সীমান্ত হত্যা আর কত?

ওয়াসিম ফারুক
বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বসন্ত কাল চলছে। দুই দেশের সরকারই বজ্রকণ্ঠে বলে আসছে বন্ধুত্বের অবস্থান সর্বকালের সেরা পর্যায়ে। অথচ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সরকারের এমন মন্তব্যকে কতটুকু নীতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে সেটাই একটা বড় প্রশ্ন।

আমাদের দেশের কিছু অংশ ছাড়া প্রায় পুরো সীমান্তই ভারত বেষ্টিত। ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক কারণে অবশ্যই ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ভারত একটি বিশেষ জায়গা দখল করেছে।

১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত সহযোগিতা আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণকরি। তবে সেই কৃতজ্ঞতার জের ভারত আমাদের কাছ থেকে অনেক ভাবেই আদায় করে নিচ্ছে।

শুধুমাত্র বাংলাদেশ-ভারত এই দুই দেশের সীমান্তেই কি কড়াকড়ি? বিশ্বের আরো অনেক দেশের সীমান্তে কড়াকড়ি আছে, থাকবে৷

কিন্তু হতাশার জায়গাটা হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা। এই মুহুর্তে যদি একজন সুস্থ সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করা হয় পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় সীমান্তের মধ্যে কোনটি মানবিক বিবেচনায় ভয়ংকর।

বিনা দ্বিধায় এক বাক্যে সবারই মুখ থেকে একই উত্তর আসবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ভারত-বাংলাদেশ ভিন্ন রাষ্ট্র হলেও সম্পর্কটা একটু অভিন্ন।

বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা যদিও নির্ধারণ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে সেই ১৯৪৭ সালে। রাষ্ট্র ভাগ হলেও সম্পর্কটা তেমন ভাগ হয়নি। আমাদের অনেকেরই প্রচুর নিকট আত্মীয় ভারতে আছেন বিশেষ করে করে পশ্চিমবঙ্গে। ভারতীয়দের বেলায়ও একই।

রাষ্ট্র আত্মীয়তার আত্মার সম্পর্ক বিভেদ করতে পারে না। ভারতে নতুন বিতর্কিত আইন নিয়ে যেই ক্ষোভ বিক্ষোভ দেখছি তার অন্যতম কারণ ই হলো আত্মীয়তা ও সম্প্রতি রক্ষা।

বলছিলাম সীমান্ত হত্যার কথা। সোস্যাল মিডিয়া সুত্রে আমার বন্ধু অ্যাক্টিভিস্ট কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাওগাতা চক্রবর্তীর সাথে কথা হচ্ছিল সীমান্ত হত্যা নিয়ে।

তিনিও এ ব্যাপারে অনেকটা ক্ষোভ নিন্দা প্রকাশ করে বললেন, দাদা এটা একটা জঘন্যতম নিন্দনীয় অপরাধ আইন কি বলে এটা বড় বিষয় না মুখ্য মানবতা।

একজন মানুষ যাদি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে তার জন্য চাইলে যে কোন দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পারে।

একটি মানুষকে গুলি করে হত্যা এটা কোন রাষ্ট্রীয় সভ্যতায় পরে? বাংলাদেশ-ভারতের মানুষেরা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করছে যুগ যুগ ধরে।

কারণ সীমান্তবর্তী অনেক মানুষের-ই সীমানার এপার ওপারে নিকটবর্তী আত্মীয় আছেন। আগেই বলেছি আত্মীয়ের আত্মারটানের কোন সীমানা নাই।

সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষকদের অনেকের-ই জমিজিরাত সীমান্তের মাঝামাঝি তাই অনেক সময় কৃষকেরা চাষাবাদ করতে গিয় অসাবধানতাবশত সীমানা অতিক্রম করে ফেলেন।

এমন কি কৃষকের গরু ছাগল চড়ানোর সময়ও প্রাণীগুলো সীমানা অতিক্রম করে। সীমান্তবর্তী নদীগুলিতে জেলেরা মাছ ধরতে গেলে সীমানা ঠিক থাকে না।

এই বিশেষ কারণতেই সাধারণত আমাদের দেশের মানুষ ভুলে সীমান্ত অতিক্রম করেন। ভারত যেহেতু আমাদের পাশ্ববর্তী অন্যতম বড় দেশ তাদের সাথে আমাদের বানিজ্যিক সম্পর্ক সেই আদি যুগ থেকেই।

অবৈধ বাণিজ্যের কারণেও প্রচুর মানুষ অবৈধভাবে এপার-ওপার আসা যাওয়া করেন। আর এ কারণেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করছে আমাদের দেশের মানুষ।

গত ৯ জানুয়ারি ২০২০ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওয়াহেদপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের গুলিতে মো. সেলিম ও মো. সুমন নামের দুই বাংলাদেশী নিহত হন।

সংবাদ মাধ্যমের খবরে যতটুকু জানায়, সেলিম ও সুমন দুই জনই রাখাল। তারা ভারত থেকে গরু আনার জন্য ভারতীয় সীমান্তের প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতর পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার টিকলিচর নামক এলাকায় পৌঁছলে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার চাঁদনিচক বিএসএফ ফাঁড়ির সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

এতে ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো নিহত সেলিমের বাবাও ২০০৮ সালে পদ্মার জলসীমায় অনুপ্রবেশকারী বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

দুঃখজনক হলে সত্যি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে কেউ নাকি মারা গেলে আইনি ঝামেলা এড়াতে গোপনে মরদেহ পদ্মার চরে পুঁতে ফেলা হয়।

গত ১০ জানুয়ারি ২০২০ লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী সীমান্তে তামাক ক্ষেতে কাজ করার সময় আবু সাঈদ নামের এক কৃষকে ক্ষেত থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে সীমান্তে কাছে ফেলে রেখে যায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। পরে অবশ্য পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ভারতীয় বাহীনি সাঈদের লাশ বাংলাদেশের বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে।

সীমান্তে ভারতীয় রক্ষীবাহিনীর হত্যার যে হিসাব, তা সভ্য জাতি হিসেবে গ্রহণ করা কষ্টকর। ২০১৯ সালের ১১ জুলাই আমাদের জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সীমান্ত হত্যার একটি চিত্র তুলে ধরেন। তার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২০০৯ সালে কমপক্ষে ৬৬ বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে নিহত হন।

২০১০ সালে ৫৫, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন এবং ২০১৮ সালে তিনজন নিহত হন।

তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ৬৬ জন এবং ২০১৮ সালে সর্বনিম্ন তিনজন বিএসএফ এর গুলিতে নিহত হন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে ২০১৯ সালে সীমান্তে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে গুলিতে ৩৭ জন এবং নির্যাতনে ছয় জন। আহত হয়েছেন ৪৮ জন। অপহৃত হয়েছেন ৩৪ জন।গত বছরের তুলনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর হাতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিনগুন।

সম্প্রতি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও ভারতীয় সীমান্তবাহিনী এমন হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

২০১১ সালের ৭ই জানুযারি কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তোলে৷

বিএসএফ-এর গুলিতে ফেলানী হত্যার পর বাংলাদেশের দাবির মুখে ২০১৪ সালে দিল্লিতে বিএসএফ ও বিজিবির মহাপরিচালকদের বৈঠকের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছিল।

সেই সমঝোতার শুধু দিল্লী আর ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে এর বাস্তব প্রভাব ভারত-বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তের কোথাও পরেনি।

আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয়দের জন্য যথেষ্ট উদার আমাদের সমুদ্রে অবৈধভাবে মাছ ধরতে এসে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে ভারতীয় জেলেদের উদ্ধার করে যত্ন সহকারে তাদের নিজ দেশে প্রেরণ করে অবশ্যই মানবিকতার প্রমাণ দিয়েছি।

আমাদের দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কোন এক হিসাবে দেখেছিলাম বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ ভারতীয় নাগরিক কাজকরছে যাদের অধিকাংশ ই অবৈধ।

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী হাতে বাংলাদেশের নগরিক হত্যা নিয়ে যেহেতু আমার লেখা তাই কিভাবে এই সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা যায় এটাই ভাবতে হবে।

সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা সেই সাথে কথিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বাস্তবায়ন।

সীমান্ত থাকবে এটা যেমন সত্য, সীমান্তে অবৈধ যাতায়াতও থাকবে এটাও বাস্তব। তবে আমি কোনোভাবে সীমান্তে অবৈধভাবে পারাপারকে সমর্থন করি না বা করতে পারিও না।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ইউরোপের দেশগুলোর মতো খুলে দেয়া হবে সেটা অলিক কল্পনা৷ বরং কেউ অবৈধ পথে সীমান্ত পাড়ি দিতে চাইলে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা-ই হবে একটি মানবিক সভ্যরাষ্ট্রের কর্তব্য ৷

অবৈধ সীমান্ত পারাপারের নামে ভারত বাংলাদেশ সীামান্তে যে রক্তের হোলি খেলা চলছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

এই হত্যার বিরুদ্ধে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদ এখনি গড়ে তুলতে হবে। না হয় আমাদের স্বাধীনতা কোনোভাবেই অর্থবহ হবে না।

লেখক: ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট