সান্ধ্যকোর্স কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

UGC-Building

নাদিম মাহমুদ
সময়টা ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি বৃহত্তর আন্দোলন চলছিল ‘বর্ধিত ফি ও সান্ধ্যকোর্স বিরোধী’ ব্যানারে। খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনকে অভ্যন্তরীণ হামলার মাধ্যমে কীভাবে লাগাম টেনে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসাথে প্রায় ছয় বছর ধরে কয়েক ডজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মাথায় ঝুলছে সেই আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকটি মামলা।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রধান দিক ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হওয়া বেশ কয়েকটি বিভাগে সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবি। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের প্রয়াস রুখতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিলেও থেমে থাকেনি সেই সান্ধ্যকোর্স। বরং গত কয়েক বছরে বর্ধিত কলেবরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বি-নীতি সঞ্চালনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব কার্যত কমিয়ে এনেছেন তারা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা নীতির ফরম্যাট অনুযায়ী স্বায়ত্বশাসিত হওয়ার কথা থাকলেও মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আয়ে ভাটা পড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বচ্ছল হতে পারেনি। যে কারণে সরকার দেশের জনগণের কর থেকে বার্ষিক বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্বালানি দিয়ে আসছে। যে কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলে মনে করতে শুরু করেছি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নামমাত্র বেতন-ফি নেয়ার নজির হয়তো বিশ্বের অন্য কোনো দেশে না থাকলেও আমাদের দেশের সরকার মূলত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করার নিমিত্তে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে এই খাতে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাজের সব শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ করে আসছে। অন্যদিকে বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি নিয়ে শিক্ষকদের যেমন বেতন দেয় ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছে।

প্রায় দশক ধরে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু হওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিমূর্ত পরিচয় উঠে আসছিল। এ যে একের ভিতর দুই বিশ্ববিদ্যালয়। সব বিভাগে সান্ধ্যকোর্স চালু না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পারদের উচ্চতায় বাড়তে থাকা সান্ধ্যকালীন কোর্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপরি আয়ের উৎসে পরিণত হলেও খেই হারিয়েছে আমাদের কথিত স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিরচেনা রূপ।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুরু থেকে এই সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবি জানিয়ে আসলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চালকের আসনে থাকা ব্যক্তিরা তাতে কর্ণপাত করেননি। উল্টো বিভিন্ন সময় দাবি করেন, বেতন ভাতা সন্তোষজনক না হওয়ায় তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ খুলে বাড়তি আয়কে দোষের বিষয় হিসেবে দেখেননি।

শুধু তাই নয়, যেসব শিক্ষকরা সকালে নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলেও সন্ধ্যাকোর্স ঠিকই ক্লাস করাতে হাজির হতেন। কারণ, সকালের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে মাসিক বেতনের উপর প্রভাব না পড়লেও সান্ধ্যকালীন কোর্স ক্লাস নিতে না পারার কারণে উপরি সম্মানির উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে, আর এজন্য ওইসব বিভাগের শিক্ষকরা বেশ সাবধানে চলেন।

মজার বিষয় হলো, আমরা দেখে এসেছি যেসব শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মাসের পর মাস না দেখেই ফলাফলে বিলম্ব করে সেসব শিক্ষকরাই এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়া সান্ধ্যকোর্সের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেন না। এটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হওয়া সান্ধ্যকোর্সের ‘বড় বিউটি’। আর এই সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে দ্বিচারিত রূপ প্রকাশ করে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সের সাথে জড়িত শিক্ষকরা।

আমার জানা মতে, কয়েক বছর আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ভাতাদি সরকার সন্তোষজনকভাবে বাড়িয়েছে। তাহলে আমাদের সান্ধ্যকোর্স পড়ানো শিক্ষকরা কেন সেই বাড়তি আয়ের নেশায় নামলেন?

প্রতিযোগিতাপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষায় শত শত শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে ফেলে যেসব শিক্ষার্থী জনগণের করের টাকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান সেই সব শিক্ষার্থীরা সেমিস্টারে তিনশত টাকা দিয়ে পার করলেও সান্ধ্যকালীন কোর্স পড়তে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্টান্ডার্ড যোগ্যতার চেয়ে কয়েকগুণ কম যোগ্যতা নিয়ে নামমাত্র ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণকারীদের গুণতে হয় প্রতি সেমিস্টারে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকা।

শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুই সেমিস্টারের স্নাতকোত্তর সম্পন্ন হলেও এই সান্ধ্যকোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের গুণতে হয় ৪/৬ সেমিস্টার যার খরচ দাঁড়ায় প্রায় দুই/তিন লাখ টাকা। ছয়শ টাকা বেতন দিয়ে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সনদ আর সান্ধ্যকালীন কোর্স সনদে পার্থক্য তেমন না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রূপ সাধারণ শিক্ষার্থীরা কখনই মানতে পারেননি। মানতে পারেননি, অর্থের বিনিময়ে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-লোগা লেখা সনদ’ গ্রহণ করতে যাওয়া শিক্ষার্থীরাও।

অধিকাংশ সান্ধ্যকালীন কোর্স চাকরিজীবীদের জন্য সুযোগ দেয়া হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা ভিড় জমায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সনদের আশায়। অধিকাংশ চাকরির বিজ্ঞাপনে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় শ্রেণি না থাকার কথা বললেও এইসব বাণিজ্যিক কোর্স সেই বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে তৃতীয় শ্রেণি পাওয়াদেরও স্নাতকোত্তরের সুযোগ দিচ্ছে।

অথচ এই সনদ অনেক সময় চাকরি জীবনে তাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। চাকরিদাতাদের মানসিকতার তেমন পরিবর্তন তো হয়ই না বরং অনেক সময় বড় অংকের টাকা দিয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স শেষ করা শিক্ষার্থীরা হতাশ হন। কিন্তু তারপরও বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খুলে সনদ বিক্রি করে চলছেন।

ঠিক কোন আইনের বলে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা এইসব সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করেছেন তার কোন দালিলিক প্রমাণ আপাতত আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশগুলোতে দেখতে পাচ্ছি না। ’৭৩-এর অধ্যাদেশের সাথে সাংঘর্ষিক এই কোর্স বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিভাবে বছরের পর চালু রেখেছে সে প্রশ্ন করলে বিষ্ময় প্রকাশ ছাড়া আমাদের করার আর কিছু থাকছে না। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিভাবে শিক্ষকতা করবেন তার বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এই অধ্যাদেশে। অধ্যাদেশটির সপ্তম পরিচ্ছেদের ১ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে All recognized teaching in connection with the University courses shall be conducted by the University and shall include lectures and work in the laboratories or workshops and other teaching conducted by the teachers thereof in such manner as may be prescribed by the University Ordinances. এবং ৩ ধারায় বলা হয়েছে The courses and curricula shall be prescribed by the University Ordinances and the Regulations.

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্সগুলো অনুযায়ী ক্লাস ও ল্যাবরেটরির কাজে শিক্ষকরা পাঠদান করবেন। এতো স্পষ্ট ধারণা থাকার পরও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিভাবে বলতে গেলে ওই অনৈতিক পাঠদানের সাথে জড়িয়ে যেতে পারেন তা আমার বোধগম্য নয়।

সাধারণত নতুন কোনো বিভাগ, অনুষদ কিংবা ইনস্টিটিউট খুলতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। আমি জানি না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক এই সংস্থা সজ্ঞানে কিভাবে বছরের পর বছর অনুমতি দিয়ে আসছে।

তবে এই কথা সত্য যে, সান্ধ্যকোর্স তথা বাণিজ্যিক কোর্সগুলো সম্পন্ন করিয়ে উচ্চশিক্ষায় সনদকেন্দ্রিক একধাপ এগিয়ে গেলেও আমরা আদৌ কি সফল হয়েছি? যেখানে শুধুমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সনদধারীদের বেকারত্বের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘বাণিজ্যিক’ পাঠদানের লিপ্সা আমাদের মূল শিক্ষানীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কখনোই নয়।

এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পক্ষ থেকে সান্ধ্যাকোর্স চালু রাখা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি নির্দেশনা গণমাধ্যমে এসেছে। ওই খবরে বলা হচ্ছে, সান্ধ্যকোর্স পরিচালনা করা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বিধায় সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ হওয়া দরকার। শুধু তাই নয়, খোদ ইউজিসি স্বীকার করে নিয়ে বলেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই নতুন বিভাগ, প্রোগ্রাম ও ইনস্টিটিউট খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। অথচ দশক ধরে এই বাণিজ্যিক কোর্স ইউজিসির নাকের ডগায় হয়ে এসেছে।

ইউজিসির নীরব অবস্থানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাণিজ্যিক সান্ধ্যকালীন কোর্স চালুর মিছিল যখন সরব তখন নিদ্রা জাগ্রত হওয়া নির্ভর করেছিল সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য মাননীয় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মন্তব্যের কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি বলেছিলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত কোর্স ছাড়াও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোর্স পড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। এতে ডিগ্রিধারীদের লাভ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এক শ্রেণির শিক্ষক ঠিকই লাভবান হচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন- “তারা নিয়মিত নগদ সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। ফলে শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারি আর রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সন্ধ্যায় মেলায় পরিণত হয়। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

ব্যানার, প্লাকার্ড নিয়ে মানববন্ধন করে ঠিক এই কথাগুলো বলতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ সাধারণ শিক্ষার্থীরা এমনকি মারধরের শিকার পর্যন্ত হয়েছে বছরের পর বছর। কিন্তু কিছুতেই ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘুম ভাঙানো সম্ভব হয়নি। ৪২ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র হরণ করে ফেলছেন আমাদের ওইসব শিক্ষকরা। যাদের পাঠদানের লক্ষ্যভেদ করে পৌঁছে গেছে অর্থের পিছনে।

এমনিতে আমাদের গবেষণায় চুলোয় উঠলেও কেবল পাঠদান নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের রুপে কালিমা লেপন করেছে এই বাণিজ্যিক সান্ধ্যকালীন কোর্স। তবে মজার বিষয় হলো, মাননীয় রাষ্ট্রপতির সান্ধ্যকোর্স নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষিত্রে আসা ইউজিসির তেরো নির্দশনার ৯ নাম্বারে বলা হয়েছে, সান্ধ্যকোর্স পরিচালনা করা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বিধায় সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই ‘বাঞ্ছনীয়’ শব্দটির আড়ালে হয়তো সান্ধ্যকোর্স পরিচালনা করা শিক্ষকরা আশার আলো দেখলেও দেখতে পারেন। কারণ, আমাদের বাঞ্ছনীয় শব্দটিকে কেবল শতভাগ প্রয়োগিক দিকে নিয়ে যাওয়া দুরুহ হয়ে পড়ে বটে।

দেশে বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার জন্য ইউজিসি মাঝে মধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। যেখানে তারা বলার চেষ্টা করে, ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউজিসির অনুমতির বাহিরে কিংবা বিভাগগুলোর অনুমতি নাই। ঠিক এই ধরনের একটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউজিসি সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ করার কোনো নোটিশ জারি করবে কী?

ইউজিসির অনুমতি না নিয়ে এইসব বিভাগ খোলার কথা যে বলছে, সেই কথাকে তারা নিজেরাও ধারণ করে, তাহলে এটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বড় অপরাধ হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ইউজিসি কী সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষকদের উপর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জারি করবে? আবার যারা সান্ধ্যকোর্স করে সনদ পেলেন, সেগুলো ইউজিসি নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার রাখে কী? যারা এই সান্ধ্যকোর্স ভর্তি আছেন, তাদের জন্য নির্দেশনা কী তা ইউজিসির ওই চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়নি।

তাই অনেকটা ধারণা করা যাচ্ছে, বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স ভবিষ্যৎ কোথায় তা নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা অনেক সময় ইউজিসির নির্দেশনা পুরোপুরি মানেন না। তারা শিক্ষকদের অতিরিক্ত আয়ের এই উৎসে হাত দেবেন কী না তাতে সত্যিই সন্দেহ রয়েছে। কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুবিধায় যতটা সদয় হন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সদয় থাকেন যখন সেগুলো শিক্ষকদের স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে উঠে।

এখন দেখার বিষয়, ইউজিসির এরকম নির্দেশনার পর সান্ধ্যকোর্স পড়ানো শিক্ষকরা রাস্তায় নামে কী না। কারণ, এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বার্থে টান পড়লে রাস্তায় নামতে দ্বিধা করেন না। অথচ শিক্ষার মান রক্ষায় তারা রাস্তায় নামতে অপরাগ থেকেই গেছেন।

সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু রাখা কখনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্দশিক চেহারার সাথে যায় না। বরং বিকৃত চেহারার বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয় সাধারণ মানুষের টাকায় চলা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আমরা চাইবো, আচার্য ও ইউজিসির নির্দেশনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাদরে গ্রহণ করে সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ করবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিরায়ত চেহারায় ফিরে আসুক। শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ বন্ধে সরকার যখন এগিয়ে আসছে, তখন আমাদের সহযোগিতা করা উচিত। বন্ধ হোক টাকার বিনিময়ে সনদের বিকিকিনি।

নাদিম মাহমুদ, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত

Courtesy: BD News24