ইতালিয়ান লেখক সিল্ভিয়ার বাংলার প্রতি ভালোবাসা

Italian Writer SILVIA FAVARETTO

তাহমিনা ইয়াসমিন শশী
আজকাল আর আফিসে যেতে ভাল লাগেনা। মনটা সারাক্ষণ মৌন হয়ে থাকে কিসের যেন এক অজানা ভয় মনকে ভীত করে রাখে। এখন আর অফিসে বসে গল্প হয়না কলিগদের সাথে, এমনকি একসাথে কফি খাওয়া যায়না। এক রুমে ২ জনের বেশী অবস্থান করা যায়না।

পুলিশ স্টেশনে ইমিগ্রেশন অফিসে অভিবাসীদের ভীর আর দেখা যায়না। প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও আজকাল আর সরব নন। পাবলিক চলাচলের মাধ্যম বাস, ট্রেন, ট্রামে এখন আর দেখা যায়না যাত্রীদের সমাগম। গত বছর চীনের উহান থেকে অজানা নতুন করোনা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে।

কোন প্রতিষেধক ও নিরাময়ক না থাকায় এর সংক্রমন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেয়া হয় সামজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার উপর। ভ্যাটিকানে মানুষ বিহীন কবুতর। ভেনিসের গন্দলায় জলে ভাসছেনা নব দম্পত্তি আর পর্যটক। সমগ্র ইতালি আজ যুদ্ধ ছাড়াই অবরুদ্ধ।

অস্থিরতায় ভুগছি কিছুতেই মন ভালো লাগছিলনা। অকারণে মোবাইল নাড়াচাড়া করছি তখন চোখে ভেসে এল একটা ইমেইল বক্স। যথারীতি ইমেইল পড়ে মনের অজান্তেই আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলাম।

Writer Tahmina Yasmin Shoshi…………….Illustration: BBP

আমাকে ইমেল করে জানানো হয়েছিল আমার লেখা গল্পটি তৃতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। আনন্দে কান্না চলে আসল। কিন্তু করোনা ভাইরাস এর জন্য অনুষ্ঠানটি অনলাইনে করা হবে। করোনার প্রকোপে সমগ্র ইটালি যেন আজ স্তম্ভিত তাই পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি ভার্চুয়াল ভাবেই সম্পন্ন হবে।

৩২ বছর ধরে ইটালির তরিনো শহরে চলে আসছে আন্তজাতিক বই মেলা। প্রায় সব দেশের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বই মেলাটি উদযাপিত হয়ে আসছে। দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে আমাদের পার্শ্ববর্তি দেশ ভারত, পাকিস্তান, চীন এর মত দেশের উপস্থিতি দেখা গেলেও দেখা মেলেনি বই মেলায় বাংলাদেশের কোন বই এর স্টল। যে দেশে ২১ শের বইমেলা হয়, যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছে নির্দ্বিধায়।

সে দেশ কেন পিছিয়ে যাবে বিশ্বদরবারে? যে দেশে কবি নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি জসীম উদ্দিন, বেগম রোকেয়া, খান মোহাম্মদ ফারাবি, ফকির গরিবুল্ললাহ, হমায়ুন আহমেদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, জীবনানন্দ দাশ, মীর মোশাররফ হোসেন আরও অনেক গুনি লেখক কবি সাহিত্যিকদের দেশ। সে দেশ কেন পিছিয়ে যাবে?

আমরা কি শুধু বহিঃবিশ্বে শ্রমজীবী হিসেবেই থেকে যাবো? INTERNATIONAL BOOK FAIR FESTIVAL TORINO ONLINE AWARD এর দিন আমার সাথে পরিচয় হয় ইতালির একজন লেখিকার সাথে যার নাম SILVIA FAVARETTO.

সিল্ভিয়া তার লিখা গল্পের জন্য পেয়েছিলেন স্পেশাল পুরস্কার আন্তর্জাতিক বই মেলা থেকে। ইতালিয়ান এই লেখিকাকে নিয়ে আমার আগ্রহ তৈরি হয় কারণ তিনি বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন তাই।

আমি সত্যি খুব বেশী আবেগে আপ্লূত হই তার বাংলা ভাষার উপর ভালোবাসা দেখে। তিনি কখনো বাংলাদেশে যাননি কিংবা তিনি বাংলাদেশিও নন। সিল্ভিয়া একজন শিক্ষিকা ও গবেষক ‘IBERIAN AND Angloamerican STUDIES PHD’.

শিক্ষকতার পাশাপাশি উনি সমান্তরালভাবে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা যার নাম 7 LUNE। একইসঙ্গে লেখালেখিতো চলছেই। ২০০২ সালে তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হয় যার নাম ‘la carne del tiempo’.

২০০৭ সালে তিনি পুরস্কার পান আর্জেন্টিনা থেকে IBISKOS থেকে তার লেখা বই স্পেনিস ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে MET VENEZIA, পুরষ্কার। ২০০৮ সালে ‘parole d’acqua’, ২০১১ সালে ‘jardin Ardiente’ ২০১৪ সালে ‘sacrobosco’, ২০১৬ সালে ‘quiereo tanto a julio’, ২০১৮ সালে ‘Malpaso ediciones’, ২০১৯ সালে MESSICO ‘E vissero infelici e contente’ ২০২০ সালে ‘la notte dei corpi’, ২০২০ সালে premio speciale torino.

Italian Writer SILVIA FAVARETTO

অসংখ্য কবিতা ও উপন্যাস লিখেছেন এই গুনি লেখিকা। আমেরিকা, আর্জেন্টিনা, ইতালি থেকে জিতে নিয়েছেন অসংখ্য পুরষ্কার।

আমি জানতে চাইলাম কেন তিনি বাংলা ভাষায় কবিতা লিখলেন¬ পৃথিবীতে আরও অনেক ভাষা রয়েছে; তবে কেন বাংলাকে বেছে নিলেন?

উত্তরে আমাকে সিভিয়া আমাকে জানান,
সিল্ভিয়া যে স্কুলে শিক্ষকতা করে সেখানে কিছু বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী রয়েছে।

যাদের কাছ থেকে ২১শের আন্দোলন এর কথা শুনেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি তার আগ্রহ জাগে। এরপর ইন্টারনেটের কল্যাণে ভাষা এবং ৭১ নিয়ে যথেষ্ট জ্ঞানলাভ করেন তিনি। সিল্ভিয়া আমাকে বলেছিলেন, যে দেশ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে সেই ভাষার প্রতি আমার সন্মান জন্মেছে।

আর সেই সন্মানের জায়গা থেকেই আমার লেখা কিছু কবিতা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছি। একজন ইতালীয় নাগরিকের বাংলা ভাষার প্রতি যে ভালোবাসা ও সন্মান রয়েছে ত দেখে সিল্ভিয়ার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়েছে বহুবার।

বাংলা ভাষার প্রতি সিলভিয়ার যে টান, তা যদি আমাদের সবার ভেতরে জাগ্রত থাকে তবে আমাদের মাতৃভাষা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করি। আজকাল অনেক অভিভাবকের মুখে শোনা যায় আমার ছেলেমেয়রা আসলে বাংলা ভাষা ভালো করে জানেনা।

সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করে দেন তারা। এরপর তারা বাংলা বলতে গিয়ে ইংলিশ বাংলিশ মিলিয়ে যে জগাখিচুড়ি পাকায়। তাতে আসলে কিছুই বোঝার উপায় থাকেনা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম বরকত রফিক শফিক জব্বারসহ আরও নাম না জানা অনেক শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। মায়ের ভাষাকে রক্ষার জন্য রাজপথের সে আন্দোলনই মূলত স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার। এরপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জাতিসংঘের স্বীকৃতির ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস!

২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই ভাষার উপর ভালোবাসা বেড়ে যায়! শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, প্রভাত ফেরি, ২১শের গান গাওয়া আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলতে পারি? ফেসবুক, সোস্যাল মিডিয়া, রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার করা হয় ২১শে ফেব্রুয়ারির অমর গাঁথা।

একুশের মাস শেষ হয়ে গেলেই আমরা ভুলে যাই সব কিছু। ভাষার জন্য ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কি শুধুমাত্র একটি দিন নির্ধারণ করা উচিত? যে ভাষার জন্য যুদ্ধ করে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রাপ্য কি শুধুমাত্র একদিনের শোক প্রকাশ?

আমাদের প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে কি ভাষার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হয়ে যায়? আমাদের দেশে বেশিরভাগ অভিভাবকের ধারণা তাদের সন্তান যদি ফ্লুয়েন্ট ইংরেজি না জানলে তাহলে তাদের জাত যাবে।

ইংরেজিতে কথা বলতে না পারলে ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যত অন্ধকার। ভালো সরকারি, বেসরকারি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হতে পারবে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে পারলে তারা জন্মের পরদিনই সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দেন।

এছাড়া টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ইংলিশ কার্টুন ছেড়ে রাখেন যাতে বাচ্চাদের মগজের কোষে ইংরেজি ঢুকে পড়ে! ইংরেজদের দ্বারা এত অত্যাচারিত হয়েও ইংরেজি ভাষার প্রতি কত দরদ আহা….!

শুধু তাই নয় প্রবাসে যেসব বাঙ্গালিরা আছেন তারাও যে দেশে থাকেন সে দেশের ভাষা সন্তানদের শেখান! ইতালিতে অনেক মায়েদের কাছে শুনি আমাদের ছেলে মেয়েরা তো বাংলা ভাষা জানে না!

যে দেশে থাকি সে দেশের ভাষায় সন্তানদের শেখানোতে ভুল নেই, তবে তা নিজের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে নয় কিংবা অসম্মান করে নয়। একথা ভুলে গেলে চলবে না শেকড় বাদ দিয়ে কখনো শেখরের সন্ধান মেলে না!

জাতিসংঘের স্বীকৃতির ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ার পরেও এক শ্রেণীর মানুষের আমাদের ভাষার প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। ভাষার জন্যে বুকের রক্ত দিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করার ঘটনা বিশ্বে বিরল। তাই আসুন শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি-ই নয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই প্রতিদিন।

বাংলিশ না, বাংলা ইতালিজ না, বাংলা ফ্রেঞ্চ না বলে শুদ্ধ বাংলা। এতে ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শণ হবে। বাংলিশ বলে নিজেদের স্মার্টনেস প্রকাশ করা যায় না। বিভিন্ন দেশের ভাষা রপ্ত করা খুব ই ভালো কথা। এতে জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু তাই বলে ভাষার সংমিশ্রণ করে জগাখিচুড়ি বানানো ঠিক নয়।

ইতালিতে যখন কাফসকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার কোর্স চালু হয়েছিল, তখন তা দেখে গর্ব অনুভব করেছি। মা নামে একটি শিক্ষামূলক এবং সৃষ্টিশীল বাংলা ভাষার বই লেখা হয়েছিল এখানে। আজ কয়েক বছর ধরে আর এমন কোন বাংলা ভাষার কোর্স দেখা যাচ্ছে না।

এখানে যারা জন্মেছেন পড়াশোনা করেছেন তাদের বাংলা ভাষা জানতে হবে, শিখতে হবে তাহলে সিল্ভিয়ার মত গুণী লেখকরা তাদের গল্প কবিতা একদিন বাংলা ভাষায় লিখবেন। একদিন তাদের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে বিদেশ বিভুঁইয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষার কোনো ইনস্টিটিউট এবং গবেষণা কেন্দ্র।

-লেখক ইতালি প্রবাসী
tahmina.yasmin88@gamil.com