সুলোচনা ভার্মার ৫ কবিতা

১. লিখবো
আমায় ক্ষমা করো প্রাণ সখা,
আমি পারব না লিখতে কোনও দুর্দান্ত কবিতা!
আমি লিখব বিশাল পাহাড়
তুমি ঠিক সেই জায়গায় ঝর্ণার সঙ্গীত শুনো।

আমি লিখব অলৌকিক কিছু, ছলনা ও দুঃখ লিখব
আমার অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে রয়েছে শিশুর শরীরের গন্ধ,
বেশ কয়েকদিন ধরে প্রেমিকের ফোনের অপেক্ষা করতে
প্রেমে ডোবা এক প্রেমিকাকে দেখেছি আমি
শুনেছি কিশোরী আমোনকর কে গাইতে “সাহেলা রে” অনেকবার
দেখেছি প্রসবের ঠিক আগে অবিবাহিত মাকে
হাসপাতালের রেজিস্টারে বাচ্চার বাবার নাম লিখতে
দেখেছি ছোটবেলায় পরমেশ্বরী কাকা কে
খাপরার চালের ওপর গামছা দিয়ে টিয়ে ধরতে
কীভাবে আর কেউ লিখতে পারবে সেই সব গল্প!

শৈশবে আমার যে কবিতা ছিল, তার রঙ ছিল সবুজ
করতাম তাঁর দৃষ্টিতে আমি ঈশ্বরের সাক্ষাত্কার
কবিতা কখনও কখনও ফকিরের মতো গুনগুন করতো –
” রবে না এ ধন, জীবন যৌবন…..”
আমার কবিতার তেজ ছিল সন্ন্যাসীর মতো
সে তানসেনের সাথেও করতে পারত যুগলবন্দী
সে বলতে পারতো সেই সব কথা যার জন্য
পাওয়া যায় না কোনও শব্দ অভিধানে
ছিল একটি খাঁচা যে সামলে রাখত
বহু যুগের স্মৃতির ভান্ডার

আমি এখন যে কবিতাটি লিখছি তার রঙ কী হবে?
পারবে “সবুজ” লিখে আমার কবিতা জঙ্গল গড়ে তুলতে?
ফিরে আসবেকি ঈশ্বর, সন্যাসী এবং ভুলে যাওয়া স্মৃতি গুলো?
ফিরে আসবে কি প্রেমীরা প্রতীক্ষারত প্রেমিকাদের কাছে?
“মঙ্গলায়ন” এবং “চন্দ্রায়ণ” আছে এই যুগের পুরস্কৃত কবিতা!

হাসিল হোক পরিষ্কার বায়ু এবং জল আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের
অনাথ ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই সব কবিতাগুলো বহু দিন থেকে!
আমি সেই কবিতাগুলি দত্তক নেবো।
তারপর আমার কবিতার আর্তনাদেআসুক তুফান,
ভেঙে পরুক আকাশ বা হোক বজ্রপাত ,
আমি কখনই তার হাত ছাড়ব না।
আমার কবিতার সংঘর্ষে গড়ে উঠবে সবুজ রঙ আবারধরার ওপর
যখন গাইবে মঙ্গল গীত টিয়ে পাখি
ধরার বুক চিরে বের হবে ফল্গু ও সরস্বতী!

আমায় ক্ষমা করো প্রাণসখা ,
আমি পারব না লিখতে কোনও দুর্দান্ত কবিতা!
আমি লিখব বালি, এবং কবিতা পড়ে করবো নদীর আহ্বান
এক আদিম পুরুষের মতো সেই নদীর ধারে কর তুমি আমার অপেক্ষা।

২. জল
জল থেকে তরঙ্গের অন্তর্ধান হওয়া মাত্রই
ক্ষয় হওয়া শুরু হয় আয়ু জীবের
হৃদয় নয়, আছে জলের কলকল সংগীত
যা হতে থাকে স্পন্দিত বুকের বাম দিকে
জল ছাড়া জ্বলেপৃথিবী
যখন জল থেকে পৃথক হয় তরঙ্গ
এবং মানুষেরা ধরার সংগীত থেকে

ছিল ধরার ওপর প্রবাহমান
পৃথিবীর সুগম সংগীত এক যুগে
প্রায় বেসূরা হয়ে ওঠা পৃথিবীতে জল
রয়ে গেছে বোতলবন্দীব্যবসায় ইদানিং

৩. রাগ-বিরাগ
সে বলল প্রেম
আমার কান দুটি শুনলো রাগ খামাজ
যুগলবন্দী বুঝলো আমার মন
ধরো বাঁশিতে হরিপ্রসাদ চৌরাসিযা
এবং সন্তুরে শিবকুমার শর্মা

বিরহের দিনগুলিতে
বাতায়নে বসি
কাজী নজরুল ইসলামের নায়িকা হয়ে
শুনেছি নীরবতায় রাগ মিশ্র দেশ
গাইতে থাকলেনঅজয় চক্রবর্তী “পিয়া পিয়া পিয়া পাপিয়া পুকারে”

আমাদের মিলনে
শিরা – উপশিরায় বেজে উঠেছিল মালকোষ
যুগল সুরেরপরস্পরসম্বাদে
যেমন বাজাতেন বিসমিল্লাহ খান সানাই -ই
এবংশুভ হয়ে উঠত প্রতিটি মুহূর্ত

গিলে ফেলেছে জীবনের দাদরা এবং কাহারবা কে
সময়ের ধামার তাল
মিশ্র রাগের আলাপে
শুনলো আমার লয় কে প্রলয় শাস্ত্রীয়তারপাবন্দ
আশপাশের পরিবেশ

হায়! যদি বুঝতো এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী গানের ভাষা
এবং জানতো যে বেড়ে ওঠে মধুরতা যে কোনও রাগেই
মিশ্র লাগালে, যদিও কমে যায় তার শাস্ত্রীয়তা
এবং বুঝতো যে প্রায় বেসূরা হয়ে ওঠা এই ধরায়
শাস্ত্রীয়তার চেয়ে বেশি মাধুর্যের আছেপ্রয়োজন।

৪. নরক
বল সখা, আসবে আমার শেষ যাত্রায়?
আচ্ছা বল তো সখাকি চিতার আগুন
আগে পোড়াবেআমার পাঁচ গজী বা আমার চুল
যার মধ্যে আঙ্গুল চালানোর কথা বলতে তুমি
এবং এই কাজটি ছিল এত কঠিন যে ছোটো হয়ে গেলো
দিন, মাস, বছর, পঞ্জিকার যে কোনো শুভ মুহূর্ত

চিতার আগুন আমাকে কত টাপোড়াবেসখা?
অত, যত তোমার বিষাদে পুড়েছে এই মন ?
বা অত, যত পুড়ে গেলে শেষ হয়ে যায় সমস্ত অনুভূতি?

জানো সখা, হয়ে গেছি এমন অভ্যস্ত তোমার দেয়া নরকে থাকার
যে কোনো ধরণের স্বর্গের কল্পনা মাত্র ই হয়ে উঠি অসহজ
সবিনয় অবজ্ঞা করব যদি যম দেবতা করে স্বর্গে পাঠানোর ফৈসলা
ধরনা দেব ওই নরকের দ্বারে আর ওইখান থেকে এই নরক কে করব প্রণিপাত |

আচ্ছা বল তো সখা, ওই নরকেও কিযাতনাকারী কে প্রেমিক বলা হয়?

৫. চরিত্রহীন
(শরৎচন্দ্রের কিরণময়ীর জন্য)
শরৎ বাবু এমন গেলেন যে আর ফিরে এলেন না কখনও
তবে জন্মাতে থাকলে তুমি রক্তবীজের মত কিরণময়ী
পালন করে চলেছেবিশ্ববছরের পর বছর শরৎ জয়ন্তী
বলে যান নাই শরৎ বাবু তোমার জন্মদিন বিশ্বকে
কি জন্ম নেওয়া-ই ছিল তোমার সবচেয়ে বড় পাপ আজন্ম
আর এই মহাপাপের-ই করে এসেছ তুমি পশ্চাতাপ

নিজের চোখের উপরবেঁধেশিলা বাঁধ
সামলেছ অজস্র ফোটার সমুদ্রী তুফান
আশপাশের পরিবেশের পুরুষদের হয়ে আকাশ
গোপন রেখেছ নিজের সমস্ত অসন্তুষ্টিগুলো
স্নিগ্ধ হাসির মাঝে ঘন্টাচব্বিশ
পড়িয়ে তাদের নিজের-ই দুর্ভাগ্যের হদীস !!!

দেখা যায় তোমার ঠোঁটে হাসির ব্রহ্মকমল
যে তার মায়ায় আবদ্ধ করে সবাইকে, গভীরে নামতে দেয় না
অদৃশ্য-ই থেকে যায় মনের তলে জমা কাদা
নিজেরলেখা গল্পের ভূমিকায় ঠিক যেমন চাও তুমি
পরিস্থিতির বন্দিগৃহের তুমি প্রায়ইহাতরাও শেকল
গভীর অন্ধকারে ভিজে, সাজিয়ে চোখের পাতায়, বিন্দু বিন্দু জল

নিজে কে করে নির্জন,গড়ে তুলেছ স্বামীর অহং ঘর
রেখেছ খুশি শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিজের অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে
সাজাও সামাজিক আডম্বর দিয়ে নিজের প্রেমহীন সংসার
তোমারঅসন্দিগ্ধ বিশ্বাসযোগ্যতা-ই আছে সবচেয়ে বড় রোগ
কখনও আয়নাখানায় যেয়ে দেখো নিজের ঠোঁটের হাসি
হ্যাঁ, আছে তো ঠিক ফুলের মতো, তবে সেই ফুলটি বাসি

দেখো মৌমাছিরা খেয়ে শেষ করছে নিজের মধু সংগ্রহ
তাত্ক্ষণিকভাবেবসেমৌচাকে
তারা জানে যে তারা বাস করে ভাল্লুকের পরিবেশে
আর কতকাল ওড়াবে নিজের স্বপ্নগুলো সন্নাসিনীর বেশে
ছেড়ে দুনিয়াদারীর চিন্তা, বেঁধে নেও ইচ্ছেগুলো কে কেশে
যদিও স্বাধীন নারী হওয়া মানে হয় চরিত্রহীন হওয়াএদেশে

নিজের ঠোঁটে ফুল নয়, রোদের কিরণফুটাও
শোন সময়ের সুর লাগিয়ে কান সময়্পুরুষের বুকে কিরনময়ী
ভেঙ্গে পর না, গড়ে তুলো আবারনিজের মতো করে নিজেকে
বেঁচে এসেছ অন্যের শর্তে সারা জীবন, এবারশিখনিজের মতো করে বাঁচা
নিজের পুণ্যাত্মা কে কষ্ট দেয়ার চেয়ে ভাল তো চরিত্রহীন হয়ে থাকা।

-সুলোচনা ভার্মা