কেমন আছেন মফস্বলের সাংবাদিকরা?

সৈয়দ শওকত জামান
মফস্বল সাংবাদিক কেমন আছে? সহজ উত্তর এক কথায় বলতে পারি ভাল নেই। ঢাকা অফিসের দাড়োয়ানের বেতনও জোটেনা মফস্বল সাংবাদিকদের কপালে। নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর মতো আর কি।

বেতন বৈষ্যমের শিকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সিংহভাগ মফস্বল সাংবাদিকদের জীবন কাটছে মানবেতর। ঢাকা অফিসে নির্দ্দিষ্ট একটি বিটে কাজ করে বেতন পান ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। কেউ কেউ এরও অধিক।

অথচ মফস্বলে সকল বিট ও ছবি তোলাসহ দিনরাত পরিশ্রম করে বেতন পান ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। বেতন দেয়া পত্রিকার সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটা।

সিংহভাগ পত্রিকা বিনা বেতনে মফস্বল সাংবাদিকদের শ্রম শোষণ করছে। ভাত দেয়ার মুরদ নাই কিল মারার গোসাই। বেতন ভাতাদি দেয়না অথচ একটি নিউজ দেরিতে বা মিস হলে অফিস থেকে শক্ত ঝারি। পিলে কেপে যাওয়ার মতো অবস্থা।

মফস্বল সাংবাদিকতা জেনে শুনে বিষ খাওয়ার মতো। নেশায় পড়ে পারিবারিক জীবনে অর্থকষ্টের মুখে রেখে নিরলসভাবে সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছে মফস্বলের সাংবাদিকরা।

ঢাকা অফিসে এসিতে বসে মোটা অংকের বেতন গুনে পত্রিকায় যে সংবাদ পরিবেশন করেন তার চেয়ে বিনা বেতন ভাতাদি সুবিধা বঞ্চিত মফস্বলের সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশন কোন অংশে কম নয়।

মফস্বলের নিউজ ছাড়া একটি পত্রিকা অসম্পুর্ণ। এক ঢাকা সিটির নিউজ কি পাঠক পড়ে সন্তুষ্ট থাকবে। জানতে চাইবে সারা দেশের খবর। আমরাইতো পুরো বাংলাদেশ। অথচ আমরাই অবজ্ঞা অবহেলায় কাজের স্বীকৃতি পাইনা, জোটে না সন্মানটুকুও। মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করলেও নিজের অধিকারের খবর নেই ।

মফস্বলে যারা সাংবাদিকতা করেন তারা একেকজন অনেক প্রতিভাবান এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ তাদের সব বিষয়ের উপর সংবাদ তৈরি করে ঢাকায় পাঠাতে হয়।

প্রতিভাবান এ সকল সংবাদ কর্মীদের জীবন যাপনের চিত্র যদি ঢাকার কর্তা ব্যক্তিরা দেখতে পেতেন তাহলে তারা মফস্বলের ব্যাপারে আরো উদার হতেন বলে মনে করি।

নতুন করে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে মফস্বলের সাংবাদিকরা। মরার উপর খাড়ার ঘাঁ এর মতো। ভাল মানের সাংবাদিকরা পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এখন বাজারে আসা নতুন পত্রিকার প্রতিনিধি হতে গেলে ভাল রির্পোটার বা অভিজ্ঞতার মুল্য নেই।

কে কতো বেশী বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন যোগ্যতার প্রধান শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। রির্পোট না লিখতে পারলেও চলবে। যে বেশী বিজ্ঞাপন দিতে পারবে তার উপর নির্ভর করে মফস্বলের সংবাদ কর্মীর ভাগ্য।

আশানুরুপ বিজ্ঞাপন দিতে না পারায় মফস্বলের ভাল মানের সাংবাদিকদের চাকরিও চলে যাচ্ছে। যোগ্যতার মানদণ্ডে সংবাদ লেখার অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য না দিয়ে প্রাধান্য দেয়া হয় বিজ্ঞাপন পাঠানোর বিষয়টিকে।

অনেক পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আবেদনপত্র হাতে পেয়েই জানিয়ে দেন পারলে ঢাকায় আসেন আর না আসলেও সমস্যা নাই, আপনি এখন থেকে আমাদের ব্যুরো প্রধান অথবা জেলা কিংবা উপজেলা প্রতিনিধি।

বিজ্ঞাপন পাঠাতে শুরু করেন, আইডি কার্ড পাঠিয়ে দেবো। ইদানিং এইও শুনি মফস্বল সাংবাদিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চলছে ঘুষ বাণিজ্য। টাকা দিলেই মেলে পত্রিকা বা টেলিভিশনের চ্যানেলের নিয়োগ। আগে যা ছিল চিন্তার বাইরে। প্রথম সারির বেশক’টি মিডিয়া হাউজ বাদে।

আগে ঢাকা অফিস থেকে কোন নিউজ মিস করলে ফোন আসতো, দ্রুত পাঠানোর নির্দেশ দিতো। মাঝে মাঝে মফস্বল সম্পাদক বার্তা সম্পাদক ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের ফোন দিয়ে উৎসাহিত করতেন ভাল নিউজ ও ভাল ভাল ফিচার পাঠানোর জন্য।

আর এখন ফোন করে বলা হয় ওমুক প্রতিষ্ঠানের একটা বড় বিজ্ঞাপন অমুক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিজ্ঞাপন চান, প্রয়োজনে সম্পাদক সাহেবকে মোবাইল ফোনে ধরিয়ে দেবেন।

এ সকল অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে একটা গ্যারান্টি দিতে পারি তারা এক জেলায় দশজনকে আইডি কার্ড দিলেও কোন দিন নিয়োগ পত্র দিবেন না কাউকে। দিলেও অবতৈনিক উল্লেখ করে।

জাতীয় পর্যায়ে স্বনামধন্য অনেক পত্রিকাও নিয়োগ পত্র দেন মাত্র ছয় মাসের জন্য। যাতে ওই ছয় মাসটাকে ধরা হয় শিক্ষানবীশ কাল হিসেবে। ওই অস্থায়ী নিয়োগপত্রে এও উল্লেখ করা হয় শিক্ষানবীশ কাল ভালোভাবে অতিক্রান্ত হলে স্থায়ী নিয়োগ পত্র দেয়া হবে।

স্থায়ী এ পত্র কতোজন মফস্বল সংবাদকর্মীর ভাগ্যে জুটেছে। ভাগ্য নিয়ে জন্ম নেয়ারা পেয়েছেনও।

জাতীয় অনেক পত্রিকা আছে যারা নিউজের ব্যাপারে কখনো কোন তাগিদ না দিলেও প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপনের জন্য তাগিদ দিয়ে থাকেন।

কোন বেতন না দেয়া অনেক পত্রিকা আছে যারা বিজ্ঞাপনের চেক হাতে পেলে তাদের প্রতিনিধিকে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন পাঠান, এটা সত্য। তবে মফস্বলে থেকে মাসে কতগুলো বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা সম্ভব তার খোঁজ কেউ রাখেনা বা রাখতে চাননা।

বলতে দ্বিধা নেই আজকে সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ মফস্বলের নামধারী সংবাদ কর্মীরাই দিয়েছেন। কারণ বিজ্ঞাপন সংগ্রহে থাকা এ সকল কর্মীরা খবরের ব্যাপারে কোন সচেতনই না।

এদের অনেকেই আছেন যারা অন্যের কাছ থেকে ধার করা নিউজ পাঠিয়ে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে সবর্ত্র জাহির করে।

সবচেয়ে করুন অবস্থা ইংরেজি পত্রিকার। বাংলায় ভালভাবে লিখতে না পারা অনেককেই দেখা যায় ইংরেজি পত্রিকার প্রতিনিধি। তারা ভালভাবে ইংরেজি উচ্চারণ করতে না পারলেও নিজেকে ওমুক ডেইলির প্রতিনিধি পরিচয় দেন।

মূলত এরা প্রতিনিধি ঠিকই তবে সাংবাদিক নামের আড়ালে বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি। মফস্বলে যারা সাংবাদিকতা করেন তারা একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিনিধির নামের আড়ালে বিজ্ঞাপন প্রতিনিধির কাজ করেন।

অনেক ইংরেজি পত্রিকা দেশে পাঠক তৈরি করতে পারলেও তারা ইংরেজিতে কাজ করতে পারে সেইরকম সাংবাদিক সৃষ্টি করতে পারেননি।

মফস্বলে যারা নিজেদের ইংরেজি দৈনিকের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন তাদের বেশীরভাগই অন্যের কাছ থেকে ধার করা বাংলাতে তৈরি খবর ঢাকায় পাঠিয়ে থাকেন। পরে সেগুলো ইংরেজিতে ভাষান্তরের পর প্রকাশ করা হয়।

আসলে সারাদেশের মফস্বল এলাকার সাংবাদিকতার চিত্র প্রায় এক। এখনকার সময়ে অনেক চ্যানেল ও পত্রিকার মালিকেরা মফস্বল এলাকার সংবাদকর্মীদের বেতন দেন কিনা অথবা তাদের আদৌ সংবাদকর্মী হিসেবে মূল্যায়িত করেন কিনা তা তারাই ভালো জানেন।

সাংবাদিকতা বিশেষ করে মফস্বল এলাকার সাংবাদিকতা এখন কি পর্যায়ে আছে তা বোধ করি কম বেশী সবাই ভালো জানেন। সরকার সাংবাদিকদের জীবন মান উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করলেও তা কোন কাজে আসবেনা যদি যথাযথ দায়িত্বশীলদের বোধোদয় না হয়।

এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে মফস্বল সাংবাদিকদের মান সন্মান নিয়ে এ পেশায় টিকে থাকা দ্বায় হয়ে পড়েছে। মফস্বল সাংবাদিকদের শ্রমের মূল্য কাজের স্বীকৃতি নিয়ে মালিক সম্পাদকরা কবে ভাববে সেই দিন দেখে যাওয়ার আশায় রইলাম।

দেখে যেতে পারবো কিনা জানিনা। তবুও আশায় বুক বাঁধলাম নতুন দিনের প্রত্যাশায়।