রোহিঙ্গা হত্যা নির্যাতন বন্ধের নির্দেশ আইসিজের

বাংলাবাজার ডেস্ক
মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলায় চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গণহত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিজের বিচারক বিচারপতি আবদুল কাফি আহমেদ ইউসুফ বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। মিয়ানমারকে গণহত্যায় অভিযুক্ত করেছেন আইসিজে।

গণহত্যা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য গাম্বিয়ার আবেদনকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন এই আন্তর্জাতিক আদালত।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনে হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে জীবন বাঁচাতে নতুন করে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। মামলায় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও সংঘাত আরও তীব্রতর না হওয়ার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিতে আদালতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল দেশটি।

আইসিজের বিচারক রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ঘোষণা করেন। এগুলো হলো— এক. রোহিঙ্গাদের হত্যা, মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন ও ইচ্ছা করে আঘাত করতে পারবে না।

দুই. গণহত্যার আলামত নষ্ট না করা, তিন. গণহত্যা কিংবা গণহত্যার প্রচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র না করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ।

চার. মিয়ানমারকে অবশ্যই ৪ মাসের মধ্যে লিখিত জমা দিতে হবে, যেন তারা সেখানে পরিস্থিতি উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, এরপর প্রতি ৬ মাসের মধ্যে আবার প্রতিবেদন দেবে। গাম্বিয়া এই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের কাছে আবেদন করতে পারবে।

উল্লেখ্য, গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে যে বিষয়গুলোর জন্য অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাওয়া হয়েছিল, সেগুলো হলো— গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমার অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে; সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক অস্ত্রধারী ব্যক্তি যেন কোনো ধরনের গণহত্যা না চালাতে পারে, সে ব্যবস্থা নেয়া; গণহত্যাসংক্রান্ত কোনো ধরনের প্রমাণ নষ্ট না করা; বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও খারাপ করে, এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়া। পঞ্চম বিষয়টি হচ্ছে, আদেশের পরে ৪ মাসের মধ্যে উভয়পক্ষ তাদের নেয়া পদক্ষেপ কোর্টকে জানাবে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় গণহত্যা সনদের অধীনে আদালতের সিদ্ধান্ত ঘোষণা শুরু করেন বিচারক।

আদালত বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব মিয়ানমারের। রোহিঙ্গারা গণহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। আদালত মনে করেন, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমার অনীহা প্রকাশ করেছে।

গাম্বিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, রাখাইনের অভিযানে এসব কিছু্ই করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য। আদালত মনে করেন, গাম্বিয়া এর বিচার চাওয়ার যোগ্য।

মিয়ানমার জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘনের ব্যাপারটি অস্বীকার করে যে আবেদন করেছে, আদালত তা খারিজ করে দেন।

আদালত জানান, মিয়ানমার জেনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৯ লঙ্ঘন করেছে। এখন পর্যন্ত যেই আলামত আদালতের কাছে এসেছে, তাতে রোহিঙ্গারা হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর এর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের নির্দেশদাতা দায়ী।

আদালত মনে করেন, মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গারা জেনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী একটি ‘প্রটেক্টেড গ্রুপ’।

২০১৭ সালে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযানের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়া যায় না।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী তারা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ও বেসামরিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনি।

তাই অনেক বেসামরিক প্রাণ হারিয়েছে। যুদ্ধাপরাধ নয়, গণহত্যার অভিযোগে বিচার চলবে: যুদ্ধাপরাধ নয় মিয়ানমারে গণহত্যার আলামত পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার করা মামলা চলবে।

আইসিজের ১৭ জন বিচারকের (অনুপস্থিত একজন) সমন্বয়ে গঠিত বিচারিক পরিষদের পক্ষে আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারক আবদুলকাওয়ী আহমেদ ইউসুফ বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী আদেশ ঘোষণায় বলেন, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মিয়ানমার নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আদালত তা আমলে নিয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে মিয়ানমারে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা, গুম , খুন, ধর্ষণ, জমি দখলসহ গণহত্যার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া জাতিসংঘের সর্বশেষ সাধারণ অধিবেশনেও বলা হয়েছে যে মিয়ানমারের পরিবেশ মানবাধিকারের জন্য ইতিবাচক নয়, বিশেষত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য মিয়ানমার ঝুঁকিপূর্ণ।

আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারক আবদুলকাওয়ী আহমেদ ইউসুফ বলেন, আদালত এইসব তথ্য-উপাত্ত অমলে নিয়ে মিয়ানমারের আবেদন নাকচ করছে।

মিয়ানমার দাবি করেছে, রাখাইনে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে, গণহত্যা নয়। কিন্তু আদালত একাধিক প্রতিবেদন থেকে মিয়ানমারে গণহত্যার আলামত দেখতে পেয়েছে।

তাই গাম্বিয়ার আবেদনের প্রেক্ষিতে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা এই আদালতে চলবে। বিচারক আবদুলকাওয়ী আহমেদ ইউসুফ আদেশে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ৪টি অন্তবর্তী আদেশ দেন।

বিচারক আবদুলকাওয়ী আহমেদ ইউসুফ বলেন, রোহিঙ্গা গণহত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়ন বন্ধে মিয়ানমারকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীসহ সব সশস্ত্রবাহিনী ও সংগঠনকে গণহত্যার ষড়যন্ত্র থেকে নিবৃত্ত রাখতে মিয়ানমারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

গণহত্যার আলামত যাতে নষ্ট না হয় মিয়ানমারকে সে পদক্ষেপ নিতে হবে। রোহিঙ্গা গণহত্যা, নির্যাতন এবং নিপীড়ন বন্ধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে মিয়ানমারকে আগামী চার মাসের মধ্যে আইসিজেতে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে।

এই মামলা চলাকালীন প্রতিমাসে ৬ মাস পরপর মিয়ানমারকে এই বিষয়ে এই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

এর আগে, ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর তথ্য উত্থাপন করে এবং গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গণহত্যা প্রতিরোধবিয়ষক কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ন্যায়বিচার চায়।

পাশাপাশি গণহত্যা বন্ধের জন্য আদালতের কাছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী ৬টি আদেশ চায় গাম্বিয়া, বিপরীতে আদালত ৪টি আদেশ দেন।