নাজিয়া নিগারের একগুচ্ছ কবিতা

সপ্তর্ষি
ঝিলের চাঁদেই মত্ত বেশুমার প্রাণ
অভীপ্সায় ধরা পড়ে তামাকের ঘ্রাণ!

শান বাঁধা ঘাটে খেলে যে মাতাল হাওয়া,
হিজলের বনে তার নিত্য আসা যাওয়া।

শীতল পাটির মনে বিছায়ে আঁচল,
শিস দিয়ে ডাকে তারে সোহাগি কাজল।

বুকের পাঁজরে ডাকে উদাসী কোকিল,
ইচ্ছেগুলো নীল রঙে ডানা মেলা চিল!

সপ্তর্ষির কাছে রেখে বৈঠকির সুরে
রাত্রি সব বসে থাকে কাটাতার জুড়ে!

পীড়ন
আমার একলা আকাশ বাঁচে তোমার প্রেমহীন মায়ায়
নিঃস্ব হয়েও পড়ে আছি তুমি নামের ছায়ায়।

নিঃশ্বাসে আজ চলছে দারুণ ক্ষরণ
তুমিহীন এ বুক পাঁজরে শূন্যতারই পীড়ন!

তোমায় ভেবে দুপুর কাটে রোদের আলসেমিতে,
আজও তোমায় আঁকড়ে থাকি মৌন খুনসুটিতে!

তুমি নামের ব্যকুলতায় মেঘের খামে পাঠাই চিঠি,
মিনতিঘেরা ফুল নিয়ে তোমার কাছে আজও ছুটি!

এখনো যে তোমায় ভেবে নিত্য আমি কাব্য গড়ি,
খুব গোপনে মনাঙ্গনে একলা একা কেবল মরি!

তুমিহীন আজ ঝরাপাতা নিঃস্ব যেন আমার আমি,
বুকপাঁজরে মিশে আছ অধরা প্রেম শুধুই তুমি!

প্রশ্ন
হুম, তুমি ঠিকই বলেছো—
বিটপীকে ভালোবেসে
হয়নি সখ্য আমার মাছেদের সাথে
কচ্ছপের চোখে চোখ রেখে হয়নি মনের আদানপ্রদানও
বাতাসে কান পেতে শোনা হয়নি কী তার দুঃখবোধ
জলের সাথেও হয়নি সঙ্গম
চাঁদকে বলা হয়নি কামুকতার গল্প
রোদকে করা হয়নি আলিঙ্গন!

নীল কালিকে চুমু খেয়ে করা হয়নি
শিহরণের মহাকাব্য
মেঘের আঙুলে আঙুল রেখে বাঁধা হয়নি পাঁজরে আকাশের গভীরতা,
সন্ধ্যাকে রাখা হয়নি চোখের তারায়
রাতকে বলিনি কতোটা ক্লান্তি এলে
মুছে যায় জীবনের গতিধারা

ভেতরে এতোটা ভাঙচুর,
দগ্ধ জ্বালা, উদ্ভ্রান্ত পথিক এক
আমি বলি বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনটাই বড়ো প্রয়োজন
তাইতো বিটপী আমার প্রেম,
আমার ভালোবাসা,
আমার বাঁচার উপজীব্য!

মৃদুহাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে তোমার প্রস্থান!
আমি কেবল মনে মনে ভাবি—
ওভাবে কেন চলে গেলে
কিছু কি বলার ছিলো তোমার?

কৃপা
থমকে গেছে আধুনিক সভ্যতা;
নৃলোকের বিবর্ণ দুয়ারে চেয়ে আছে প্রাণঘাতী অণুজীব,
অনুভবে দেহখাঁচার চিৎকার।
মৃত্যুও আজ কেঁপে ওঠে ক্ষুদ্র অণুজীবের তাণ্ডবে!
বন্ধ উপাসনালয়ে ইশ্বরের নীরব প্রতিবাদ
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়ে‌ছে দোর্দণ্ড প্রতাপে!
পাপের পঙক্তি ঘিরে দাঁড়িয়েছে যে
সভ্যতা মহাকালের বুকে,
পর্যুদস্ত সে আজ অণুজীবের চাবুকে।
মুখবন্ধনীর কফিনে বন্দী অসহায় মানবাত্মা!

জীবনের চাকায় মরীচিকা সময় হাতছানি দিয়ে ফিরিয়ে নেয় মু্খ
কানাগলির অন্ধকার প্রাচীরে!
শূন্য করপুটে নত মাথা আজ প্রাণভিক্ষার কৃপা খোঁজে!
অবশেষে মানবাত্মা মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে
নিঃস্ব হয়ে ইশ্বরের কোলে মাথা গোঁজে!

সিরামিক ফ্রেম
ভালোবাসো কি বাসোনা সে পরোয়া এখন আর করিনা।
রামধনুর রঙে হৃদয় রাঙিয়ে
প্রেমসমুদ্রে আফ্রোদিতি সাঁতার কাটে অবিচল!
দূর হতে হাতছানি দেয়
মুখ থুবড়ে পড়ে রই নিশ্চল!

ভরা পূর্ণিমায় জোৎস্না পান করে ডানা ঝাপটায় চাতকিনী মন,
তোমাকে পাবার অসুখে এখন ভোগেনা আর এ হৃদয়
ক্ষতগুলোও শুকিয়ে হয়েছে গত
লাল মলাটের আবেগে।
পোশাকী প্রেমের প্রয়োজনে সময় তার খেয়ালি বিলাপ করেনা আজকাল!

বারান্দার ভেঁজা কাপড়ে ঝুলে থাকে তোমার কোনো একসময়ের দেওয়া এলুমিনিয়াম প্রেম,
আমি নিকোটিনের আগুনে কবেই সেসব পুড়িয়ে গড়েছি এক সিরামিক ফ্রেম!
তাতে তোমার প্রেম ঝুলিয়ে
আকাশের বিশালতা দেখি।

ইঁটকাঠের পাথুরে শহরে ভালোবাসাকে আজ মনে হয়
বড়ো বেশি মেকী!