কিশোর-কিশোরীদের অবাধ্যতা ও অভিবাবকদের ভাবনা

আলম শামস
দশম শ্রেণীর ছাত্র রকি। বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা বলে প্রায়ই রাত করে বাসায় ফেরে। মাঝে মাঝে ঋভযভা রাতে বাসায়ও ফেরে না। রাজধানীর মাদারটেকে তাদের বাসা। রকির বাসায় দেড়িতে ফেরায় এবং কখনো কখনো না ফেরায় মায়ের উৎকণ্ঠা বাড়ে।

মা কারণ জানতে চাইলে রকি জানায়, বন্ধুদের সাথে ক্লাসের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিল সে। রাত বেড়ে যাওয়ায় আর বাসায় ফেরা হয়- এতে টেনশনের কী আছে? আমি তো অবুজ শিশু নই?

রকির বাবা বিদেশ থাকেন। রকি বাবা-মার একমাত্র সন্তান। রকিকে নিয়ে মা সারক্ষণ দু:চিন্তায় থাকেন। মা রকিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মায়ের কথার যেন কোনো মূল্যই নেই তার কাছে।

এরই মধ্যে মা জানতে পেরেছেন, রকি নেশা করে, বাজে ছেলেদের সাথে মেশে। কলেজ পড়ুয়া কিশোরী পিংকি। বিভিন্ন অজুহাতে সময়-অসময় ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

লেখাপড়ার প্রতিও তেমন কোনো আগ্রহ নেই। বাবা-মায়ের আদেশ-নিষেধ মানতে চায় না। মা কিছু বললেই সে বলে, ভালো-মন্দ বোঝার বয়স আমার হয়েছে।

এখন সময় বদলেছে, তাই নিজেকে সময়োপযোগী করতে না পারলে আমি পিছিয়ে যাব। বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ানো, রাত জেগে ফেসবুকে চ্যাট করা, বাবার টাকা অপচয় করে প্রায়ই চাইনিজ খাওয়া কী সময়োপযোগী হওয়া? মা জানতে চান।

উচ্চবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত পারিবারের অনেক ছেলেমেয়েদের মধ্যে ইদানিং এ সমস্যা দেখা যায়। বয়:সন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়।

দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে তাদের শারীরিক ও মানসিক গঠন। তাদের চিন্তা চেতনায় এ সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আবার এ সময় তাদের আবেগও বেশি কাজ করে।

ফলে অনেক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এ সময় অবাধ্য হওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। শুনতে চায় না উপদেশ। নিজে যা ভাল মনে করে, তাই সঠিক বলে ধরে নেয়।

তাই টিনেজ বয়সীদের দিকে বাবা-মার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পাশাপাশি তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আবার শুধু শাসন করলেই হবে না, তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণও করতে হবে। প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।

সঠিক পথে তাদের পরিচালিত করতে বাবা-মার অনেক কৌশলী হতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার উপর জোর দিয়েছেন।

বিশেষ করে করে কন্যাশিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে এবং পারিবারিক বৈষম্যের শিকার কিশোরীদের সমাজের উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার দেশের বেশ কিছু স্থানে গড়ে তুলেছে কিশোর-কিশোরী ক্লাব।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এসব ক্লাব পরিচালিত হচ্ছে।

জীবনের জন্য দরকারি নানা বিষয়, বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, বাল্যবিয়ে, যৌতুক, নারী নির্যাতন, শিশু পাচার, এইডস প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে শেখানো হয়।

এতে সহযোগিতা করছে ব্র্যাকের অ্যাডোলেসেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ। রাজধানী ছাড়াও দেশের সাতটি বিভাগের সাতটি জেলায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, খুলনার চুয়াডাঙ্গা, রংপুরের ঠাকুরগাঁও, বরিশালের ঝালকাঠি, চট্টগ্রামের রাঙামাটি, সিলেটের মৌলভীবাজার ও রাজশাহীর সিরাজগঞ্জ।

কিশোর-কিশোরীদের জীবনমানের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা উপকৃত হচ্ছে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ সরকার, সুশীল সমাজের সঙ্গে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যসহ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ইউএনএফপিএর উল্লেখযোগ্য একটি প্রকল্প হলো জেনারেশন ব্রেকথ্রু।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের তাদের অধিকার ও জেন্ডার সমতার বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প চারটি জেলায় কাজ করছে।

দেশের প্রতিটি থানায় নারীবান্ধব হেল্প ডেস্ক স্থাপন করার জন্য ইউএনএফপিএ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রকল্পে কাজ করছে।

এই হেল্প ডেস্কে নারীরা তাদের ওপর যৌন সহিংসতাসহ যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও বাল্যবিয়ের খবর জানিয়ে সহায়তা চাইতে পারবে।

এ ছাড়া যৌন নিপীড়নসহ অন্যান্য সহিংসতার ও বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েদের সমর্থন দেয়ার জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি প্রকল্পে কাজ করছে ইউএনএফপিএ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য ও অধিকার বিষয়ে নারী উদ্যোক্তাদের সচেতন করার বিষয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের নিজেদের বিয়ে ও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করা হবে। এই প্রকল্পে ইউএনএফপিএ সহায়তা দিচ্ছে।

সরকার শিশুদের উন্নয়নে শিশু আইন ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এ আইনের আওতায় শিশুদের উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনে একিভূত করার লক্ষ্যে শিশু (কিশোর/কিশোরী) উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচারিত হচ্ছে।

উন্নয়ন কেন্দ্রসমূহে স্বীকৃত পদ্ধতিতে আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু ও অভিভাবক কর্তৃক প্রেরিত শিশুদের কেইস ওয়ার্ক, গাইডেন্স, কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে মানসিকতার উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, ভরণ-পোষণ, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন করে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে পুনর্বাসিত ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

সমাজসেবা অধিদফতরের প্রতিষ্ঠান শাখা শিশু (কিশোর/কিশোরী) উন্নয়ন কেন্দ্রসমূহ পরিচালনা করে। পরিচালক (প্রতিষ্ঠান)-এর নেতৃত্বে অতিরিক্ত পরিচালক, উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক সদর দপ্তর পর্যায়ে এবং মাঠপর্যায়ে ৩ জন তত্ত্বাবধায়ক শিশু (কিশোর/কিশোরী) উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট।

বর্তমানে বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ সংশোধনের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান আছে। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ সংশোধনের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৯ সালে ঢাকায় ইৎড়ংঃধষ ঝপযড়ড়ষ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে কিশোর আদালত এবং টঙ্গীতে কিশোর সংশোধনী প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। এ ছাড়া কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের জন্য কিশোর হাজত, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রবেশন, প্যারোলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষ ব্যবস্থা প্রচলিত আছে।

এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের ওপর গুরুত্বারোপ করে অপরাধী কিশোরদের সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা।

আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে কিশোরদের সংশোধনের ব্যবস্থা করাই এ সকল কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য। এছাড়া প্রতিটি বিদ্যালয়ে মানসিক দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক একজন করে শিক্ষক নিয়েগের পরিকল্পনা করছে সরকার।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কিশোর-কিশোরীদের জন্য ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সরকার বিশেষায়িত প্রকল্পভিত্তিক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

এ প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য হলো, তরুণদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। বর্তমান পরিস্থিতিতে সারা দেশের কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে অ্যাপ্লিকেশন বেজড অনলাইন প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছে।

সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে জ্ঞান বৃদ্ধিতে এবং বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জানাশোনা বাড়াতে ২০১৪ সাল থেকে গ্রামীণফোন দেশজুড়ে স্কুলগুলোতে আউটরিচ প্রোগাম আয়োজন করে আসছে।

সারাদেশে ৬ লাখ বাবা-মা এবং ১২ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে নিরাপদ ইন্টারনেট পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইউনিসেফের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে সরকার।

কিশোর অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করে আমাদের সকলের উচিত কিশোরদের অন্ধকার থেকে আলোর জগতে ফিরিয়ে আনা।

কিশোর অপরাধ সৃষ্টিতে শুধু কিশোররাই দায়ী নয়। এজন্য দায়ী আমাদের পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থা, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা।

তাই সরকারি প্রচেষ্টা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কিশোরদের সুষ্ঠু আবেগীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে যত্নবান হতে হবে। সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশু কিশোরদের জন্য সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে পিতা-মাতাকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। সন্তানের ভালোলাগা ও মন্দলাগাকে বিচার করতে হবে।

শিশু-কিশোরের সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের জন্য গঠনমূলক পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। দেশে কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্র রয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমগুলোকে শিশুর মানসিক বিকাশের উপযোগী কার্যক্রম ও অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে।

বর্তমান সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে ইদানীং টিনেজ সন্তানদের অবাধ্য হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তারা না বুঝে বিভিন্ন অন্যায়, অপরাধ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

এখনই তাদের সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে এবং তা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে।

নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। সন্তানের সুরক্ষার দায়িত্ব প্রতিটি অভিভাবকের। এ বয়সে শিশু ভুল করতেই পারে।

ভুল সংশোধন করে তাদের প্রতি সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া প্রতিটি অভিভাবকের অবশ্য কর্তব্য। কারণ একটি ভুলে তাদের জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।

তাদের একটি ভুলের ব্যথা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। পিতা-মাতার সচেতনতা এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের শিশু-কিশোরদের নিয়ে পরিবার সুন্দর আগামীর ঠিকানা হতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক