আম্পানের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত উপকূল

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০, লক্ষাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত, বিদ্যুৎবিহীন এক কোটি ৩০ লাখ গ্রাহক

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা। আম্পান চলে গেলেও ২৬টি জেলায় রয়ে গেছে তার ক্ষতচিহ্ন।

শতাব্দীর সেরা এ সুপার সাইক্লোনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। গাছ, ঘর ও দেয়ালচাপা পড়ে, নৌকা ও ট্রলার ডুবে এদের মৃত্যু হয়।

অনেকেই নিখোঁজ থাকায় এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। শতাব্দীর ভয়াবহ এই ঘূর্ণিঝড় লক্ষাধিক কাঁচাপাকা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম, ভেসে গেছে সহস্রাধিক চিংড়ি ঘের, বিনষ্ট হয়েছে দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল, ভেঙে গেছে কয়েক লাখ গাছপালা।

আম-লিচুসহ অন্যান্য ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ঝড়ের তাণ্ডবে দুই কোটি ২০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, এর মধ্যে এখনো এক কোটি ৩০ লাখ গ্রাহক সংযোগ ফিরে পাননি বলে জানা গেছে।

একই সঙ্গে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায়ও চরম ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতায় স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠন, সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে অংশ নিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ এর তাণ্ডবে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব দিয়েছে সরকার।

শক্তিশালী এই ঝড় কেটে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার সচিবালয় থেকে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান এই হিসাব দিয়ে বলেন, মোট ২৬টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঝড়ে সারাদেশে ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্যও জানিয়েছেন তিনি। যদিও স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা।

বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার রাতে ঘূর্ণিঝড়টি যখন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন দুই কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যা দেশের মোট গ্রাহকের প্রায় ৬০ শতাংশ।

ঝড়ের তীব্রতা কমার পর বৃহস্পতিবার ভোর থেকে দুর্গত এলাকায় সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করে বিতরণ সংস্থাগুলো। তবে দুপুর পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ ফিরিয়ে দেয়া যায়নি, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় এক তৃতীয়াংশের বেশি।

এর মধ্যে গ্রিড সাব স্টেশনে আগুন লাগায় কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎহীনতার কবলে পড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ভোলা, বরগুনা, বরিশাল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় গাছ পড়ে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, পোল ভেঙে পড়েছে।

এদিকে আম্পানে নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎবিভ্রাটে কয়েক হাজার নেটওয়ার্ক সাইট পরিচালনায় সমস্যা পোহাতে হচ্ছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত টাওয়ারের প্রায় ৩০ শতাংশ বা ১৩ হাজার সাইট জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছিল না।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ হাজার মোবাইল টাওয়ার রয়েছে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর ও রাজশাহীর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ মোবাইল সাইট ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে অ্যামটব।

অন্যদিকে গাছ, ঘর ও দেয়ালচাপা পড়ে, নৌকা ও ট্রলার ডুবে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যশোরে ছয়জন,

পটুয়াখালীতে দুজন, বরগুনায় দুজন, ভোলায় দুজন, পিরোজপুরে তিনজন, সাতক্ষীরায় তিনজন, ঝিনাইদহে একজন ও চাঁদপুরে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, যশোর, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে বাঁধ ভেঙে এবং জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব শেষ হওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরে গেছেন মানুষ। অনেকেই বাড়িতে ফিরে দেখেছেন ধংসস্তূপ।

অন্যদিকে আম্পানে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘বরাবরের মতো এবারও সুপার সাইক্লোন আম্পানে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বনের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে সহকারী বন সংরক্ষক পদাধিকারী রেঞ্জ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চার কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিগুলোকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

বৃহস্পতিবার মন্ত্রী তার ঢাকার সরকারি বাসভবন হতে ভিডিও কনফারেন্সে ঘূর্ণিঝড় আম্পান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন।

বনমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী সুন্দরবনে বন বিভাগের ১০টির বেশি কাঠের জেটি এবং ৩০টির বেশি স্টাফ ব্যারাকের টিনের চালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বন বিভাগের ৬০টির বেশি পুকুরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করেছে। গাছগাছালির মধ্যে কেওড়া গাছ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।