অন্তরাশ্রমের কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

পলিয়ার ওয়াহিদ
প্রথমে কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে চাই এবং আমার সাথে কবির দেখা, প্রথম পরিচয়, কবির আন্তরিকা ও কবিতায় মুগ্ধ হওয়াসহ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘অন্তরাশ্রম’ নিয়ে। এই লেখাটি তার চল্লিশতম জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলাম।

দেরিতে হলেও গৌরবের বিষয় এনামূল হক পলাশের কবিতার সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। অভিযোগ ছিলো যে, এই কবিতা আরো আগে পাইনি কেন?

নিজের সীমাহীন অযোগ্যতার খতিয়ানে ঘাড় গুজে চুপ থাকতে হলো। কবিতা পড়ে ভালো লাগলে মুখফুটে বলতে দ্বিধা করিনি কখনো।

হঠাৎ নেত্রকোণা ভ্রমণে গেলে আহমেদ তোফায়েল পলাশ ভাইয়ের কাছে নিয়ে যান। অবশ্য আমি ওকে বলেছিলাম কার কার সাথে সাক্ষাত করা যায়।

সে রকম কিছু মানুষের কাছে নিয়ে চলো। বলতেই ভূমি অফিসে উপস্থিত হই আমরা। সেখানে গিয়ে আবিস্কার করি এই শক্তিমান নিভৃতচারি কবিকে।

যদিও উনার নাম শুনেছি আগে। কিন্তু কবিতা পড়া হয় নি। মানুষের দায়িত্ব পালনে যিনি কবিতা লেখার চেয়ে বেশি আনন্দ পান তিনি নিজের দুটো কবিতার বই উপহার দিলেন।

মলাট উল্পে চোখ বুলালাম। সাথী ছিল ননষ্টট ধূমপান! অফিস বিধায় কাচুমাচু করলে পলাশ ভাই বললেন- ‘পলিয়ার জ¦ালিয়ে যাও’। এই উনার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। গাছ, নদী, জলের সাথে আড্ডা দিয়ে সে রাতে আমরা তোফায়েলের মেসে ফিরি।

যে দুটি বই আমাকে দিলেন একটার নাম ‘অন্তরাশ্রম’ অপরটি ‘মেঘের সন্ন্যাস’। নাম শুনেই কবির অন্তর্দৃষ্টি অনুভব করা যায়। সকালে ট্রেনে ফেরার সময় ব্যাগ থেকে ‘অন্তরাশ্রম’ বের করি।

প্রথমে নাম কবিতা অন্তরাশ্রমে ঢুকেই বের হয়ে যাই। তারপর আমাকে চুষে নেয় ‘আধুনিক সংসার’ শিরোনামের কবিতাটি। নাকি আমি কবিতাটিকে ছেনে নিতে থাকি; বুঝতে পারি না।

বার বার পাঠ করি। পলাশ ভাইকে ফোন করি। ভাই এ কেমন কবিতা লিখলেন? আমাকে তো শূন্য করে ফেলল! এতো সার্থক কবিতা যে কতো দিন পড়িনি।

মনটা আমার শূন্য থেকে পূর্ণ হতে চলেছে। যেন মহামূল্যবান কিছু একটার সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। তিনি জানেন অল্প কথায় কীভাবে ফিলোসফি কবিতার শরীরে গেঁথে দিতে হয়।

কাব্য টেকনিককে বাদ দিয়ে কবিতায় বাকপ্রতিমা স্থাপন করতে সিদ্ধহস্ত। এখন কবিতাটি পাঠ করে আসি।
‘খালের স্রোতে হাঁটু পানিতে নাইমা
চালুনে খেও দিয়া মলা-পুঁটি ধরতেছি।

তুমি পেছনে পুরোনো চুকরা হাতে খাড়াইয়া
মারা মাছ ভরতে থাকো ভরতে থাকো।
আমি মাছ মারা নিয়ে ব্যস্ত,
তুমি মাছ ভরা নিয়ে ব্যস্ত।

মাছের ভারে পুরোনো চুরকার তলা
ভেঙে গেছে আগোচরে কেউ কইতেই পারি না।’(আধুনিক সংসার-অন্তরাশ্রম)

তিনি নিজস্ব জনপদের মুখের ভাষাকে কবিতায় স্থান দিয়েছেন বুক উঁচু করে। গোয়ো আর আঞ্চলিক তকমাকে গায়ে না মাখিয়ে উল্লাসে প্রকাশ করেছেন কবিতার আপন বৈভব। কি অসাধারণ উপমায় আধুনিক সংসারকে ইঙ্গিত করলেন।

সত্যি বিস্মিত না হয়ে পারি না। এনামূল হক পলাশ ভাইয়ের কবিতা মূলত পাঠের, তা লিখে বোঝানো সত্যিই বোকামী। প্রতিটি কবিতা তিনি দর্শনরসে চুবায়ে পরিবেশন করেন সাদামাঠাভাবে।

আর এখানেই তার মুন্সিয়ানা ধরা পড়ে ষোলআনা। এতো সহজ ভাষায় প্রকাশ করেন যে, পাঠের পর রয়না মাছের মতো ফাঁদে হা হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না! যেন কি অজানাই না আমি জেনে গেলাম।

বা এ তো আমার জানা কিন্তু এমনভাবে ধাক্কা আগে তো কেউ দিতে পারিনি। এটুকুই মূলত পলাশ ভাইয়ের কবিতার প্রাণ। এই কবিতাটি নিয়েই আমি আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই।

‘স্বামী পানিতে নেমে মাছ ধরছেন আর বউ ডাঙায় বসে চুকরাতে মাছ ভরছেন। একজন মাছ ধরতে ব্যস্ত আরেকজন মাছ ভরতে ব্যস্ত। মাছের ভারে যে কখন পুরোনো চুরকার তলা ভেঙে গেছে কেউ খেয়ালই করিনি।’

সংক্ষেপে কবিতটি এমনই। এই গল্প দিয়ে পলাশ ভাই কি বলতে চেয়েছেন? তা আমরা কমবেশি বুঝি। আধুনিক যে ক্ষুদ্র সংসার আমরা বিভিন্ন কারণে গড়ে তুলছি।

তার পরিণতি কি ভয়াবহ! কিছুটা আভাস দিয়েছেন বোধ করি। আধুনিকতার নামে আমরা যে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। পারস্পারিক ভালোবাসা ও বন্ধন টুটে যাচ্ছে।

সেদিকে আমাদের কোনো খেয়াল নেই। আমরা সবাই উন্নতি করতে ব্যস্ত। কিন্তু এ কোন উন্নতি? যে উন্নতি মায়ের সেবা করতে দেয় না। সন্তানকে সময় দিতে দেয় না।

স্বামী-স্ত্রীকে একা করে তোলে। শুধু কি টাকা আর বাড়ি-গাড়ি দিয়ে জীবন চলে? জীবনের জন্যই তো এতো সব। তাহলে কেন আমরা জীবনকে তুচ্ছ করে।

সম্পর্ককে তুচ্ছ করে। মানবিক সম্পর্ককে তুচ্ছ করে। শুধু জাগতিক বস্তুতে আসক্তি হয়ে পড়ছি। আমরা সাদা চোখে দেখাচ্ছি, আমাদের কততলা বাড়ি হলো?

কয়টা গাড়ি হলো? কিন্তু তলে তলে যে আমাদের প্রেম-ভালোবাসা-সম্পর্ক-মায়া ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল! সেদিকে কারো খেয়াল করার সময় কোথায়?

আধুনিকতার ভয়াবহতা এতো সুন্দর করে প্রকাশ এর আগে আর কেউ করেছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু কবিতায় রূপকের অন্তরালে সেটা আবার জানিয়ে দিলেন।

একজন জেলে স্বামী হিসেবে। কবিতার ভাষাই এমন। ইঙ্গিত করে, ইশারা করে বলে যাওয়া। যার বোঝার সে বুঝে নেবে। সভ্যতার গোড়া পত্তন যারা করেন তারা তো এক ধরণের কাক।

আর কোকিল নামের ছলনাময়ীরা তার ফল ভোগ করেন। তেমনি আধুনিক সংসারের ফল অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নিজের আখের খতম হবার আগেই সাবধান হওয়া উত্তম।

এই জন্য একজন কবি কলম ধরেন। মানুষকে সতর্ক করেন। কারণ তিনি ভবিতব্য সবচেয়ে ভালো দেখতে পারেন। এই দার্শনিক কবিকে আমার অন্তর থেকে প্রেমময় ভালোবাস জানাই।

আর তিনি কবিতা প্রকাশ করেন সম্মানিত ভাষায়। কিন্তু তুমিকে আপনি বলার মাঝে কোনো চাতুর্য নেই। কবিতার পরতে পরতে আছে শ্রদ্ধার জলপাত্র আর ভালোবাসার নিবিড় ছায়া।

এ কারণে পলাশ ভাইয়ের কবিতার পাঠক খুব সহজে তার কবিতার ভেতর প্রবেশ করতে পারেন। মজা বা রসের আস্বাদন করতে পারেন। ক্লান্তি দূর করে ফুরফুরে হয়ে উঠতে পারেন।

ঝিমুনি থেকে সজাগ হয়ে উঠতে পলাশ ভাইয়ের কবিতার জুড়ি নেই। তাঁর কবিতার ভাষা আটপৌড়ে। একেবারে মা-খালাদের মুখের ভাষার কাছাকাছি।

কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে তিনি আধুনিক রূপক ব্যবহার করেন সর্তকতার সাথে। নতুন নতুন শব্দ আবিস্কারেও তিনি উন্মুখ। নিরব, লাজুক ও পরিমিত টাইপের ব্যাক্তি পলাশ ভাইয়ের ব্যবহারের সাথে তাঁর কবিতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় এটা খুবই আনন্দের।

‘ঘাসফুল’ কবিতাটি দুই লাইনের। কিন্তু কবিতা তো কবিতাই। লাইন একটা বা দুটো দিয়ে কি হবে। চিন্তার খোরাক দিতে পারলেই সার্থক। কবিতাটি পাঠ করে ফেলি।

‘যাওয়া হবে না বৃক্ষের কাছাকাছি/ তাই দাঁড়িয়েছি সূর্যের মুখোমুখি।’ কি অর্থপূর্ণ চিন্তা। জীবনযুদ্ধে শুয়ে পড়া মানুষকে যেন আরো উসকে দেয়া।

কারণ আমরা যতই সাধনা করি না কেন, চেষ্টা করি না কেন বৃক্ষ হবার মিথ্যে আশা পূরণ হবে না। ঠিক কিন্তু তার চেয়ে বড় সাধনা আমরা হরহামেশা করে ফেলি।

কারণ সূর্যতো আরো বড় কিছু। তার কাছে পৌছানো তো দূরের কথা ভাবাই যায় না। তার মানে মানুষ যে অসাধ্য সাধন করতে পারেন বা তারা সেই সাহস রাখেন; সেটাই মূলত কবি বলতে চেয়েছেন।

আমাদের মতো ভীতু পাঠককে তিনি নরম কোমল বৃক্ষের কাছে না নিয়ে সরাসরি সূর্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবার সাহস সঞ্চায় করতে বলেন। এটাই একজন প্রকৃত কবির কাজ বলেই আমি মনে করি।

তাঁর ‘ভাসানী’ কবিতাটিও আমার প্রিয়। ‘পৃথিবীর বাস্তুচ্যুত যে সকল মানুষ/ বেদনাকে অবলীলায় শক্তি বানিয়েছেন/ নিজের কাঁধে তুলে বয়ে নিয়ে ফিরছেন/ অবদমনের বিষ আর দলন নিপীড়ন,/ তাদের সকলের নাম ভাসানী।’

আহারে ভাসানীর মাজার সন্তোষে গিয়ে আমি শীতল হয়ে গিয়েছিলাম। আগুনের মতো মানুষদের কাছে থেকে আমরা কি শিখলাম?

‘মা’ শিরোনামের কবিতাটি একটু পড়ি। ‘জীবনের যতটুকু দুঃখবোধ আছে/ সবটুকু লুকিয়ে আছে মায়ের আঁচলে/ পৃথিবীর জননীর রূপ চিরায়ত দুঃখ/ আর সন্তানেরা এক একজন পরিব্রাজক/ শীতল অনুভূতি দূরে দূরে চলে যেতে থাকে/ একাকী নিঃসঙ্গতা চাপে পরিব্রাজকের ঘাড়ে।’

মা আমাদের কত বড় সম্পদ অথচ তিনি চিরকাল দুঃখ নিয়ে হাসেন। আমরা বড় হতে থাকি। মায়ের স্বপ্ন বড় হতে থাকে। আমাদের কাছে অন্যের স্বপ্ন এসে হাজির হয়।

মাকে আমরা ভুলে যায়। আমাদের সন্তান হয়। আমরা পিতা হই। মাতা হই। তখনও আমাদের মা-ই একা। আমাদের মায়ের নাম যেন দুঃখ পরিবহন!

এই লেখাটা লিখতে পেরেছি কবি সরোজ মোস্তফা ভাই ও ছোট ভাই কবি আহমেদ তোফায়েলের তাগেদায়। দুজনকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আজ জন্মদিনে কবিকে আবারও আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।