‘ব্যর্থতায়’ কমছে বিদেশী সহায়তা

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ব্যর্থতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) যথাসময়ে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ৬ মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অর্থব্যয় কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) বরাদ্দ চূড়ান্ত করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

কঠোর গোপনীয়তায় চলতি অর্থবছরের বৈদেশিক সহায়তা হিসাব-নিকাশ করে ইআরডি।

শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল গত অর্থবছরের চেয়ে এবার কম টাকা কাটছাঁট হবে। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবে উঠে এসেছে উল্টোচিত্র।

এডিপি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অতিসম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়ে ইআরডির পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যয় বিভাজন সম্পর্কে জানানো হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা এতো টাকা কমানোর কারণ খুঁজে পাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে অবশ্যই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ব্যর্থতা দায়ী। ইআরডি ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বরাদ্দ কাটছাঁট করা হচ্ছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বেশি।

পরিকল্পনা কমিশনকে দেয়া ইআরডির প্রাক্কলনের হিসাবে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা অংশে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

সেখান থেকে ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপির জন্য বরাদ্দ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।

তাছাড়া খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে পরিবহন খাতের বরাদ্দ।

ওই খাতে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৯১৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সেখান থেকে ৩ হাজার ৮০২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা কমিয়ে আরএডিপিতে রাখা হচ্ছে ১৭ হাজার ১১২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, মূল এডিপি থেকে সংশোধিত এডিপিতে প্রতি বছরই বরাদ্দ কমে।

কিন্তু গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় এ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ বাড়ছে ১১ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা অংশে বরাদ্দ ছিল ৫১ হাজার কোটি টাকা।

মূলত বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগী সংস্থা বা দেশের অনুমতি নিতে হয়। তাতে বেশকিছু সময় চলে যায়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।

সূত্র আরও জানায়, অনেক ক্ষেত্রেই ঋণচুক্তির সময় উন্নয়নসহযোগীরা অহেতুক কিছু শর্ত আরোপ করে, যা এদেশের কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন না।

ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। দেখা দেয় অর্থছাড়ে জটিলতা। তাছাড়া প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা এবং উদাসীনতায়ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি হয় ধীর।

চলতি অর্থবছরে ইআরডির প্রস্তাবিত ১৭টি খাতে বরাদ্দ হলো— কৃষি খাতে এক হাজার ৭৬৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা,

যা মূল এডিপিতে ছিল ২ হাজার ৭৯১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। পল্লী উন্নয়ন খাতে ২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা,

যা মূল এডিপিতে রয়েছে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। পানিসম্পদ খাতে ধরা হয়েছে ৯০৮ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু তার মূল বরাদ্দ এক হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

এছাড়া অন্যসব খাতে সংশোধিত এডিপিতে প্রাক্কলিত বরাদ্দ- শিল্প খাতে ২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা; বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার ৩১২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা;

তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে এক হাজার ২৮৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা; যোগাযোগ খাতে ৪১৭ কোটি টাকা;

ভৌত অবকাঠামো খাতে ৫ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা; শিক্ষা ও ধর্ম খাতে ২ হাজার ২০৩ কোটি টাকা; ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ নেই; স্বাস্থ্য, পুষ্টি,

জনসংখ্যা এবং পরিবারকল্যাণ খাতে ৩ হাজার ৭০৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা; বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে ১২ হাজার ১৫৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা;

গণমাধ্যম খাতে ২২ কোটি টাকা; শ্রম ও মানবসম্পদ খাতে ১৮ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ খাতে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে ওসব খাতে কারিগরি সহায়তা কর্মসূচিতেও কিছু বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এদিকে গত অর্থবছরের (২০১৮-১৯) এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা বরাদ্দ ছিল ৬০ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু সেখান থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ছেঁটে ফেলে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ৫১ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়।

কিন্তু ওই বরাদ্দও পুরোপুরি ব্যয় হয়নি। পুরো অর্থবছর বৈদেশিক সহায়তা অংশ থেকে ব্যয় হয়েছিল ৪৭ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা বা ৯২ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

অব্যবহৃত অর্থ থেকে যায় ৩ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। বৈদেশিক সহায়তা বাস্তবায়নের এ হার তার আগের অর্থবছরের (২০১৭-১৮) তুলনায়ও কম।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব জানান, ইআরডির চিঠি এখনো আসেনি। তবে এতো টাকা কমার তো কোনো কারণ নেই।

অর্থবছরের শুরু থেকেই বৈদেশিক সহায়তাসহ সার্বিক এডিপির বাস্তবায়ন বাড়ানোর জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দের চিঠি পেলে তার কারণ খতিয়ে দেখা হবে।

একই বিষয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ জানান, প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিটি প্রকল্প প্রস্তাবে কোন বছরে কত টাকা এবং কোন কোন খাতে কত ব্যয় হবে, তার একটি পরিকল্পনা থাকে।

কিন্তু সে অনুযায়ী খরচ হচ্ছে না। এখানে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর দক্ষতা ও অবহেলা রয়েছে, যা মোটেও কাম্য নয়।