ট্রেনের কেবিনে মধুকুঞ্জ, বেরসিক রেলযাত্রী ও পুলিশ

সৈয়দ শওকত জামান
ট্রেনের কেবিনে মধুকুঞ্জের আসর বসানোর শুরুতে হাঁটে হাঁড়ি ভাঙল বেরসিক রেল যাত্রী ও পুলিশ। ছাত্রী শিক্ষকের মধুময়ে আটকের খবর মুহুর্তেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো চলন্ত ট্রেনের কামরার জানালা দিয়ে রেল স্টেশন পেরিয়ে সর্বত্র।

ট্রেন থামার শেষ গন্তব্যস্থল দেওয়ানগঞ্জ বাজার রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে খবর পাওয়া নানা বয়সি উৎসুক জনতার ভীড় জমে আটককৃত অধ্যক্ষ ও ছাত্রীকে এক নজর দেখতে।

ছুটে আসছে জামালপুর স্টেশনেও। দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনে ট্রেন থামার পর ভীড় সামলাতে রেলওয়ে পুলিশের বেগ পেতে হয়েছিল।

জেলার সাংবাদিকদের ফোন পেয়ে দেওয়ানগঞ্জের সংবাদকর্মীদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তুলতে দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এদিকে পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন ও আঞ্চলিক পত্রিকার সংবাদকর্মীরা জামালপুর জংশন স্টেশনের প্লাটফর্মে কেউ জিআরপি থানায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছেন ঢাকামুখি ফিরতি তিস্তা এক্সপ্রেসের অপেক্ষায়।

ট্রেনের কেবিনে অসামাজিক কাজে আটক অধ্যক্ষ ও ছাত্রীকে তিস্তাযোগে রেলওয়ে পুলিশ নিয়ে আসছে জামালপুর জিআরপি থানায়।

কেউ কেউ তথ্য সংগ্রহ অনেকেই ট্রেনে বয়ে আসছে খবরের নানা দিক নিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনায় মগ্ন। সময়ের চিন্তায় তথ্য নোটবুকে টুকিয়ে জিআরপি থানার ছবি তুলে পত্রিকা অফিসমুখে দৌড়।

উৎসুক জনতা জামালপুর স্টেশনেও একনজর দেখতে স্রোতের মতো আসছিল। এবার আসি মূল কথায়। আবাসিক হোটেল বাসাবাড়িতে অসামাজিক কার্যকলাপের সময় পুলিশ গ্রেফতার করলে সেখানে নারীর অভিযোগের প্রয়োজন পড়েনা।

যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার স্বচক্ষে প্রমাণ বা ছবি ভিডিও ফুটেজও লাগে না। অবস্থানরত অবস্থায় পেলেই দুজনকেই গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করতে আদালতে সোর্পদ বা ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে জেল জরিমানা করে পুলিশ।

ছাত্রীকে নিয়ে অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম চৌধুরী ওরফে মামুন চৌধুরীকে তিস্তা ট্রেনের খ বগিতে ২ নং কেবিন ভাড়া নিয়ে প্রমোদ ভ্রমনে বের হয়েছিলেন।

সব রকম প্রস্তুতিও ছিল তাদের। কেবিনের দরজা লক করে প্রণয়ের ষোলকলায় মত্ত ছিল দুজনে। কেবিনের অভ্যন্তরে অসামাজিক কাজে লিপ্তর ঘটনা নজরে আসে কেবিনের বাইরে থাকা বেরসিক ট্রেন যাত্রীদের।

তারা টহলরত রেলওয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে কেবিনের অভ্যন্তরে অসামাজিক কাজ চলছে। যাত্রীদের অভিযোগ পেয়ে কেবিনের দরজায় রেলওয়ে পুলিশ নক করলে কিছু সময় পর দরজা খুলে অধ্যক্ষ সালাম পুলিশ দেখে তার চোখতো চড়ক গাছ।

কেবিনের অভ্যন্তরে সিটে আতংকগ্রস্ত হয়ে বসে আছে তার প্রাক্তন ছাত্রী। হতভম্ব হয়ে পুলিশের সামনেই হাতে থাকা যৌন মিলনের সামগ্রী কনডম মুখে ঢুকিয়ে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করেন সালাম।

বেরসিক রেল পুলিশেরা মুখে আঙ্গুল দিয়ে টেনে কনডম বের করে এবং দেহ তল্লাশী করে প্যান্টের পকেট থেকে আরেকটি কনডম উদ্ধার করেন।

রেল বা সড়কপথে যাত্রাকালে শুকনো খাবার, পানি ও খবরের কাগজ সাথে নেয় যাত্রীরা। কেউ কনডম নেয়না। যাত্রাপথের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কনডম নয় তা আমরাও জানি।

লংরোড বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট রেডে ট্রেনের কেবিনে চড়ে যাত্রা করে রেল যাত্রীরা। জামালপুর থেকে ইসলামপুর বা দেওয়ানগঞ্জ এই অল্প দূরত্ব রেলপথে সচরাচর কেউ কেবিনে চলাচল করে না।

ব্যক্তিগত দামি প্রাইভেট থাকার পরেও কি উদ্দেশে তিস্তা এক্সপ্রেসের খ বগির ৩ আসন বিশিষ্ট ২ নাম্বার কেবিন ভাড়া নিয়ে প্রাক্তন ছাত্রীসহ অধ্যক্ষ সালাম অবস্থান করছিল তা বুঝতে কি ঘিলু খরচ করার প্রয়োজন আছে?

জামালপুর-মেলান্দহ স্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে চলন্ত ট্রেনে আটক হওয়া ছাত্রীসহ অধ্যক্ষ সালামকে তিস্তা এক্সপ্রেসের শেষ গন্তব্যস্থল দেওয়ানগঞ্জ স্টেশনে নামায়।

দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনে উৎসুক জনতার তোপ এড়াতে দ্রুত রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। দুজনকেই লকআপে রাখা হয় জামালপুর জিআরপি থানায় সোর্পদ করার জন্য।

জামালপুর জিআরপি থানার ওসি তাপস চন্দ্র পন্ডিত ইসলামপুরে হামলার আশংকার তিস্তা এক্সপ্রেসের ফিরতি যাত্রায় অতিরিক্ত পুলিশ সহকারে আটককৃত অধ্যক্ষ ও ছাত্রী জামালপুর জিআরপি থানায় আনার নির্দেশ দেন।

পুলিশের কড়া পাহারায় জামালপুর রেলওয়ে জংশন স্টেশনে নামানো হয় । দ্রুত জিআরপি থানায় নিয়ে যায়।

দুজনকেই লম্বা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জিআরপি থানায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ওসি তাপস চন্দ্র পন্ডিত বলেন, ওই ছাত্রী কোনো অভিযোগ না করায় চলন্ত ট্রেনের যাত্রীদের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে কেবিনের একটি কামরায় অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ উঠার কথা বলেছিলেন।

এ কারণেই তিনি রেলওয়ে আইনে অধ্যক্ষ-ছাত্রী দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওসি তাদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে আইনে মামলা দায়ের না করে রোববার রাতেই দু’পক্ষের দু’জনের জিম্মায় তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন।

জামালপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাপস চন্দ্র পন্ডিত পরদিন সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু আটককৃত ছাত্রীর কোন অভিযোগ নেই আমি আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে ট্রেনের কেবিন থেকে আটক ওই ছাত্রীকে তার বাবার জিম্মায় এবং কলেজটির গভর্নিং বডির সদস্য একজন শিক্ষকের জিম্মায় অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম চৌধুরীকে ছেড়ে দিয়েছি।

তিনি বলেন, তিস্তা ট্রেনের কেবিনের একটি কামরায় অধ্যক্ষ ও ছাত্রীর ঘটনা নিয়ে সার্বিক বিষয় উল্লেখ করে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে রেখেছি।

তবে আমরা হরহামেশা দেখি, আবাসিক হোটেল ও বাসাবাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেখানে অবস্থানরত নারী-পুরুষকে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগে আটক করে।

থানায় এনে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে দুজনকেই আদালতে সোর্পদ করে। অনেক সময় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে জেল জরিমানা করা হয়।

সেখানে যৌনকর্মে লিপ্তথাকা অবস্থায় বা অবস্থানরত থাকাবস্থায়ও আটক হয়। নারীর অভিযোগ আছে কিনা, যৌনকর্মে লিপ্ত থাকার কোন প্রমাণ খুঁজতে দেখিনা বেশিরভাগই অসামাজিক কার্যকলাপের আটকের ঘটনার ক্ষেত্রে।

ট্রেনের কেবিনে আটকের পর নাটকে ভীন্ন চিত্রে দেখা গেল। ট্রেনে আইনটি চলছে একপথে ট্রেনের বাইরে আবাসিক হোটেলে বাসাবাড়িতে চলছে অন্যপথে ওসির কথায় এমনই বোঝা গেল।

একই আইন দুই দিকে বহমান। জিআরপির ওসিও দুইদিনে দুই রকম আইন প্রয়োগের কথা বললেন। সাধারণ মানুষ খুঁজছে ওসির মুখে দুপুরের আইন রাতে বদলে যাওয়ার আড়ালের রহস্য।

ওসি রেল আইনে বিচারের মুখোমুখি করতে মামলা দায়ের কথা বললেও ১০ ঘণ্টায় উল্টে গেল কথার চিত্র। ছাত্রীসহ অধ্যক্ষ আটকের পর থেকে জামালপুর জিআরপি থানায় দফায় দফায় দেনদরবারসহ নানামুখী নাটকের শেষ দৃশ্যে অভিযোগ না থাকায় বাবার জিম্মায় ছাত্রী ও সহকর্মী কলেজ শিক্ষকের জিম্মায় অধ্যক্ষকে ছেড়ে দেয় রেলওয়ে পুলিশ।

প্রতিবাদে বিচারের দাবিতে মাঠে নেমেছে বেরসিক জনতা।

লেখক: সাংবাদিক