হামিদার কবর থেকে জাগুক মানবতা

ওয়াসিম ফারুক
প্রতিটা মানুষের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে যা পূরন করা কখনো রাষ্ট্র আবার কখনো সমাজের দায়িত্ব। কিছু মানুষের সেই অধিকার কখনো রাষ্ট্র আবার কখনো বা সমাজ বঞ্চিত করে।

জন্মের পর প্রতিটি শিশুই তার মা-বাবার পরিচয়ের পাশাপাশি একটি ধর্মীয় পরিচয়ে বড় হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মা-বাবার ধর্মীয় পরিচয়েই পরিচিতি পায় প্রতিটি শিশুর ধর্ম।

ঠিক তেমনি মৃত্যুর ক্ষেত্রে অর্থাৎ মৃত্যুর পরেও প্রতিটি ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় ধর্মীয় রীতিনীতি মেনেই।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমাদের সমাজের প্রতিটি ধর্মে বিশ্বাসী মানুষেরই কি মৃত্যুর পর ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য ভাগ্যে জোটে?

না মোটেও না। যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজের যৌনপল্লীর কর্মীদের ভাগ্যে মৃত্যুর পরে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে শেষকৃত্য জোটেনি।

মৃত্যুর পর যৌনকর্মীদের শরীরে ভারী পাথর বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় না হয় যৌনপল্লীর পাশেই কোথাও মাটিচাপা দেয়া হয়।

এটা শুধু যৌনকর্মীদের বেলায়-ই নয়, ট্রান্স জেন্ডার মানুষদের ক্ষেত্রেও মৃত্যুর পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে জটিলতা আছে আমাদের এই সমাজে। বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি আইন অনুযায়ী বৈধ।

হিউম্যান রাইট ওয়াচের প্রকাশিত তথ্য মতে, বাংলাদেশে ১৪টি বৈধ যৌনপল্লী আছে এবং সেখানে প্রায় ২০ হাজার যৌনকর্মীর বসবাস।

দেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী হলো রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লী।

এই যৌনপল্লীতে পাঁচ থেকে ছয় হাজার যৌনকর্মীর বসবাস থকলেও তাদের জীবন যাত্রারমান সম্পূর্ণ অমানবিক। আমাদের সংবিধান স্বীকৃত সমস্ত মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত।

যৌনকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে তারা যেমন আন্দোলন করে যাচ্ছেন পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একাট্টা।

এসব আন্দোলনের মুখেই বেশ কয়েক বছর আগে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর পাশেই একটা জায়গা দেয়া হয়েছিল যৌনকর্মীদের দাফনের জন্য।

তবে কোন যৌনকর্মীর মৃত্যু হলে তাকে গোসল জানাজা কাফন না দিয়েই শুধু মাটি চাপা দেয়া হতো। ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে যৌনকর্মীদের শেষকৃত্য করার দাবির আন্দোলন যৌনকর্মীদের বহুদিনের।

সম্প্রতি দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে মাদক, জোর করে দেহ ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে

যৌনপল্লীর কর্মীদের সংগঠন ‘অবহেলিত নারী ঐক্য’ এর নেত্রীবৃন্দের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

সভা চলাকালে খবর আসে যৌনপল্লীর প্রবীন বাসিন্দা হামিদা বেগমের মৃত্যু হয়েছে। হামিদা বেগমের মৃত্যুর খবরই যৌনকর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

দাবি আদায়ের আন্দোলন আর আবেগ দুটোই হামিদার ভাগ্যকে প্রসন্নিত করে। যৌনকর্মীরা মৃত হামিদা বেগমের ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে শেষকৃত্য সম্পন্নের দাবি জানান।

গোয়ালন্দ থানার ওসি আশিকুর রহমান তাদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে হামিদার জানাজা, কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করেন।

যদিও প্রথমে স্থানীয় ইমাম জানাজার নামাজে ইমামতি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে অবশ্য ওসির অনুরোধে ইমাম জানাজার নামাজে ইমামতি করতে সম্মত হন।

হামিদা বেগমের জানাজায় প্রায় শ’দুয়েক মুসল্লি শরিক হয়ে জানাজার নামাজ আাদায় করে হামিদার দাফন সম্পন্ন করেন।

পরে হামিদা বেগমের কুলখানিতেও শত পাঁচেক মানুষের অংশগ্রহণের কথা আমরা শুনেছি।

যৌনকর্মীদের দাবি ও ওসি আশিকুর রহমানের সহযোগিতায় একজন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ নিজস্ব বিশ্বাসকেন্দ্রিক প্রথার মধ্য দিয়ে জীবনের শেষের আনুষ্ঠানিকতা পাওয়ার যে অধিকার তা প্রতিষ্ঠিত হয়।

হয়তো বা অনেকের-ই প্রশ্ন জাগবে প্রশাসনের উপস্থিতির কারণেই হয়তে ইমাম হামিদার জানাজায় ইমামতি করতে সম্মত হয়েছেন।

না এটা আমি মোটেও বিশ্বাস করি না। মুসলমান অর্থাৎ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য কোন মুসলমানের মৃত্যু হলে তাকে শরীয়ত মোতাবেক দাফন করা ফরযে কেফায়া যা সমাজের জন্য আবশ্যকীয় পালনীয়।

যদি সমাজের কিছু লোক তা পালন করেন তা হলে তা পুরো সমাজের পক্ষ থেকে আাদায় হয়ে যায়। আর যদি তা সমাজের কোন মানুষ-ই পালনে ব্যর্থ হয় তা হলে এর জন্য পুরো সমাজ-ই দায়ী থাকবে।

যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন তারা এক বাক্যেই বলবেন পাপ পূণ্যের হিসাব নিবেন সৃষ্টিকর্তা আর পরকালের বিচারের ভার ও তারই উপর।

এই দুনিয়ার কোন মানুষকে পাপ পূণ্যের বিচারের অধিকার সৃষ্টিকর্তা দেন নি। এরপরেও আমরা সমাজের মানুষ অনেক সময় অনেকের ক্ষেত্রে সেই বিচার করি বা করছি।

যদি প্রশ্নটা এমন হয় একজন নারী কোন স্বার্থে তার ইজ্জত বিক্রি করে অর্থাৎ যৌন ব্যবসা বেছেন নেন?

উত্তরটা একদম সোজাসাপ্টা যৌনপল্লীর প্রতিটি বাসিন্দাই কোন না কোনভাবে জীবন জীবিকার প্রয়োজনেই বেছে নেন এই পেশা।

আর যৌনবৃত্তি পৃথিবীর আদিম পেশার একটি। আমাদের তথা কথিত সভ্য সমাজ কি কোনভাবেই নারীদের এই পেশা থেকে ফিরিয়ে এনে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে?

না মোটেও না বরং অন্ধকার যৌনপল্লীর ঐ বাসিন্দাদের বেশ্যা বলে গালি দিতে মোটেও দ্বিধা বোধ করে না।

অথচ তথাকথিত এই সভ্য সমাজের কোন না কোন পুরুষ-ই ঐ বেশ্যাদের খদ্দর। সভ্য সমাজের কাছে বেশ্যা বলে যারা পরিচিত তারা ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও যদি মৃত্যুর পর

ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে শেষকৃত্য না পায় তা হলে সভ্য সমাজের বেশ্যাদের ঐ খদ্দরেরা মৃত্যুর পরে কিভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে শেষকৃত্য পায়?

আমরা তো দেখি না সমাজের প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিবাজ ঘুষখোর সুদ ধর্ষক খুনি কোন অপরাধী কে মৃত্যুর পর পাথর বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় কিংবা মাটি চাপা দেয়া হয়।

এমন কি ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত মানুষটাকেও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। তবে কেন কার স্বার্থে এক জন যৌনকর্মীর মৃত্যুর পর তার এই করুন দশা হবে?

তাই হয়তো মানিক বন্দোপাধ্যায় সব কিছু বিবেচনা করেই তার পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

তবে যারা ধর্মে বিশ্বাসী তারা সবাই বিশ্বাস করেন সৃষ্টি কর্তার উপস্থিতি সব খানেই। গোয়ালন্দ থানার ওসি আশিকুর রহমানের সহযোগিতায় হামিদা বেগমের মৃত্যুর পর ধর্মীয় রীতিনীতি

মেনে তাকে শেষকৃত্যের মাধ্যমে শেষ বিদায় দেয়া হয়েছে। এটি একটি মানিকতার পরিচয় বহন করে। এজন্য গোয়ালন্দ থানার ওসিসহ থানার সব সদস্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য।

আর কোন যৌনকর্মীকে মৃত্যুর পরে যেন পাথর বেঁধে নদীতে না ডুবিয়ে দেয়া হয়, আর কোন যৌনকর্মীকে যেন মৃত্যুর পর কাফন জানাজা ছাড়া মাটি চাপা না দিতে হয়।

হামিদার মত প্রত্যেক যৌনপল্লীর প্রতিটি যৌনকর্মীর-ই মৃত্যুর পর তার বিশ্বাসের ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে শেষকৃত্য হবে এমনটাই প্রত্যেক মানবিক মানুষের চাওয়া।

লেখক: কলামিস্ট