অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: সারাদেশে রেলপথে থাকা অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে বেপরোয়াভাবে যানবাহন চলাচলে বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা।

বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈধ ও অবৈধ মিলে অন্তত ৮০ শতাংশ লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত। ওসব লেভেল ক্রসিংয়ে গত ২০ বছরে (২০০৮-২০২০) ৩১২টি দুর্ঘটনায় ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আর চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন।

অতিসম্প্রতি জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল লেভেল (রেল) ক্রসিংয়ে ট্রেন-বাস দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল লেভেল ক্রসিংয়ে গত ১৯ ডিসেম্বর জয়পুরহাট থেকে হিলিগামী বাঁধন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস রেল ক্রসিং অতিক্রমের সময় ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।

লেভেল ক্রসিংটি খোলা ছিল। তার আগে গত ৭ নবেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও ১১ অক্টোবর ফেনীতে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায় ৫ জন মারা যায়।

১৬ অক্টোবর যশোরের অভয়নগর এলাকায় লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ৫ জনের মৃত্যু হয়।

জয়পুরহাটে এর আগেও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে ২০০৬ সালের ১১ জুলাই।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর-জামালগঞ্জ সড়কে আক্কেলপুর মহিলা কলেজ সংলগ্ন আমট্ট রেল ক্রসিংয়ে খুলনাগামী আন্তঃনগর রূপসা এক্সপ্রেসের সঙ্গে যাত্রীবাহী খেয়া পরিবহনের সংঘর্ষে ৩৮ বাস যাত্রী নিহত হয়।

২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বালুবাহী একটি ট্রাক জয়পুরহাটের কাশিয়াবাড়ি রেলগেট অতিক্রম করার সময় খুলনাগামী রকেট এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে ট্রাকে থাকা ১২ জন নিহত হয়। ওই লেভেল ক্রসিং জয়পুরহাট স্টেশন থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তরে।

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং (রেলগেট), রেলপথের দুই ধারে ছেড়ে দেয়া নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেই স্থাপনা নির্মাণ এবং ডাবল লেন সড়ক পথে লেভেল ক্রসিং বার বন্ধ করার পরও যানবাহন পারাপারে রেল দুর্ঘটনার হার বেড়ে গেছে।

গত ৫ বছরে শুধু পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলপথে লেভেল ক্রসিংয়ে ছোট বড় শতাধিক রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।

ট্রেনের সঙ্গে বাস-ট্রাক সিএনজিচালিত অটোরিক্সার সংঘর্ষে এবং মানুষ পারাপারে অন্তত দেড়শ’ ব্যক্তি নিহত হয়েছে।

সারাদেশে এ ধরনের মৃত্যু হরহামেশাই ঘটছে। আহতদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েছে অন্তত ৫শ’ জন।

সূত্র জানায়, প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো তদন্তই আলোর মুখ দেখে না।

পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলের ১ হাজার ১শ’ ২৩ কিলোমিটার রেলপথে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৯টি।

লেভেল ক্রসিং ৪ ধরনের। স্পেশাল, এ, বি এবং সি ক্যাটাগরি। স্পেশাল ক্যাটাগরিতে ২৪ ঘণ্টায় ৩ জন করে গেটম্যান দায়িত্ব পালন করে।

এ ক্যাটাগারিতে একই সময়ে ২ জন গেটম্যান দায়িত্ব পালন করে। বি ও সি ক্যাটাগরিতে কোন গেটম্যান নেই।

আর জাতীয় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে যে লেভেল ক্রসিং পড়েছে সেগুলোর মান এ প্লাস, বি প্লাস ও সি প্লাস।

মহাসড়কের এ প্লাস গেটে ৩ জন গেটম্যান, বি প্লাস গেটে ২ জন গেটম্যান দায়িত্ব পালন করে। আর কিছু লেভেল ক্রসিং আনম্যানড বা অরক্ষিত।

সূত্র আরো জানায়, লেভেল ক্রসিংয়ে কর্মরত ৭৫ শতাংশ দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে সাধারণ লোক দিয়ে কাজ করানো হয়।

অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রশিক্ষত নয়। দায়িত্ব পালনে অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। আবার পালা বদলে সময়মতো পরবর্তী গেটম্যান না আসায় অনেকটা সময় অরক্ষিত থাকে।

বিগত ২০১৪ সালে লেভেল ক্রসিং উন্নয়নে অস্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ প্রকল্পের আওতায় ১শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়।

প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা। ইতিমধ্যেই ওই অর্থে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথের গেটম্যানের বেতন দিতে ৬৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

বাকি ৩৬ কোটি টাকায় পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে রক্ষণাবেক্ষণের ২৬ শতাংশ কাজ হয়েছে।

১৯৮৪ সালের পরে রেলে কোন স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ দেয়া হয়নি। ২০১৮ সালে এক হাজার স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কোন এক জটিলতায় দু’বছর ধরে ওই নিয়োগ বন্ধ।

এদিকে প্রায় সাড়ে ৩শ’ লেভেল ক্রসিং জরুরি ভিত্তিতে সুরক্ষিত করার একটি প্রস্তাব বছর কয়েক আগে উচ্চমহলে পাঠানো হয়।

ওই প্রস্তাবে রেল ক্রসিংগুলো অরক্ষিত হওয়ার চারটি কারণ নির্ণয় করা হয়েছে।

এক. লেভেল ক্রসিং সুরক্ষা করতে সমন্বিত কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।

দুই. গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) আওতায় গ্রামীণ সড়ক পাকা হওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা ও গতি দুই বেড়েছে। কি পরিমাণ সড়ক ও কত যানবাহন বাড়ল তার প্রকৃত হিসাব রেল কর্তৃপেক্ষের কাছে নেই।

তিন. রেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা বেড়েছে। চার. রেল গেট সুরক্ষার ব্যয় সঙ্কুলান করতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ।

এ ক্ষেত্রে রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধে ওই এলাকায় কাজ করে এমন কোন বেসরকারি সংস্থা অথবা গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ নিজেদের উদ্যোগে গেটম্যান রাখে।

অন্যদিকে বর্তমানে সারাদেশেই ট্রেনের সংখ্যা ও দ্রুত গতির আন্তঃনগর ট্রেনের সংখ্যা বেড়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলে চিলাহাটি থেকে খুলনা পর্যন্ত প্রায় ৪শ’ ৫০ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিংয়ে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

এমন অবস্থায় সড়ক ও মহাসড়কে রেললাইন অতিক্রম করার সময় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রেলগেট নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়।

রেল মন্ত্রণালয়কে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ওই প্রস্তাব দেয়। একদিকে সড়ক ও জনপথ (স ও জ), এলজিইডি, আরেক দিকে রেল কর্তৃপক্ষ।

ফাইল চালাচালির কারণে রেলক্রসিং সুরক্ষায় কোনো কাজই ঠিকমতো হচ্ছে না। বি ও সি ক্যাটাগরির রেলক্রসিংগুলোতে রেল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে পারাপারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে।

এ প্রসঙ্গে রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, জনবহুল এলাকায় সড়কের সঙ্গে লেভেল ক্রসিংয়ে উন্নয়ন কাজ চলছে।

চার ক্যাাটাগরির লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে বিশেষ ও এ ক্যাটাগরির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই ক্যাটাগরির লেভেল ক্রসিং স্টিলের বার ফেলে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বাকি দুই ক্যাটাগরির লেভেল ক্রসিংয়ে উভয় পার্শ্বে সিমেন্ট খোদাই করে লিখে দেয়া হয়েছে জনসাধারণ নিজ দায়িত্বে পারাপার হবেন।

ওসব লেভেলে কোন গেটম্যান নেই। একটা সময় গ্রাম এলাকার কাঁচা রাস্তার মধ্যে লেভেল ক্রসিংয়ে শিকল টানা দিয়ে বন্ধ করা হতো।

ওই ব্যবস্থাও আর নেই। গ্রামীণ কাঁচা সড়কের বেশিরভাগই পাকা হয়েছে। সড়ক উন্নত হওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে।

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে বেপরোয়াভাবে যানবাহন চলাচলের হারও বেড়েছে। আবার কোথাও বাঁকা রেল পথের ধারে বনায়নের ঝাউ গাছ ও বড় গাছ থাকায় ট্রেন কাছে না দূরে তা বোঝা যায় না।

এই অবস্থায় খুবই নিকটে থাকা দ্রুতগামী ট্রেন লেভেল ক্রসিং অতিক্রমের সময় বাস ট্রাক টেম্পো অটোরিক্সা রেল ট্রাকে উঠলে দুর্ঘটনা আর রোধ করা যায় না।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সড়ক পথের যানবাহনের যাত্রীর হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। কালেভদ্রে ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়।