আপিল বিভাগের ক্ষোভ প্রকাশ

বাংলাবাজার পত্রিকা
ঢাকা: বিনা পরোয়ানায় ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় ১৭ বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগের বিচারপতি নুরুজ্জামান বলেন, তাহলে রায় দিয়ে লাভ কি? এটা কি আইওয়াশ। ৫৪ ধারায় গ্রেফতার তো আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে?

আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষেত্রেও হতে পারে। ডিস এপিয়ারেন্স (নিখোঁজ) হয়ে গেল, ৫ বছর তার কোনো খবর নাই? এর দায়-দায়িত্ব কে নিবে? রাষ্ট্র নিবে? বলেন এ বিচারপতি।

এ প্রশ্নের জবাবে অ্যার্টনি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিষয়টি তা নয়। আপিল বিভাগের আরেকজন বিচারপতি ইমান আলী বলেন, হাইকোর্টের রায় এতোদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। তাহলে রায় দিয়ে লাভ কি।

অ্যার্টনি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তাহলে আমরা হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দিই। পরে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অ্যার্টনি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনাদের রিভিউ আবেদনটি স্পষ্ট নয়।

রায়ের কোন কোন ক্ষেত্রে আপত্তি আছে তা স্পষ্ট করে দিন। পরে আগামী ১৬ এপ্রিল এ মামলার রিভিউ শুনানির দিন ধার্য করে আপিল বিভাগের ৬ সদস্যের বেঞ্চ।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এ দিন রেখেছেন। পরে বাদীপক্ষের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান সাংবাদিকদের আপিল বিভাগের শুনানি এবং কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ সময় তিনি বলেন, এই রায় পুরোটা রিভিউ হবে না। রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেফতারের কারণ ও ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির আটকের কথা তার পরিবারকে জানানোর কোন সুযোগ নেই আইনে।

যদি কোন ব্যক্তি হেফাজতে মৃত্যু হয় তাহলে হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনেই প্রতিকার চাইতে পারবে। এ আদেশের পর অ্যার্টনি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথমে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাননি।

পরে আবার তিনি সংবাদিকদের জানান, দেশে মাদকের মামলা বেড়েছে, ধর্ষণ মামলা বেড়েছে, জঙ্গির ঘটনা বেড়েছে। বিনা পরোয়ানায় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার নিয়ে রিটকারী বা বাদীপক্ষের আইনজীবীর তাত্ত্বিক কথা বলছেন।

পুলিশ হেফাজতে রুবেল নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর নিয়ে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে আসামিকে গ্রেফতারের সময় পরিচয়পত্র দেখানো,

গ্রেফতারের কারণ এবং আটকের ১২ ঘণ্টার মধ্যে আটকৃতব্যক্তির পরিবারকে জানানো সংক্রান্ত কয়েকদফা নীতিমালা করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

একইসঙ্গে রিমান্ডে কোন নির্যাতন করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিতে রিমান্ডের আগে ও পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বজন ও

আইনজীবীর উপস্থিত রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে। এ রায় আপিল বিভাগেও বহাল থাকে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে বেসরকারি ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনির্ভাসিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২৩ জুলাই মিন্টো রোডের গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে মারা যান রুবেল।

এরপর তৎকালীন সরকার রুবেল হত্যা তদন্তের জন্য বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের সমন্বয়ে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্ত শেষে কমিটি ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের পক্ষে কয়েকটি সুপারিশ করে। এ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) হাইকোর্টে রিট করে।

ওই রিট মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল এ ব্যাপারে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট।

রায়ে ছয়মাসের মধ্যে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রচলিত বিধান সংশোধন করতে নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি ওই ধারাগুলো সংশোধনের আগে কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে বলা হয়।

এর বিরুদ্ধে আপিলে যান রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল আবেদনে বলা হয়, এ দু’টি ধারা সংশ্লিষ্ট যে আইনে রয়েছে, তা যথেষ্ট ও সঠিক। এ জন্য আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

২০০৪ সালে আপিল বিভাগ সরকারের লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেন।তবে হাইকোর্টের ওই নির্দেশনাগুলো স্থগিত করেননি। দীর্ঘদিন পরে ২০১৬ সালের ১৭ মে আপিল শুনানি শেষে ২৪ মে রায় ঘোষণা করেন।