শামীমের ৩৬৫ কোটি টাকা, খালেদের ৩৪, সম্রাটের ‘তেমন নেই’

Somrat-Khaled-Shamim

বাংলাবাজার ডেস্ক
সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানের মধ্যে দুর্নীতির মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে নগদ টাকার পরিমাণই বেশি। আদালতের নির্দেশে ১৬টি মামলায় অবরুদ্ধ করা টাকার পরিমাণ ৩৬২ কোটিও বেশি। আর সম্পদের পরিমাণ ৭৮ কোটি টাকার বেশি।

দুদক ও আদালত সূত্র জানায়, কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীমের (জি কে শামীম) সম্পদই সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা তার প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে প্রায় ৪১ কোটি টাকার। এরপরই আছে যুবলীগের আরেক নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সম্পদ। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা তার ৩১ কোটি টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকার। আরেক সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সম্পদ বা নগদ টাকার পরিমাণ তেমন নেই বলে দুদক সূত্রে থেকে জানা গেছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু হওয়ার পর ওই মাসের শেষ দিকে সংশ্লিষ্টদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নামে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে এ পর্যন্ত ১৬টি মামলা করেছে সংস্থাটি। এসব মামলা হয়েছে ঠিকাদার জি কে শামীম, যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সাবেক সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক ও তাঁর ভাই রূপন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী সুমি রহমান, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, তারেকুজ্জামান রাজীব ও এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ এবং যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমান ও জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলার পরপরই তাদের বিরুদ্ধে আরও নিবিড় তদন্ত শুরু করে দুদক। তদন্তের শুরুতেই তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন দুদক কর্মকর্তারা। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের স্থাবর সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংকে থাকা টাকা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন।

সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে এসব সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে স্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং ব্যাংকের অর্থ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তদন্তে আরও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, মামলার অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে কর্মকর্তারা প্রয়োজনমতো ব্যবস্থা নেন। অবৈধ সম্পদের মালিকেরা যাতে অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে তাদের সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে ফেলতে না পারেন, সে জন্য আদালতের মাধ্যমে সেগুলো ক্রোক বা ফ্রিজ করা হয়। তিনি বলেন, ‘অবৈধ সম্পদের মালিকদের ওই সম্পদ ভোগ করতে না দেয়ার জন্য আমাদের নীতিগত যে সিদ্ধান্ত তার বাস্তবায়নে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

অবরুদ্ধ হওয়া সম্পদের মধ্যে জি কে শামীমের সম্পদ সবচেয়ে বেশি: শুদ্ধি অভিযান শুরুর পরপরই গত ২০ সেপ্টেম্বর র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন জি কে শামীম। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অর্থ পাচার আইনে আলাদা মামলা করে র‍্যাব।

গ্রেপ্তারের সময় শামীমের কার্যালয় থেকে তার মায়ের নামে ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকার এফডিআরের কাগজপত্র জব্দ করে। এ ছাড়া শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চলার সময় নগদ ১ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং ৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকার সমপরিমাণ মার্কিন ডলারও জব্দ করে র‍্যাব।

এর এক মাস পর দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। মামলায় জি কে শামীমের বিরুদ্ধে ২৯৭ কোটি ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। একই মামলায় শামীমের মা আয়েশা আক্তারকেও আসামি করা হয়।

মামলার তদন্ত করতে গিয়ে শামীম ও তার মায়ের আরও সম্পদের তথ্য আসে দুদকের হাতে। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা পাওয়া যায় ৩২৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আর জায়গা-জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট মিলিয়ে ৪০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব সম্পদের দলিলমূল্য এটা হলেও বাজারমূল্য অনেক বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

সম্রাটের সম্পদ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সম্পদের খুব বেশি তথ্য নেই কোথাও। এখন পর্যন্ত তার স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ব্যাংকে মাত্র ৮৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা পেয়ে তা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

গত ১২ নভেম্বর সম্রাটের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। মামলায় ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর আবারও আলোচনায় আসে সম্রাটের নাম। তবে তাকে গ্রেপ্তারে গত ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সহযোগী আরমানসহ সম্রাটকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। বন্য প্রাণীর চামড়া রাখার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ছয় মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা হয়। মাদক পাওয়ায় আরমানকেও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

তদন্তে খালেদের সম্পদ পাওয়া গেছে বেশি: গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ শুদ্ধি অভিযান’ শুরুর দিনই গ্রেপ্তার হন মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তাঁর বিরুদ্ধেই অস্ত্র, মাদক ও অর্থ পাচার আইনে আলাদা মামলা করে র‍্যাব। এর ৩৩ দিন পর ২১ অক্টোবর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খালেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। মামলায় খালেদের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। তবে মামলার তদন্তে খালেদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যাংকে খালেদের নামে পাওয়া ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া আনুমানিক ৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়।

Courtesy: Prothomalo