অনুমোদনহীন বিদেশি শ্রমিক, রাজস্ব বঞ্চিত সরকার

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: দেশের উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা। বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক এ দেশে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই কাজ করছেন।

প্রতিনিয়ত বাড়ছে এই সংখ্যা। বর্তমানে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে এ দেশে কর্মরত বিদেশির সংখ্যা আড়াই লাখেরও বেশি।

যারা ভ্রমণ ভিসায় এসে বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করছে। আর বিদেশিরা তাদের আয়ের টাকা নিজ নিজ দেশে পাঠালেও সরকার তা থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না।

মূলত ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় তাদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করতে হলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমতি নিতে হয়।

তার বাইরে এনজিও ব্যুরো ও বেপজা বিদেশিদের কাজের অনুমতি দিয়ে থাকে। বিদেশিদের হয়ে তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অনুমতি নেয়ার কাজটি করে থাকে।

আর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গ্রুপ সরাসরি বিদেশিদের চাকরিতে নিয়োগ দিলে তা হবে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আইনে সে জন্য জেল-জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। এনবিআর এবং বিডা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল ১১-এর অধীনে সাড়ে ৯ হাজার বিদেশি নাগরিক আয়কর দেয়।

অথচ বিডার তথ্যানুযায়ী গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার ৮৫৪ জন বিদেশির ওয়ার্ক পারমিট ছিল।

এনবিআর সংশ্লিষ্টদের দাবি—সরকারের দুর্বল নজরদারি ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণেই বিদেশিদের আয়করের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

তা ছাড়া বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমেও গতি নেই।

আর টাস্কফোর্সের অন্তর্ভুক্ত সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় গত তিন বছরেও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) ‘ডাটা ব্যাংক’-এর কার্যক্রম গতি পায়নি।

এমনকি বিমানবন্দরগুলোতে বিদেশি কর্মীদের জন্য আয়কর বুথ চালুর কথা থাকলেও তাও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে খুব সহজেই বিদেশিরা ভ্রমণ ভিসায় এসে নানা কাজে যুক্ত হতে পারছে।

সূত্র জানায়, বিগত ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত এ দেশে বিদেশি শ্রমিক ছিল প্রায় ২৪ হাজার।

তার মধ্যে শিল্প অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ ১৪ হাজার ৯১ জনের মোট ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে।

আর বাণিজ্য অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ মোট ৯ হাজার ৭৬৩ জনের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে।

যদিও ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে মোট ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক কাজ করছে।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন ভারতের নাগরিক। তার মধ্যে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছে।

তাদের মধ্যে ভারত ও শ্রীলংকার নাগরিকই বেশি। তা ছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র,

আন্তর্জাতিক এনজিও, চামড়া শিল্প, চিকিৎসাসেবা এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁয়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি কাজ করছে।

যাদের বড় একটা অংশ ভ্রমণ ভিসায় এসেছে। তাদের কাজের কোনো অনুমতি নেই। অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অবস্থান করা বিদেশিরা প্রতি তিন মাস পরপর নিজ দেশে ফিরে যায়।

তারপর দ্রুত নতুন পর্যটন ভিসা নিয়ে এসে একই বা একই ধরনের কাজে যোগদান করে।

সূত্র আরও জানায়, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) কর অঞ্চল ১১-এর অধীনে আয়কর দিয়েছে মোট সাড়ে ৯ হাজার বিদেশি কর্মী।

তাদের সম্মিলিত আয়করের পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি টাকা। মোট আয়ের ৩০ শতাংশ আয়কর হিসেবে ওই সময় বিদেশি কর্মীদের মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি টাকা।

আর মাসিক গড় বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ হাজার টাকা বা ৬০০ ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের আয়কর ফাঁকি

দেয়ার বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এনবিআর অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। কিন্তু কিছু বাধার কারণেই বিদেশি কর্মীরা বড় অঙ্কের আয়কর ফাঁকি দিতে পারছে, যা রোধ করা যাচ্ছে না।

এদিকে বিগত ২০১৬ সালে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় বিদেশিদের কর ফাঁকি অনুসন্ধানে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুলিশের এসবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়,

বেপজা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এনজিও ব্যুরো ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

ওই টাস্কফোর্সের কাজ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে কর ফাঁকিবাজ বিদেশিদের চিহ্নিত এবং কর্মরত বিদেশিদের ডাটাবেজ তৈরি করা।

কিন্তু সরকারের ওসব সংস্থা বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে কাজ করলেও দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের বিষয়ে কোনো সমন্বয় ছিল না।

তার ওপর সিআইসি ডাটা ব্যাংকের কার্যক্রম যখনই স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করে, তখনই বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসতে থাকে।

ফলে ওই কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। ফলে এখনো এদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যাই বের করা সম্ভব হচ্ছে না।