ইউপি নির্বাচনের কথকথা!

রোমান খান

রোমান খান
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন উপলক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ফেসবুকে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রচারণা। এরমধ্যে পিছিয়ে নেই আমার নিজের ইউনিয়নও। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার রাজানগর সৈয়দপুর ইউনিয়নের কথা বলছি।

এখানে সম্ভাব্য চেয়্যারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীরা উৎসব মুখর প্রচারণা শুরু করেছেন যা কিনা খুবই ইতিবাচক। বর্তমান ডিজিটালাইজেশনের যুগে খুব সহজেই আমরা জনগণের কাছাকাছি চলে যেতে পারছি। মুর্হুতের মধ্যেই মানুষ সবকিছু জানতে পারছেন।

গত অনেক নির্বাচন আমাদের হয়ে গেছে আমরা সবাই সেগুলো প্রত্যক্ষ করেছি আমাদের ইউনিয়নে অনেক চেয়্যারম্যান কাজ করে গেছেন ।

বিগত নির্বাচনগুলোতে আমরা দেখেছি নির্বাচনের আগে চেয়্যারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীরা নানাধরনের উন্নয়নমূলক কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তারা নির্বাচনে পাশ করার পর তা আর বাস্তবায়ন করতে পারেননা।

কেন পারেন না আমি সেদিকে যাবো না। সবাই যে খারাপ ছিল তাও বলবো না আবার সবাই যে ভালো ছিল তাও বলবো না। এর মধ্যে অনেকেই অনেক ভালো কাজ করেছেন আমি তাদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

আমি জানি একটা মানুষ শতভাগ সঠিকভাবে কাজ করতে পারবেনা, এটা সম্ভবও নয়। কিন্তু শতভাগ কাজ না হলেও ৮০-৯০ ভাগ কাজ চাইলেই করা সম্ভব।

আমার কথা হচ্ছে, যিনি মনে করবেন আমার দ্বারা সম্ভব নয়, তিনি নির্বাচনে না আসলেই হয়। আর যে মনে করবেন আমার দ্বারা হবে তিনি এগিয়ে আসলেই প্রকৃত উন্নয়ন হবে।

সেটা আমি, তুমি, আপনি আমাদের মধ্যে থেকে যে কেউ হতে পারে। এখন আসি আমি আমার মূলপ্রতিপাদ্যের উপর।

আসন্ন ইউপি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে আমাদের কি কি বিষয়ের দাবি ও প্রত্যাশা থাকতে পারে। শুধু চেয়্যারম্যানরা নয় মেম্বারদের কাছেও প্রত্যাশা অনেক।

১। মাদকমুক্ত সমাজ: প্রথমেই আমাদেরকে এটা নিশ্চিত করতে হবে মাদকমুক্ত সমাজ। আর এটা জনপ্রতিনিধি হিসেবে চেয়্যারম্যান তার অধীনস্থ মেম্বার ও জনগণকে পাশে নিয়ে প্রশাসনের সাহায্যে সমাজ থেকে চিরতরে মাদক নির্মূল করতে হবে।

২। সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ: কোনভাবেই সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে ও সন্ত্রাসীদেরকে লালনপালন ও প্রশয় দেয়া যাবে না। সেটা হোক আমার ভাই ভাতিজা, ভাগ্নে আত্মীয়স্বজন বা দলীয়লোকজন। সেটা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। চেয়্যারম্যান হিসেবে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

৩। সামাজিক নিরাপত্তা: মানুষ সমাজবদ্ধভাবে আদিমকাল থেকেই বসবাস করে আসছে। সমাজের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার মানুষ বাস করে।

ধনী ও গরিবের বৈষম্য অনেক আগে থেকেই ছিল সমাজে প্রচলিত। তাই কারো দ্বারা কেউ যেন নিজেকে অনিরাপদ মনে না করে এটা সমাজের অবিভাবক হিসেবে চেয়্যারম্যানকে দেখতে হবে।

৪। শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নত করা: শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। তাই আমাদেরকে শিক্ষার মান ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নায়নে মনোনিবেশ করতে হবে।

এটা শুধুমাত্র চেয়্যারম্যান বা মেম্বারদের একার পক্ষে সম্ভব না আমাদেরও যার যার অবস্থান থেকে বিশেষ করে নিজের ঘর থেকে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

৫। মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (ইভটিজিং বন্ধ করা): এটা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে আমাদের দেশে বহুল আলোচিত বিষয়হলো এটা। মেয়েরা এখন ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপদ না।

ধর্ষণ ও ইভটিজিং এর বিষয়টা এখন চরম আকারে ধারণ করেছে। যা কিনা আমাদের মা বোন ও মেয়েদের জন্য খুবই ভয়ংকর ও ভীতিজনক।

আমাদের সমাজের সবাইকে সাথে নিয়ে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে চেয়্যারম্যানকেই এগিয়ে আসতে হবে।

৬। অবকাঠামোগত উন্নয়ন: একটা দেশ সমাজ ততদিন পর্যন্ত উন্নত হবে না যতদিন পর্যন্ত সেখানকার অবকাঠামোগত উন্নায়ন না হবে।

অবকাঠামোগত উন্নায়ন বলতে সেখানকার রাস্তাঘাট, হাট-বাজার মোটকথা মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য যা যা দরকার সেগুলোর উন্নয়ন করতে হবে।

আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলছি আমার গ্রাম মুধুপুর। আমার বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা আজ পর্যন্ত ঠিক হয়নি। সাবেক দুই চেয়্যারম্যান এবং বর্তমান চেয়্যারম্যান চেষ্টা করেও সর্ম্পূন করতে পারেননি।

৭। ন্যায়বিচার: আজকে সারাবিশ্বে এত মহামারী যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি সবকিছুই ন্যায় বিচারের অভাবেই হচ্ছে। কারণ কেউ কোন অপরাধ করলে তার কোন বিচার হয়না-এটা ধরেই নিয়েছে অপরাধীরা।

তাই চেয়্যারম্যানদের সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।

৮। স্বজনপ্রিতি ও দলীয়প্রভাবমুক্ত: বর্তমানে আমাদের সমাজে এই বিষয়টা খুবই প্রকট আকার ধারণ করেছে। যার কারণে যোগ্য ব্যক্তি যথাযোগ্য মর্যাদা পাচ্ছেন না।

বিভিন্ন কাজ দলীয়লোকজন ও আত্বীয়স্বজন দিয়ে করানো হয় বলে কাজের যথাযথ ও গুনগত মানও বজায় থাকেনা। তাই এই বিষয়ে কোন রকম ছাড় দেয়া চলবে না।

৯। জবাবদিহিতা: যেকোন কাজে বা দায়িত্বে যদি জবাবদিহিতা থাকে তাহলে উক্ত কাজে বা দায়িত্ববান ব্যক্তি কখনো অপরাধ করতে পারবেন না।

তাই চেয়্যারম্যানকে যেহেতু ইউপির বিভিন্ন ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহন করতে হয় তাই তাকেও জনগণের জবাবদিহিতার মুখামুখী হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তবেই কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়ার সাহস পাবেন না।

১০। দুর্নীতিমুক্ত: বাংলাদেশে দুর্নীতি একটা বিশাল সমস্যা। তাই আমাদের সবাইকে দুর্নীতির উর্ধে থেকে সমাজের জন্য কাজ করতে হবে। ইউপি চেয়্যারম্যান যেহেতু জনপ্রিতিনিধি তাই তাকেও দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে।

আমার বিশ্বাস উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো যদি কোন চেয়্যারম্যান ও মেম্বার নিশ্চিত করেন তাহলে আর আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। এভাবেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক