ভ্যাকসিনে আগ্রহ অনীহা

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে হইচই। কেউ ভ্যাকসিন পেতে মরিয়া আবার কেউ একেবারেই অনাগ্রহী।

মূলত বিভ্রান্তির বেড়াজালে বন্দি ভ্যাকসিন। এর মধ্যে আবার বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন নেয়ার পরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে ফাইজার উৎপাদিত করোনা টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করে নরওয়েতে ২৩ জন মারা গেছেন, ভারতে টিকা গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা পর একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ৪৪৭ জনের শরীরে। যদিও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার উদ্ভাবিত ‘কোভিশিল্ড’ নাকি ভারত বায়োটেকের তৈরি ‘কোভ্যাক্সিন’-এ এই প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে তা জানায়নি ভারত সরকার।

অন্যদিকে ইসরাইলে ফাইজারের কভিড ভ্যাকসিন নেয়ার পর ১৩ জনের মুখ বেঁকে (প্যারালাইসিস) হওয়ার খবর পাওয়া গেছে বলে দাবি দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

এ ছাড়াও বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশে করোনা টিকার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনা বিশ্ব মিডিয়ায় আসার পরে ভ্যাকসিন নিয়ে যাদের মধ্যে আগ্রহের কমতি ছিল না তারাও পুনরায় ভাবতে শুরু করেছেন আদতে ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেন কিনা।

এদিকে চলতি মাসেই ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে দেশে পৌঁছানোর কথা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার করোনা টিকা কোভিশিল্ড।

তবে রোববার সন্ধ্যায় সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, ২০ জানুয়ারি দেশে ২০ লাখ টিকা আসবে।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার এই টিকা বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে দেবে ভারত সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে টিকা উপহার দেয়ার ব্যাপারে চিঠি দিয়েছে।

তিনি বলেন, চিঠিতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার ২০ লাখ টিকা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০ তারিখে এই টিকা আসার কথা।

এদিকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে টিকা দেয়া শুরু হবে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে।

কারা টিকা পাবে সে তালিকাও নির্ধারণ করা হয়েছে। তবু দেশজুড়েই টিকা নিয়ে কাজ করছে শঙ্কা। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেকেই বলছেন, তারা টিকা নিতে আগ্রহী নন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নিয়ে মানুষের শঙ্কা দূর করতে এখনো সক্ষম হয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। তারা এই কাজ না পারলে ফলাফল আশাব্যঞ্জক হবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সব টিকাতেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার টিকা ব্যতিক্রম নয়। তবে এখন পর্যন্ত এ টিকার বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পরীক্ষামূলক প্রয়োগে যতটুকু সাইড এফেক্ট দেখা গেছে তা নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। ভারতে এ টিকার প্রয়োগে নজর রাখছে বাংলাদেশ।

সেখান থেকেও অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।

১৭ জানুয়ারি থেকে ভারতে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কর্মসূচির প্রথম দিন ১ লাখ ৯১ হাজার মানুষ প্রথম ডোজ পেয়েছে।

প্রথম দিনে প্রায় তিন লাখ মানুষকে টিকা দেয়ার কথা ছিল। তবে মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

এদিকে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, টিকা নেয়ার পর হালকা গা ব্যথা, সামান্য জ্বর, চুলকানি, টিকা দেয়ার স্থান ফুলে ওঠা, ঠাণ্ডা লাগা, বমি ভাব, মাথাব্যথা, অসুস্থ বা ক্লান্তিবোধ করার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

সেরাম জানিয়েছে, টিকা নেয়া প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনের এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

পেট ব্যথা, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে এক শতাংশের মধ্যে।

মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে যা ঘটতে পারে তা হলো শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া কিংবা মারাত্মক জ্বর।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার টিকায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার খুবই কম জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা বিতরণ বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক বলেন, ‘পরীক্ষামূলক প্রয়োগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার দুই থেকে তিন শতাংশের মতো দেখা গেছে।

তবে যে কোনো টিকার ক্ষেত্রেই মাইল্ড থেকে মডারেট বা সিভিয়ার সাইড এফেক্ট হতে পারে।

টিকা দেয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। এটাকে আমরা বলি, আফটার ইফেক্ট ফলোয়িং ইমিউনাইজেশন।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে শিশু ও বড়দের যে টিকা দেয়া হয় সেখানে এনাফাইলেক্সিস বলে একটা কথা রয়েছে। এটি একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া।

তবে এর আবার বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। টিকাদান কেন্দ্রে যারা থাকবেন, তাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানাতে হবে।

ভারতের টিকা প্রয়োগের দিকে নজর রাখা হচ্ছে জানিয়ে ডা. শামসুল হক বলেন, ওখানকার পরিস্থিতি আমাদের জন্য ট্রায়ালের মতো। সেগুলো দেখার পর আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও করোনা টিকা বিতরণ কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আমার মনে হয় খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে এ আশঙ্কা থাকবে।

যে কোনো ওষুধের ক্ষেত্রেই এ আশঙ্কা থাকে। মোবাইল টিম থাকবে। টিকাদান কেন্দ্রে জরুরি কোনো ওষুধ লাগলে দ্রুত তা জোগাড় করার ব্যবস্থাও থাকবে।

মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে বিভিন্ন কারণে শঙ্কা রয়েছে এবং এটা থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল।

তিনি বলেন, সেরাম ইনস্টিটিউট এই টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল করেছে সীমিত আকারে। আমাদের দেশেও একটা সীমিত আকারের ট্রায়ালের দরকার ছিল।

এর সাইড এফেক্ট কী হবে সেটা দৃশ্যমান নয়। মনে হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টিকা নিয়ে তাড়াহুড়ো করছে।

একজন মানুষেরও যদি মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তখন দেখা যাবে পুরো কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যাবে।

এ ভ্যাকসিন নিয়ে শঙ্কার কারণ নেই, বললেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান।

মানুষের শঙ্কা কাটাতে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রচারণা চালানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। ‘এখানে ঘাটতি রয়েছে।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনদের এ সম্পর্কে বক্তব্য দেয়ার সময় আরও সতর্ক ও সচেতন থাকা উচিত।

যে কোনো ভ্যাকসিন দিলেই হালকা জ্বর বা ব্যথা হয়, এটি মানুষকে বোঝাতে হবে’- জানালেন ডা. জাহিদুর রহমান।

এদিকে গণমাধ্যমকর্মী আমীন আল রশীদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, বাংলাদেশে করোনার টিকা আসবে। সরকার বিনামূল্যেই দেবে।

ডাক্তার, নার্স, পুলিশ ও সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ টিকা নেবেন। কিন্তু দেখবেন, এর বাইরে বিশাল জনগোষ্ঠী সুযোগ থাকার পরও টিকা নেবে না।

তার এই স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেছেন অন্তত ১০ জন। নয়জনই ‘টিকা নেবো না’ বলে মন্তব্য করেছেন।

মানুষের মধ্যে এই শঙ্কা কেন জানতে চাইলে আমীন আল রশীদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ইতিবাচক অর্থে একটু ডেমকেয়ার।

আর এই নির্লিপ্ত ভাবের কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার ভয়ানক অবস্থা হলেও দেখা যাবে লোকজন টিকা নেবে না।

আবার টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার কারণেও দেখা যাবে অনেকে নিতে আগ্রহ হারাবেন। করোনার শুরুর দিকে নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়েও আমরা এমনটা দেখেছি।