নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে

ওয়াসিম ফারুক
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দিকেই মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সিল নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা।

নির্বাচিত সব জনপ্রতিনিধির প্রতি রইল শুভেচ্ছা। নির্বাচন নিয়ে সবসময়ই আমার কৌতূহলের শেষ নেই। প্রত্যেক ভোটের দিন-ই সকাল সকাল ভোটকেন্দ্র উপস্থিত হয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেই।

আমি ঢাকা মহানগর উত্তরের ২৭ নং ওয়ার্ডের ভোটার। এবারের সিটি নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। আমি ভোট কেন্দ্রের মূল ফটকে পৌঁছার পরই নৌকার প্রতীক গলায় ঝুলানো কয়েকজন যুবক এসেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলো কি চান?

ভোট দিতে এসেছি, আপনার আইডি কার্ড দেন। তোমাদের কাছে আইডি কার্ড দিব কেন? ভোটার নাম্বার বের করার জন্য। আমি অনলাইন থেকে ভোটার নাম্বার নিয়ে এসেছি। ভোট দিতে হবে না বাইরে যা ব্যাটা।

নির্বাচন কেন্দ্রের ভেতর কি ঘটছে সেটা দেখার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রটা বের করে দিলাম ওদের হাতে।কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ভোটার নাম্বার নিয়ে একটি পিচ্চি ছেলে এসে বললো আসেন আামার সাথে।

ওর সাথে কেন্দ্রের ফটকে ঢুকতেই আরো তিন জনের কাছে আমাকে হস্তান্তর করা হলো। যাদের সবার গলায় নৌকা প্রতীকের কার্ড ঝোলানো।

পোলিং কক্ষে ঢোকার পর আঙ্গুলের ছাপের জন্য যন্ত্রের ভেতর আঙ্গুলের ছাপ দিতেই আমার তথ্য চলে এলো। এর পরই বিপত্তি আমাকে ইভিএম এ ভোট দেয়ার জন্য গোপন কক্ষে যাওয়ার সময় দুই জন সাথে সিকিউরিটি।

যখন ই আমি ওদের আসতে নিষেধ করি তখনই ওরা আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিং বুথ থেকে বের হয়ে যেতে বলে উপস্থিত নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে তারা নীরব দর্শকের ভুমিকায় ছিল।

ভোট না দিয়ে শুধু আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে সম্মান কোন মতে রক্ষাকরে কেন্দ্র থেকে বের হতেই দেখি দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টার মরিয়ম চম্পার মোবাইল ফোন নিয়ে টানাটানি করছে কয়েকজন উশৃংখল তরুণ।

কোন এক বোবা লোক ওদের কথামত ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার কারণেই ঐ লোককে মারার ভিডিও ধারণ করার অপরাধে মরিয়ম চম্পার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যে চম্পা তার মোবাইল ফোনটি ফেরত পান।

পহেলা ফেব্রুয়ারি ঢাকা সিটি নির্বাচনে শুধু আমার ক্ষেত্রেই যে এমনটি ঘটেছে তা নয়। সংবাদ মাধ্যম থেকে যতটুকু জেনেছি ঢাকার প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রের চিত্রই ছিল এক।

ঢাকা সিটি নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো ভোটার উপস্থিতি।ঢাকা দক্ষিণের মোট ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ভোটারে মধ্যে মাত্র ২৯ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।

ঢাকা উত্তরের অবস্থা আরো করুন, ঐ খানে ভোট পরেছে মাত্র ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপ নির্বাচনে মাত্র ২২ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি নিয়েই খুশি ছিল আমাদের নির্বাচন কমিশন।

ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির এই করুন দশা দেখে অনেকেই চিন্তিত।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের প্রতি-ই যদি জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তাহলে এটা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সত্যি হুমকি স্বরুপ। সাধারণভাবেই প্রশ্ন আসে কেন আমাদের দেশের মানুষ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন?

বিগত দিনগুলিতে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থাকার পরেও মানুষ ভোটকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন।কিন্তু ইদানিং ভোটকে মানুষ মনে করছেন চোঁখের কাটা হিসেবে।

ভোটের আগের বৃহস্পতিবার রাতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে নির্বাচন নিয়ে অনেকের সাথেই আলাপ হলো প্রায় সবারই একই কথা। ভোট দিয়ে আর কি হবে ফলাফল যা হবার তা তো হয়েই গেছে।

অযথা ঝুঁকি নিয়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বিপদ ডাকার কি প্রয়োজন। তারপর নিজের ভোট ঠিকভাবে পছন্দের প্রার্থীকে দিতে পারবো কি না তার ও তো গ্যারান্টি নাই।

স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে জাতীয় নির্বাচনে হ্যা-না ভোট ছাড়া প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছিল আনন্দ মুখর। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা ক্ষমতায় থাকার পরেও আজ দেশের মানুষ ভোট কেন্দ্রে আসেন না ভোট দিতে!

ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম নিয়ে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের একেক জনের একেক মত যা কৌতুক হিসেবেই দেশের মানুষ গণ্য করছে।

কেউ বলেছেন, মানুষ ফেইসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ভোট দিতে আসেন নি, কেউ বলছেন, তরুণ প্রজন্ম দেরীতে ঘুম থেকে উঠে বলে ভোটার উপস্থিতি কম, আবার কেউ বলছেন, ভোটাররা আরাম আয়েশে থাকায় ভোট দিতে আসেন নি।

এই ধরনের কথা আমাদের লজ্জিত করে। একইসঙ্গে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বজ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন উঠে। সবাই আজ সত্যকে লুকিয়ে শুধুই চাটুকারিতা করে দেশ ও জাতিকে ডুবাচ্ছে।

১৯৯৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মাগুরা-২ আসনের উপ নির্বাচন জাতির জন্য অমঙ্গল বয়ে এনেছিল। এর-ই প্রেক্ষিতে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দল বর্তমান ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের দাবির মুখে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রর্বতন হয়।

এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।এর পরেও এদেশের মানুষ আশা করেছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যে কোন মূল্যেই হোক দেশে জনগণের ভোটের অধিকার অটুট রাখবেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো তার উল্টাে, ক্ষমতার কাছে আজ নীতি আর্দশ সবই মূল্যহীন বলে প্রমাণিত হচ্ছে বার বার। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য জনগণের ভোটকে আর জনগনের রাখা হয়নি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচনে ১৫৪ আসনের এমপি নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ঐ নির্বাচনে অশ্য বিএনপি জোট অংশ না নেয়ায় এমনটি হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

তবে ২০১৮ এর ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে হতাশ ও লজ্জিত করেছে। এর মাধ্যে দেশের বিভিন্ন উপ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুলোও আমাদের কম হতাশ করে নি। আর এই হতাশাই আজ দেশের সাধারণ মানুষের ভোট কেন্দ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রক্ষা করতে হলে, অবশ্যই জনগণের ভোটের অধিকার জনগণকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর জন্য অবশ্যই একটি স্বাধীন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন গঠন করতে হবে।

জনগণ যাতে নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে। সেই নিশ্চয়তা যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন দিতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে ভোট কেন্দ্রমুখী করা সম্ভব হবে না।

তাই নির্বাচনের সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সব রাজনৈতিক দলসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করে নির্বাচনের প্রতি দেশের মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট