ইভিএম নিয়ে বিএনপির দ্বিমুখিতা!

বাংলাবাজার পত্রিকা
ঢাকা: রাজধানীর দুই সিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হবে ইভিএম পদ্ধতিতে। আর এই ইভিএমন নিয়েই যতো আলোচনা সমালোচনা চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। তবে সম্প্রতি ইভিএম নিয়ে বিএনপির দ্বিমুখী আচরণ প্রকাশ পেয়েছে।

এত দিন প্রচার-প্রচারণায় দাবি তুললেও এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম ব্যবহার না করতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে বিএনপি।

অন্যদিকে নির্বাচনে দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট হিসেবে যারা কাজ করবেন, তাদের ইভিএম পরিচালনার ওপর দলটি প্রশিক্ষণ দেবে বলে জানা গেছে।

ইভিএমে ভোট দেয়া, জালভোট শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয় থাকবে প্রশিক্ষণে। ২২ জানুয়ারি থেকে এ প্রশিক্ষণ শুরু হবে। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনাকালে এমন তথ্য জানা গেছে। ইভিএম নিয়ে দলটির এই দ্বিমুখিতায় বিব্রত দলের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। মঙ্গলবার মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা চিঠিটি ইসিতে নিয়ে যায় বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল।

সকালে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা ও চার নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপির চার সদস্যের প্রতিনিধিদল, যার নেতৃত্বে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি ঢাকা সিটি নির্বাচনে অংশ নিলেও শুরু থেকে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।

সিইসিকে দেয়া চিঠিতে বিএনপি মহাসচিব লিখেছেন, ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের হাতে এখনো সুযোগ আছে নিরপেক্ষতা প্রমাণের চেষ্টা করার।

সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই উন্মোচিত ইভিএমর অকার্যকারিতাকে বিবেচনায় নিয়ে ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করে প্রচলিত ব্যালট ব্যবস্থাতেই ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করুন। ভোট প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের খবরদারি বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

আশা করি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা প্রমাণে আমাদের দাবি পূরণ করে ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ ও স্বচ্ছ করার ব্যবস্থা নেবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন। দলে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান।

বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, শাহাদাত হোসেন চৌধুরী, মো. রফিকুল ইসলাম ও কবিতা খানম ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর ও অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান।

ইসির সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে নতুন করে উপনির্বাচন আয়োজনের দাবিও জানানো হয়।

বৈঠক শেষে আমীর খসরু সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচনে কী ঘটেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রকাশ হয়েছে। সেটি নিয়ে কথা বলেছি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের চেয়েও অনেক বেশি খারাপ হয়েছে এই নির্বাচন। নির্বাচন ব্যবস্থা অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছে। উন্নতি তো দূরের কথা অবনতির দিকে যাচ্ছে, ফলে আস্থাহীনতা বাড়ছে।

অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, ভোটকেন্দ্রে যারা প্রার্থীর এজেন্ট হিসেবে কাজ করবেন, তাদের ইভিএমে ভোট দেয়ার পদ্ধতি, জালভোট শনাক্তকরণ, নির্বাচনী প্রতীক বাছাই করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

বিএনপির নেতা ও জাতীয়তাবাদী প্রকৌশলীদের সংগঠন ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) এই প্রশিক্ষণ দেবে। ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ সিটিতে আলাদাভাবে এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। উত্তরে কিছু কিছু এলাকায় এজেন্টদের ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়ে গেছে। আর দক্ষিণ সিটিতে ২২ জানুয়ারি থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির নির্বাচন প্রচার কমিটির আহ্বায়ক দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম বলেন, ২২ জানুয়ারি থেকে দক্ষিণ সিটির পোলিং এজেন্টদের ইভিএমের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সেই অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব দলটির দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, প্রথম দফায় সাড়ে ৭ হাজারের বেশি পোলিং এজেন্টকে ট্রেনিং দেয়া হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আরও ট্রেনিং দেয়া হবে।

ইভিএমে নির্বাচন না করার দাবি থেকে বিএনপি সরে আসেনি উল্লেখ করে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এরপরও চোর যেন ভোট চুরি করতে না পারে এই জন্য পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যেন তারা ইভিএমে ভোট দেয়ার পদ্ধতি জানার পাশাপাশি জালভোট শনাক্ত করতে পারেন।

বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, উত্তর সিটির প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের ইভিএমের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, এবার ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে দুই স্তরে পোলিং এজেন্ট দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেন কোনো এজেন্ট কেন্দ্রে যেতে না পারলে বিকল্প এজেন্ট দেয়া যায়।

পোলিং এজেন্টদের তালিকায় স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও থাকবেন।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।