নারী বান্ধব গণপরিবহন সৃষ্টিতে সরকারি উদ্যোগ

Bus

আলম শামস
সাদিয়া ইসলাম (ছদ্মনাম) রাজধানীর আজিমপুর সহকারি বদরুন্নেছা কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সাদিয়া প্রতিদিন যাত্রাবাড়ি থেকে বেসরকারি বাসে কলেজে যাতায়াত করে।

গণপরিবহণে যাতায়াত করতে গিয়ে তাকে মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে হতে হয়। ক’দিন আগের ঘটনা। সকাল ৯টায় প্রথম ক্লাশ ধরার জন্য সাদিয়া তাড়াতাড়ি সকালের নাস্তা খেয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বাসে প্রচণ্ড ভীড়। কলেজে যাবার তাড়া থাকায় সাদিয়া ভীড় ঠেলে বাসে ওঠে। বখাটে কয়েকটি ছেলে তার গায়ে হাত দেয়। সাদিয়া প্রতিবাদ জানালেও বাসের ভিতরে অন্য যাত্রীর কেউই সাদিয়াকে সাহায্য করে নি।

কিছু নির্লজ্জ লোক এটা উপভোগ করতে থাকে। আবার কেউ বলে প্রাইভেটকারে যাতায়াত করলেই তো পারেন। সাদিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

এই সমস্যা ছাত্রী এবং কর্মজীবী নারীদের এখনো রয়েছে। বর্তমানে নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহন বৃদ্ধি পেয়েছে। তেমনি গণপরিবহণে নারীর যাতায়াতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সে অনুযায়ী কর্মজীবী নারীদের জন্য মহিলা বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি। সরকারি চাকরিজীবীদের বেশিরভাগই অফিসের গাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের নারীদের অফিসের গাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ কম।

ফলে অফিসে যাওয়ার সময় বাসে উঠতে না পারায় নারীদের পক্ষে ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছানো যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি অফিস ছুটির পর ক্লান্ত শরীরে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় একটি মহিলা বাস কিংবা সাধারণ বাসে ওঠার অপেক্ষায়।

ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটির শর্তানুযায়ী, ঢাকার বড় বাসে নয়টি এবং মিনিবাসে ছয়টি আসন শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত।

তবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের এ শর্ত অনেক বাসেই মানা হয় না। আবার মানলেও সেসব আসন বেশির ভাগ সময় পুরুষ যাত্রীরা দখল করে রাখে।

আসন ছেড়ে দেয়ার কথা বললে নানারকম কটূক্তি করতে থাকে। পাশাপাশি নির্ধারিত আসনের বাইরে বসতে গেলেও নারীদের শুনতে হয় নানা আপত্তির কথা।

এভাবে নিয়মিত বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি ঠেলে দেরিতে অফিসে গিয়ে শুনতে হয় বসদের তিরস্কার।

প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭ এর ধারা ৪৫ এর দ্বিতীয় অংশের (খ) এ বলা হয়েছে, মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য সংরক্ষিত আসনের অন্য কোনো যাত্রী বসবেন না বা বসবার অনুমতি দেওয়া যাবেনা।

যদি কেউ এই আইন অমান্য করেন তাহলে অনধিক এক থেকে তিন মাস কারাদ- বা অনধিক পাঁচ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড- বা উভয়দণ্ড হবে।

অথ্যাৎ কোনোভাবেই আর সংরক্ষিত আসনে নির্দিষ্ট ব্যক্তিগণ ব্যতিত অন্য কেউ বসতে পারবেন না। সরকার মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের যাতায়াত বা চলাচলের সুবিধার্থে এ আইন প্রণয়ন করেছে।

আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের দুর্দশা কমবে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ও ছাত্রীদের গণপরিবহনে ওঠার জন্য আর ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।

মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রথমে দরকার গণপরিবহনে ওঠা নিশ্চিত করা। অনেকে দাঁড়িয়ে যেতে রাজি থাকেন জরুরি প্রয়োজনে, কিন্তু তাদের উঠতে দেয়া না হলে, নির্ধারিত আসন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যাবে না।

আর্থিক সামর্থ্যরে অভাবে সবার পক্ষে ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করা সম্ভব হয় না। রাজধানীতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের চলাচলের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হচ্ছে গণপরিবহণ।

কিন্তু গণপরিবহণে যাতায়াত করার সময় প্রায়ই নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ছাত্রী এবং নারী কর্মজীবীদের।

যারা একা চলাচল করেন তাদের এই সমস্যা বেশি মোকাবেলা করতে হয়। অনেকেই মুখ বন্ধ করে এই অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য হন। কারণ প্রতিবাদ করতে গেল আরো বেশি করে বিব্রত হতে হয়।

কর্মজীবী নারীর সংখ্যা রাজধানীতে অনেক বেশি। তাই অফিস-আদালতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা বিড়ম্বনা ও ভোগান্তিতে পড়েন বেশি। চাকরি ছাড়াও নানা সময় নানা প্রয়োজনেও ঘরের বাইরে নারীদের যাতায়াত করতে হয়।

বাইরে বেরিয়ে তারা যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন তারমধ্যে পরিবহন সঙ্কট ও পরিবহনে যৌন হয়রানি অন্যতম কারণ। তাছাড়া অফিস টাইমে ও ব্যস্ত সময়ে অনেক সাধারণ বাসেও নারীদের ঠাঁই হয় না।

বাসে তুলতেই হেলপার-ড্রাইভাররা অনীহা প্রকাশ করে। ঢাকার সড়কে ১৯টি বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে।

এর মধ্যে সকাল ৯টা ৫ মিনিট ও ১০টা ১০ মিনিট রাজধানীর তালতলা থেকে মতিঝিল এবং সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিট ও ৬টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে তালতলা,

সকাল সাড়ে ৮টায় নতুনবাজার থেকে মতিঝিল এবং বিকাল ৬টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে নতুন বাজার, সকাল সোয়া ৭টায় ও সোয়া ৮টায় আবদুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল

এবং বিকাল সোয়া ৫টায় ও সোয়া ৬টায় মতিঝিল থেকে আবদুল্লাহপুর, সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর-১২, মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল বাস ডিপো

এবং সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মতিঝিল দ্বিতল বাস ডিপো থেকে মিরপুর-১২ ও মিপুর-১০, সকাল ৮টায় মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় মতিঝিল থেকে মিরপুর-১০,

সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুর, সকাল পৌনে ৮টায় ও সোয়া ৮টায় নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল

এবং বিকাল সোয়া ৫টায় ও ৬টায় মতিঝিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। রাজধানীর মিরপুর-১২ থেকে আসাদগেট হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত মহিলা স্কুল বাস সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়া মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ নুতন আঙ্গিকে দোলনচাঁপা মহিলা বাস সার্ভিস মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাতায়াত করছে। কর্মজীবী নারী সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তা বিবেচনায় নিয়ে বিআরটিসি মহিলা বাস আরো বাড়ানো জরুরি।

নিরাপত্তার স্বার্থে পুরুষের পাশাপশি নারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কর্মজীবী নারীদের চলাচলে ও যাতায়াতে নারীবান্ধব আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে।

দিন দিন যেমনিভাবে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ছে, ঠিক তেমনিভাবে টাউন সার্ভিস পাবলিক বাসে নারীদের আসনসংখ্যা বাড়ানো দরকার। বাড়ানো প্রয়োজন কর্মজীবী নারীদের জন্য চলমান বাসের সংখ্যা।

রাজধানীর সব রুটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মহিলা বাস খুবই জরুরি। এ জন্য বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিসের রুট ও শিফট বাড়ানোসহ সার্ভিসের মানোন্নয়নও জরুরি।

দরকার বেসরকারি খাতে মহিলা বাস সার্ভিস চালু উৎসাহিত করা। সরকার নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে বদ্ধ পরিকর।

এ লক্ষে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ অন্যতম।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নারীনিগ্রহের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সদা তৎপর রয়েছে। ভ্রাম্যমান আদালত দ্রুত বিচার আইনে অপরাধীদের সাজা দিচ্ছে।

এছাড়া মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফোন-১০৯, দুদকের টোল ফ্রী হটলাইন-১০৬, জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এবং সরকারি তথ্য সেবা- ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়।

তবে শুধু সাজা দিয়ে নয়, পরিবারে বা কর্মস্থলে, ঘরে কিংবা বাইরে সবখানে নারীর সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

নারীর অমর্যাদা কোনো সভ্যসমাজ বরদাস্ত করে না। নারীকে বাদ দিয়ে নয়, নারীকে অসম্মান করে নয়, বরং নারী-পুরুষ উভয়ে একাত্ম হয়ে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বর্তমান সরকার কর্মজীবী নারীদের যোগাযোগ ও পরিবহন সমস্যা সামাধানে যথেষ্ট আন্তরিক।

গত যে কোনো সময়ে তুলনায় বর্তমানে বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিসের সংখ্যা বেশি। সামনে আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া পরিবহন খাতে বিদ্যমান অরাজকতা রোধে যোগাযোগমন্ত্রীকে প্রায়ই তৎপর দেখা যায়।

অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজে অনিয়ম পরিদর্শন করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে রাস্তা-ঘাটে চলাচলের সময় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে নারীদের।

নিজেদের অসহায় ভাবার কোনো কারণ নেই। অন্যায়কারি সব সময়ই দুর্বল চিত্তের হয়ে থাকে। তাই প্রতিবাদ করলেই তাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়েত বাধ্য।

আর যারা যারা আশে-পাশে থাকেন তাদেরও মনে রাখতে হবে যে, আপনার আপন জন কেউ এমন পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। কাজেই এখনই সময় প্রতিবাদ করার, প্রতিরোধ গড়ে তোলার।

মুখ লুকিয়ে থাকার কোনো অবকাশ নেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারীদের চলার পথ হোক সুগম ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ।