চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বাজেট

Bangladesh-Budget

৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা: ঘাটতি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: সারাবিশ্বের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। এই মহামারির মধ্যেই বিপর্যস্থ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে এ বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যা অর্থায়ন সংকটের অভাবে অর্জন করা কঠিন হতে পারে।

তবে এ বাজেট বাস্তবায়ন হলে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা যাবে।

অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিজের দ্বিতীয় এবং দেশের ৪৯তম বাজেটের জন্য মুস্তফা কামাল যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন তার আকার ধরছেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার।

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য তিনি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয়েছে অর্থমন্ত্রীকে।

আর তাই এবার বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রেকর্ড ঘাটতি অর্থায়নের পথেই এগিয়েছেন তিনি। এবারের বাজেট ঘাটতি হচ্ছে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ।

বছর ঘুরলে যেহেতু ব্যয় বাড়ে, ফলে সেই ব্যয় মেটাতে তিনি দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর বেশি ভরসা করছেন। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা আগামী অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছেন।

‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শীর্ষক এ বাজেটের প্রবৃদ্ধির হার ধরছেন তিনি ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।

নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের অন্ন ও বস্ত্রের জোগানের জন্য অর্থনীতির চাকা সচল রাখাই হবে আগামী বাজেট প্রণয়নে তার অগ্রাধিকার।

এ জন্য তিনি বিভ্রান্ত, ভীত বা আতঙ্কিত হবেন না। তিনি বলেন, দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই সরকার এই সংকট মোকাবিলায় নানাবিধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

জরুরি স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার এক লাখ কোটি টাকার ওপরে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

বাজেটেও সেই অনুযায়ী নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটে বিপর্যস্থ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

তাদের মতে, বাজেটে রাজস্ব আয় এবং প্রবৃদ্ধির যে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়।

বাজেটের আকার

নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই ব্যয় তথা আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।

টাকার অঙ্কে যা ৬৬ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা বেশি। চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়ায় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা।

এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। আর অনুন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৫৭ হাজার কোটি টাকা।

আয়ের উৎস

আসছে বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

এ ছাড়া করবহির্ভূত অন্যান্য আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছরেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থেকে যায়। আর এ বছর করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সেই ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে।

রাজস্ব আদায়ে এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ঠেকানোই এখন এনবিআরের বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের মোট ব্যয়

এবারের বাজেটে সরকার মোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চলতি বাজেটে যা ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।

তবে সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে করা হয় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য ব্যয়বাবদ খরচ ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে বেতন-ভাতাবাবদ ব্যয় রাখা হচ্ছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সরবরাহ ও সেবাবাবদ ব্যয়ে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধবাবদ রাখা হচ্ছে ৬৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা।

সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও অনুদানবাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ থাকছে ২ লাখ পাঁচ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশ

আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের এ বিশাল ফারাকে এবারই প্রথম দেশের ইতিহাসে মোট বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে।

এর আগের বছরগুলোতে সাধারণত জিডিপির ৫ শতাংশ হারে ঘাটতি ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হতো। এ বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকার কোন খাত থেকে কত টাকা ঋণ নেবে তারও একটি ছক তৈরি করেছে।

ছক অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে, অংকে যা ৮৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে যা আছে ৬৭ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান ধরা হচ্ছে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে যা রয়েছে ৩ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎস অর্থাৎ ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতির বড় একটি অংশ পূরণ করতে চায় সরকার।

ব্যাংক খাত থেকে ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে যা ছিল ৭২ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে ঋণ নিতে চায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

চলতি বাজেটে (সংশোধিত) যা ছিল ১৪ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা।