করোনায় ঝুঁকিতে উন্নয়নের মেগা প্রকল্প!

বাংলাবাজার পত্রিকা
ঢাকা: বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত ইস্যুটির নাম করোনা ভাইরাস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের শেষ নেই। অনেক দেশে স্বল্প আকারে এই ভাইরাস ছড়ালেও চীনে রীতিমতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চীনে এখন পর্যন্ত ৪২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য-পর্যটন ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস ধরা পরেনি। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, উন্নয়ন ও ভ্রমণকেন্দ্রিক যোগাযোগের পরিসর অনেক বড় থাকায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।

একইসঙ্গে দেশের প্রায় সব মেগা প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি চীন ফেরত প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের কাজে যোগ দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় অবকাঠামো উন্নয়নের বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে বাধা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত সময়ে কাজ না এগোলে বাড়তে পারে প্রকল্প ব্যয়ও। চৈনিক নববর্ষে যোগ দিতে গিয়ে বাংলাদেশে কর্মরত অনেক চীনা আটকে পড়েছেন।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, এমনিতেই আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা নেই। তার ওপর চীনা সহায়তার বড় প্রকল্পে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা আটকে পড়লে সেটা দুশ্চিন্তারই কারণ।

সময়মতো কাজ না এগোলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে বা বাড়ানোর অজুহাত তোলা হতে পারে। কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি প্রকল্পে কর্মরত চীনের শতাধিক কর্মকর্তা তাদের ছুটি আরও বাড়িয়েছেন।

পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের নাগরিকরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত আছেন।

এসব প্রকল্পে দেড় হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন। তার বাইরে আরও কিছু প্রকল্পে ৫০০ চীনা নাগরিক সহায়তা করছেন। এরই মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত ৩৫ চীনা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, সওজ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত চীনা কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের জন্য প্রকল্পের কাজ থেমে থাকবে না।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে চীনের ১১০০ নাগরিক কাজ করছেন।

তিনি বলেন, তার মধ্যে ছুটিতে দেশে গিয়েছিলেন ২৫০ জন। তারা ফিরছেন। তবে কাজে যুক্ত করা হচ্ছে না। এতে কাজ থেমে নেই।

প্রকল্প সূত্র জানায়, চীনফেরত প্রকল্পের ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দাপ্তরিক কাজ করতে দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে যুক্ত চীনারা ছুটি শেষে ফিরছেন। কিন্তু তাদের ১৪ দিন পর্যবেক্ষণ শেষ না হলে কাজ করতে দেয়া হবে না।

ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত চীনের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। আগামী মাসে তাদের ফেরার কথা। কিন্তু তারা ফিরতে পারবেন না বলে মনে করা হচ্ছে।

চীন থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। করোনা ভাইরাসের কারণে চীন থেকে পণ্য জাহাজীকরণ, বুকিং এবং বিক্রি আপাতত বন্ধ রয়েছে।

যেসব পণ্য দেশে আসছে সেগুলো এক মাস আগেই বুকিং করা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে চীনা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে চীন এসব পণ্য সরবরাহ শুরু করবে কি না।

অনেক দেশ চীনের সঙ্গে আকাশপথে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশও চীনের নাগরিকদের আগমনী ভিসা বন্ধ করেছে। আকাশপথেও যাতায়াত স্থগিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পণ্যের কাঁচামাল আমদানির সংকট দেখা দিলে রপ্তানিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ চীনের বদলে বিকল্প দেশ থেকে এসব পণ্য আমদানির খোঁজখবর নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এ পরিস্থিতিতে চীনের বিকল্প বাজার ক্রেতাদের হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথাও বলছেন এবং এর জন্য প্রস্তুতির তাগিদ দিয়েছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, আমরা চীন থেকে যেমন আমদানি করি, তেমনি আবার রপ্তানির বিষয়ও আছে।