কথা রাখছেনা ভারত, বাড়ছে একেরপর এক সীমান্ত হত্যা

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের টহল...........ছবি: ইন্টারনেট

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: বারবার আশ্বাস দেয়ার পরেও থামছেনা সীমান্ত হত্যা। একের পর এক হত্যাকাণ্ড চলছেই। যদিও সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ-ভারত সম্মত হয়েছে কয়েক বছর আগে।

এরপরেও সেটা বন্ধ হয়নি, উল্টো বেড়েছে। বার বার কথা দিয়েও কথা রাখেনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশি বন্ধু রাষ্ট্র ভারত।

মজার বিষয় হচ্ছে মুখে বন্ধু রাষ্ট্র বললেও পৃথিবীর সবচেয়ে সহিংস সীমান্তগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অন্যতম। শুক্রবারও লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ঝালাঙ্গী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আবুল কালাম (৩০) নামে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।

বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার জরিপে এক দশকে সীমান্তে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। যদিও সরকারী হিসাবের সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত ১১ জুলাই সংসদে বলেছিলেন, ২০০৯ সাল থেকে গত ১০ বছরে বিএসএফের হাতে ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন।

সীমান্তে হত্যা বন্ধে বিজিবি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।

সবশেষ গত ডিসেম্বর দু’দেশের সীমান্ত বাহিনীর মহাপরিচালকরা ভারতে পাঁচ দিনব্যাপী সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানেও একই প্রতিশ্রুতির আশ্বাস দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

এরআগেও ভারত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সীমান্তের মৃত্যু শূন্যে আনার বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার। তবে বিএসএফের প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তবতা ভিন্ন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত বছর আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় বৈঠক করেন।

ওই বৈঠকে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তারা সীমান্ত হত্যা হ্রাসে ব্যবস্থা নেবেন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মহাপরিচালকরা ঢাকায় চার দিনের সম্মেলনে বৈঠক করেন যেখানে তারা সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি, হত্যা ও আহত করা এবং মাদক পাচারের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

তারপরও একের পর এক চলতেই থাকে অমানবিক হত্যাকাণ্ড। ১০ বছর আগে সীমান্তে নিহত কিশোরী ফেলানীর পরিবার এখনো বিচার পায়নি।

ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম এখানো আশায় বুক বেধে আছেন যে, মেয়ের হত্যার বিচার হবে। কিন্তু সে আশা কি পূরণ হবে? পেটের দায়ে ভারতে গিয়েছিলেন মেয়েকে নিয়ে।

দেশে এনে মেয়েকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন লাশ হয়ে যায় সীমান্তের কাঁটাতারে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি।

ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের ওপর বিএসএফ সদস্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কোচবিহারে বিএসএফ-এর আদালত এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে ৷

এরপর ফেলানীর বাবা ন্যায় বিচারের জন্য ভারতের সুপ্রিম কোর্টে যান। কিন্তু এখনো তার আবেদনের শুনানি শুরু হয়নি বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, আগে সবাই যোগাযোগ করতো, করোনা শুরুর পর কেউ আর যোগাযোগও করছে না। ভারত সরকার পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে শুনেছিলাম, তা-ও পাইনি। তবে (বাংলাদেশ) সরকারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা পেয়েছি।

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে সীমান্তে মোট ৪৮ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করে বিএসএফ।

এর মধ্যে ৪২ জনকে গুলি করে এবং ছয় জনকে হত্যা করা হয় নির্যাতন চালিয়ে। অপহরণ করা হয় ২২ বাংলাদেশিকে। ওই সময়ে ২৬ জন বিএসএফ-এর গুলি ও নির্যাতনে গুরুতর আহত হন।

অপহৃতদের মধ্যে মাত্র পাঁচ জনকে ফেরত দেয়া হয়েছে। বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে জানা যায়নি।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালে সীমান্তে বিএসএফ ৩৮ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করে৷ তাদের মধ্যে ৩৩ জনকে গুলি করে এবং পাঁচ জনকে নির্যাতনে হত্যা করা হয়।

২০১৮ সালে সীমান্তে ১৪ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়৷ এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বাড়ছে। বাড়ছে মারণাস্ত্রের ব্যবহার।

মানবাধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সীমান্তে নাগরিকদের মৃত্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে যতটা জোরালো প্রতিবাদ জানানোর রেওয়াজ ছিল, এখন সেটা ততটা জোরালো নয়।

অনেকে হয়রানির ভয়ে বিএসএফের নির্যাতনের কথা স্বীকার করছেন না।