশানে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এরশাদের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করলেও বিএনপি সরকারের সময়ে মামলার কার্যক্রম এগোয়নি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। দুই দফা তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর আট পুলিশ সদস্যকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে পাঁচজন এখন জীবিত আছেন। মৃত আসামিরা হলেন—সিএমপির কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা এবং কনস্টেবল আবদুস সালাম ও বশির উদ্দিন।

মামলায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শেফালী সরকার, সাংবাদিক অঞ্জন কুমার সেন ও হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, সুভাষ চন্দ্র লালা, অশোক কুমার বিশ্বাস, হাসনা বানু, মাঈনুদ্দিন, আবু সৈয়দ এবং অশোক বিশ্বাস অন্যদের মধ্যে সাক্ষ্য দেন।

গত ১৪ জানুয়ারি ৫৩তম সাক্ষী আইনজীবী শম্ভুনাথ নন্দীর সাক্ষ্য দেয়ার মধ্য দিয়ে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

ওইদিন আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ১৯ জানুয়ারি দিন ঠিক করেন। রোববার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন শেষে পাঁচ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

পরে আদালত আসামি পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য সোমবার দিন রেখেছিলেন। কিন্তু আসামিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন না করায় এদিনই আদালত রায় ঘোষণা করেন।