আমার দেখা চীন

চীনের মহাপ্রাচীরে দেশটির ঐতিহ্যবাহি পোষাকে লেখক তাহমিনা আক্তার

তাহমিনা আক্তার
বই-পুস্তক আর ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারের পাতায় ছবি দেখেছি তার বাইরে চীন নিয়ে আমার আর কোন ধারণা ছিল না। আমি তখন নেপালের রেডিও তুলশিপুরে হয়ে কাজ করি। অফিস থেকে জানানো হল একটা প্রোগ্রামে চায়নার বেইজিং এ যেতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে নাকি প্রথমবার চায়নার ভিসা পাওয়া অনেক কঠিন! কিন্ত আমার জন্য খুবই সহজ ছিল।

ঝামেলা ছাড়াই কাগজপত্র আর টাকা জমা দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ভিসা পেয়ে ফেললাম। তারপর বিড়ম্বনা ছাড়াই উড়জাহাজে উঠে পৌঁছে গেলাম বেইজিং।

বেইজিং বিমানবন্দরে যখন নামলাম তখন প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। প্রোগ্রামের নিদিষ্ট দিনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছিল না বলে প্রোগ্রামের একদিন আগেই চলে এসেছিলাম।

বিমানবন্দরে নেমেই চাইনিজ ভাষা না জানায় উৎকন্ঠায় ছিলাম। উৎকণ্ঠা আর লাগেজের জন্য যখন অপেক্ষা করছিলাম তখনই সুন্দর হাসি দিয়ে এক জার্মান ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি চায়নায় নতুন কিনা?

হ্যাঁ বলতেই তিনি আমাকে হোটেল পর্যন্ত লিফট দিতে চাইলেন।

আমি তখন দোটানায় ভুগছিলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম যাব কিনা, পরে সিদ্ধান্ত নিলাম যা আছে কপালে। বিশ্বাস এ মিলায় বস্তু।

রাজি হয়ে গেলাম। তিনি মূলত জার্মানির নাগরিক। পেশায় ব্যবসায়ী। কাজের জন্য চায়নাতে থাকেন প্রায় বিশ বছর ধরে।

সেই ভদ্রলোক আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিলেন। যে হোটেলে আমার থাকার ব্যবস্থা ছিল, পৌছে জানলাম আমি প্রোগ্রামের আগের দিন চলে এসেছি।

তাই সেখানে থাকা যাবে না। এছাড়া এ হোটেলের ভাড়া আমার বাজেটের বাইরে।

একদিনের জন্য হোটেল খুজতে আবার রাস্তায় নামলাম। দু’একটা হোটেল ভাংগা ইংরেজিতে জানালো তারা বিদেশিদেরকে রুম ভাড়া দেয় না।

লাগেজ আর ব্যাগ নিয়ে কি মুস্কিলে পড়লাম!! কয়েকজন চাইনিজকে বললাম আমাকে সাহায্য করতে।

কি বুঝলো জানি না তারা সকলেই মাথা নাড়িয়ে হাসি দিয়ে চলে গেল। আমি এক বুক হতাশা নিয়ে দাড়িয়ে আছি।

ভাবছি রাতটা কি রাস্তায় কাটাতে হবে নাকি? এমন সময় এক অল্পবয়স্ক চাইনিজ এসে আমাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল আমার কোনো সাহায্য চাই কিনা।

আমি তো হাতে চাঁদ পেয়ে গেলাম। আমার সমস্যার কথা শোনে সে বলল কোন চিন্তা কর না। আমি একটা ব্যবস্থা করে দিব।

তারপর দু একটা হোটেল ঘুরে একটাতে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিল। রিসিপশনে তাকে বসিয়ে রেখে।

দ্রুত রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। বাসায় মা চিন্তা করছে। ফোন দিতে পারছিনা। বলার পর সে নিজের আইডি কার্ড দিয়ে সিম কিনে দিলো।

আমি মুসলিম হালাল ফুড খেতে চাই বলার পর সে আমাকে একটি রেস্তোরায় নিয়ে গেল। আমরা দুজনে ডিনার শেষে হেটে হেটে হোটেলে ফিরলাম।

মিষ্টি সেই যুবকের নাম ছিল কিম। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। পড়ালেখা এবং চাকরি দুটোই করে। ছোট চোখের কিমের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

নিষিদ্ধ নগরীতে:
প্রোগ্রাম চলাকালীন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভালো ইংরেজি জানা এক সেচ্ছাসেবিকে আমার সাথে থাকতো।

প্রথম দিন বিকেলে একটা মিটিং আছে জানাতেই, আমি দেখলাম তখনো আমার হাতে ৪ ঘন্টা সময় আছে।

কাছাকাছি দেখার মতো কি কি আছে, কিভাবে যাবো কিভাবে আসবো বিস্তারিত চীনা ভাষায় একটা কাগজে লিখে দিতে বললাম।

সে সব লিখে দিতেই চলে গেলাম বাসস্টপে আর উঠে পড়লাম বাসে। যেটা কিনা হোটেল থেকে হাটা পথের দূরত্ব।

নির্ধারিত স্টপেজ এ আসতেই নেমে পড়লাম আর চোখ জুড়িয়ে দেখে নিলাম তিয়ানআনম্যন স্কোয়ার।

এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী তিয়ানআনমেন স্কোয়ার। তিয়ানআনমেন গেটের [স্বর্গীয় শান্তি দ্বার] দক্ষিণে প্রায় ১১০ একরের এই বিশাল স্কোয়ার বিশেষ পরিচিত।

বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে হাটার আর দরকার হয়নি। ধাক্কা খেতে খেতে ঢুকে গেলাম নিষিদ্ধ নগরীতে।

মিং রাজবংশ (১৩৬৮ – ১৬৪৪) এবং কিং রাজবংশের (১৬৪৪ – ১৯১১) ২৪ জন সম্রাট বাস করেছেন এখানে। সাধারণ প্রজার কাছে এই নগরী নিষিদ্ধ ছিল বলেই একে নিষিদ্ধ নগরী বলা হত।

ঈশ্বরপ্রদত্ত চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী সম্রাট এবং এই নগরী অবস্থিত পৃথিবীর কেন্দ্রে এই বিশ্বাসে ১৭৮ একর জমিতে এই নগরী গড়ে তোলা হয়েছিল প্রাচীন বেইজিঙের উত্তর-দক্ষিণ কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর।

চোখ দিয়ে না দেখলে এর বিশালতা আর এর সৌন্দর্য লেখায় বর্ননা করা সম্ভব নয়। নগরীর চারপাশে ১০ মিটার উঁচু প্রাচীর।

প্রাসাদের মেঝের মোট ক্ষেত্রফল ১৬ লক্ষ বর্গফুট। ৯০টি প্রাসাদ আর প্রাঙ্গণ, ৯৮০টি বাড়ি এবং ৮৭০৪টি ঘর নিয়ে গঠিত এই প্রাসাদনগরী।

যে কাউকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে নগরীর স্থাপনা সমূহ। কিছু দম্পতি দেখলাম যারা ওয়েডিং ফটোসেশান এর জন্য এসেছে।

এত সুন্দর ব্রাইড দেখে ছবি তুলতে চাইতেই তারা রাজি হয়ে গেল। আর আছে অতি পুরাতন উইশ ট্রি।

কথিত আছে এই গাছ ধরে যে যা চায় তাই পূরণ হয়। তো আমিও সেই উইশ ট্রি ধরে চেয়েছিলাম আমার পরিবার নিয়ে এই স্বর্গরাজ্য আবার আসতে চাই।

এন্টিক মার্কেট:
প্রোপ্রাম শেষে একদিন চলে গেলেন এন্টিক মার্কেটে যাওয়ার পথে দেখা হল ইতালির এক ভদ্রমহিলার সাথে যে কিনা পেশায় একজন ফটোগ্রাফার।

ছেলে ছেলের বউ সহ এখানে আছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। তিনি এন্টিক মার্কেটের পাশে থাকেন।

সুইমিং কস্টিউম এখানে পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলে, জানালেন এটা এখানে পাওয়া যাবে না। তবে আমি যদি কিছু মনে না করি।

তবে তার ছেলের বউয়ের জন্য কেনা একটা সুইমিং কস্টিউম আছে। যেটা তিনি কেনার পর আর পড়েননি সেটা তিনি আমাকে দিতে চান।

এত আন্তরিক ভাবে তিনি আমাকে বললেন যে আমি আর মানা করতে পারি নি। তিনি আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে এটা উপহার দেয় এবং এন্টিক মার্কেট ঘুরিয়ে সব কিছু দেখায় এবং সাবওয়ে পর্যন্ত পৌছে দেন।

সাবওয়ে থেকে নেমে আমি হোটেল পর্যন্ত যেতে পারছিলাম না, পরে দারিয়া নামের এক ১৭ /১৮ বছরের যুবতী আমাকে সাহায্য করেছিল।

তারপর আমরা একসাথে রামিন খেয়েছি, ছবি তুলেছি, গল্প করি। তার মোবাইলের কাভারটা সুন্দর বলার পর সে আমাকে অবাক করে দিয়ে ওর মোবাইল কাভার খুলে গিফট করেছিল।

বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে দারিয়া, পড়ালেখার জন্য শহরে এসেছে। ভালবাসা দারিয়া, ভালো থেকো সবসময়।

চিনের মহাপ্রাচীর:
দুজন নেপালি আর দুজন ইতালীয়ানসহ আমরা ৫ জন মাইক্রোবাসে করে রওয়ানা হলাম গ্রেট ওয়ালের উদ্দেশ্য।

গ্রেট ওয়ালে পৌছাতে ১১ টা বেজে গেল। ধারনা ছিল বড়সড় একটা দেয়াল দেখব। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে উঠল শাখা প্রশাখা মেলা বিস্তৃণ এক প্রাচীর।

যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। সিড়ির দিকে নজর রেখে হাটছি। আমাদের দলে সবাই এ বিশাল স্থাপনার সৌন্দর্যের কাছে বাকরুদ্ধ।

যিশুখ্রিস্টের জন্মের আগে থেকে শুরু হয় ;মহাপ্রাচীর নির্মানের কাজ। এই মহাপ্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে চীন অনেকাংশেই রক্ষা পায় ২০০০ বছর ধরে চলে আসা মঙ্গোলীয়দের দস্যুপনা ও আক্রমণ থেকে।

অবশ্য কেবল মঙ্গোলীয় শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্যই নয়, সীমান্ত এলাকায় সুরক্ষা ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাও ছিল এই প্রাচীর নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।

এক সময় দস্যুদের থেকে রক্ষার জন্য নির্মাণ করা প্রাচীর আমার কাছে বিস্ময়। ফেরার পথে আমি ভাবছিলাম জনগণের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল আর দেশেপ্রেমিক হলেও একটা জাতি এত বছর শ্রম, মেধা, অর্থ বিনিয়োগ করে এমন স্থাপনা তৈরি করতে পারে।

আমার সেই চীন ভ্রমণ আমাকে ভ্রমণ বিষয়ক অন্যরকম স্বাদ দিয়েছিল।

স্বল্প সময়ে আন্তরিক আর সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা প্রতিটি চাইনিজ বন্ধু আমাকে চীনের প্রাচীরের মত নিরাপদ, দুচিন্তামুক্ত আর আনন্দময় ভ্রমণের সহযোগিতা করেছিল।

আমি আমার সেই সকল বন্ধুদের কাছে কৃতজ্ঞ। দেশে আসার পর আমার মোবাইল ফোনটি হারিয়ে ফেলায় মানুষগুলোর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন হয়ে গেছে।

কিন্তু মানুষগুলো আমার হৃদয়ে চীনের মহাপ্রাচীদের মত বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে।