ডাইংয়ের বর্জ্য গ্রাস করছে কৃষিজমি, দেখার কেউ নেই!

বাংলাবাজার পত্রিকা
আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ): আড়াইহাজারে বিভিন্ন ডাইং কারখানার অপরিশোধিত পানি ও বর্জ্য পড়ে শত শত বিঘা কৃষিজমি গ্রাস করে ফেলছে। জমিতে কাঙ্খিত ফসল না হওয়ায় বাধ্য হয়ে কৃষক জমির মাটি বিক্রি করছেন ইটভাটায়। অনেকেই আবার বাধ্য হয়ে শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে দিচ্ছেন ওই কারখানা মালিকদের কাছেই।

এতে প্রতিনিয়তই কমছে কৃষি জমি, উর্বরতা হারাচ্ছে মাটি। কারখানা কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না স্থানীয় কৃষকরা। নরসিংদীর খোর্দ্দ নওপাড়া রসুলপুর এলাকা থেকে শুরু করে সোনারগাঁওয়ের কাঁচপুর পর্যন্ত ছোট বড় অসংখ্য ডাইং ও টেক্সটাইল মিল গড়ে উঠেছে।

এসব প্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। অনেক প্রতিষ্ঠানেই নেই বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা। কেমিক্যাল মিশ্রিত কালো কুচকুচে দুর্গন্ধযুক্ত পানি খালের মাধ্যমে ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ছে। এতে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে পড়ছে। খালের কিছু কিছু স্থানে প্রভাবশালীরা ভরাট করে প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এতে পানির প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সংকোচিত হয়েছে খালও। মরে যাচ্ছে খালের তীরবর্তী বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি উপচে ঢুকে পড়ছে স্থানীয়দের বসতবাড়িতে। দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন। ফসলিজমি রক্ষায় দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানান, নরসিংদীর খোর্দ্দ নওপাড়া রসুলপুর এলাকা থেকে শুরু করে আড়াইহাজার উপজেলা হয়ে সোঁনারগাও এলাকা কাঁচপুর পর্যন্ত ডাইংসহ অসংখ্য বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য শোধনে অধিকাংশেরই নেই বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি প্লান্ট) ব্যবস্থা। এতে কারখানার কালো পানি-বর্জ্য সফলি জমিতে পড়ে জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে।

এক সময় এসব এলাকা কৃষি নির্ভর ছিল।এখন জমিগুলো ক্রমেই পতিত ভূমিতে পরিণত হয়ে পড়ছে। ডাইংয়ের কেমিক্যালযুক্ত পানি জমিতে পড়ায় উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে জমি। প্রতিনিয়তই বেকার হয়ে পড়ছেন কৃষকরা।ফসল ফলাতে না পেরে অনেকেই জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন স্থানীয় ইটভাটায়।

খোর্দ্দ নওপাড়া এলাকার কৃষক বিল্লাল মিয়া বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, ৩০ বছর ধরে খাল বন্ধ রয়েছে। খালের বিভিন্ন স্থানে ভরাট করা হয়েছে। খালের প্রবাহ বন্ধ থাকায় ময়লা পানি উপচে পাশের জমিতে পড়ছে। এক সময় খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। এখন মাছ ধরা বা গোসল করাতো দূরের কথা। পানিতে নামলে পা চুলকায়। ঝাঁজালো গন্ধে খালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কষ্টকর। ময়লা পানির দুর্গন্ধে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

তিনি আরো বলেন, ডাইংয়ের পানি স্থানীয় গুতলিয়া, শিমুলতলা, পুরিন্দা ও ছনপাড়া কালভার্ড দিয়ে চকে নামছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২ হাজার শতাংশ জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে।

খোর্দ্দ নওপাড়া এলাকার আকেল আলী প্রধান বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, খালের তীরে তার ১৮০ শতাংশ জমি রয়েছে। ডাইংয়ের পানি জমিতে পড়ে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কোনো ফসল ফলছে না।

বাগবাড়ি এলাকার মনুহাবি বলেন, খালের পাশে তার ৩০ শতাংশ জমিতে ডাইংয়ের ময়লা পানি পড়ে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কোনো ফসলই হচ্ছে না। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বেশ কয়েক দফায় পাশের ডাইং কারখানাকে বিষয়টি অবহিত করা হলেও কোনো প্রতিকার পায়নি তিনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আড়াইহাজার উপজেলার বান্টি, পাঁচরুখী, টেকপাড়া, ছনপাড়া, পুরিন্দা, বাগবাড়ি, রসুলপুর, সাতগ্রাম, দেবৈ, মাতাইন, স্বরুপাব, সখেরগাও এবং পাশের নরসিংদী জেলার মাধবদীর কান্দাপাড়া, রশিদেরবাড়ি, রাইনাদী ও খোরদোনাপাড়াসহ আরো বেশ কিছু সফলি জমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ডাইংয়ের অপরিশোধিত পানির ছোবল থেকে ফসলি জমি রক্ষায় দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণের সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এ ব্যাপারে জানতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তারের উপ-পরিচালক সাঈদ আনোয়ারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে তিনি মোবাইল কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।