আমেরিকায় নতুন যুগের সূচনা

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইবেলে হাত রেখে বুধবার শপথ নেন জো বাইডেন- ইন্টারনেট

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন জো বাইডেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হলো।

মাত্র ৩০ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ সিনেটর নির্বাচিত হওয়া জো বাইডেন হলেন আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট। এর মধ্য দিয়ে শুরু হলো বাইডেন যুগের।

নানা আলোচনা-সমালোচনায় ভরপুর সবশেষ নির্বাচনে বাইডেনের রানিংমেট ছিলেন আফ্রোএশিয়ান বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিস।

প্রথম নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসের প্রথম হিস্প্যানিক এবং তৃতীয় নারী বিচারপতির হাতে বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১১টায় শপথ নেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নারী।

এরপর বাইবেলে হাত রেখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন জো বাইডেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান।

এর মাধ্যমে চার বছরের দীর্ঘ পথযাত্রা শেষ করছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ঝঞ্ঝামুখর শাসনামলের শেষ দুই সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ক্যাপিটল হিলের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতের জন্য নতুন এক শঙ্কার আবহে ক্ষমতা নিলেন বাইডেন।

নতুন সূচনার এই মুহূর্তের অনুভূতি ফুটে উঠেছে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের এক ডেমোক্র্যাটের কথায়, খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। কিন্তু আমরা যে ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছি তা ভোলা কঠিন।

প্রথম নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন কমলা হ্যারিস-ইন্টারনেট

এর আগে জো বাইডেন স্ত্রী জিলকে নিয়ে এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস স্বামী ডগলাস এমহফকে নিয়ে ক্যাপিটলের ন্যাশনাল মলে পৌঁছেন।

বারাক ওবামাসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সাবেক প্রেসিডেন্ট নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ক্যাপিটলে আসেন।

শপথ নেয়ার পর ভাষণে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বাইডেন বলেন, গণতন্ত্রের জন্য আজ এক নতুন দিন। তার ভাষণের মূল প্রতিপাদ্য ‘ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র’।

প্রায় আধঘণ্টার এই ভাষণে জাতীয় ঐক্যের জন্য রয়েছে ইতিবাচক আহ্বান। এ আহ্বানকে সামনে রেখেই নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন তিনি।

সেই ভাষণের অন্তর্নিহিত অর্থের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেছে বাইডেনের এবারের ভাষণের মূল বক্তব্য। যে ভাষণের প্রতিপাদ্য ছিল ‘গণতন্ত্র।’

যাতে বলা হয়েছিল, এখন কঠোর সব বাগাড়ম্বর পরিহারের সময়, উত্তাপ কমানোর সময়, আবার একে অপরের দিকে নজর দিন, একে অপরের কথা শুনুন।

এগিয়ে যেতে হলে আমাদেরকে আমাদের বিরোধীদের সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করা বন্ধ করতে হবে। তারা আমাদের শত্রু নয়, তারা আমেরিকান।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা যতটুকু সময় নিয়ে ভাষণ দিয়েছেন বাইডেনের ভাষণ তার চেয়েও একটু দীর্ঘ। চার বছর আগে ট্রাম্প দিয়েছিলেন ১৫ মিনিটের ভাষণ।

২০০৯ সালে বারাক ওবামা দিয়েছিলেন প্রায় ১৮ মিনিটের ভাষণ। আর এবার বাইডেনের ভাষণটি প্রায় ২০ মিনিটের।

এদিকে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এ বছর অভিষেক অনুষ্ঠানে দর্শক সমাগমের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

ক্যাপিটল দাঙ্গার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও বাড়তি কড়াকড়ি করা হয়। অভিষেক অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তার জন্য প্রায় ২৫ হাজার নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে স্ত্রী জিল এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের স্বামী ডগলাস এমহফ -ইন্টারনেট

গত নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে বাইডেনের আচরণ নিয়ে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন ৬৪ শতাংশ ভোটার। তাদের বেশির ভাগই মন্ত্রিসভায় বাইডেনের নিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ নীতি ও পরিকল্পনা সবকিছুই সমর্থন করেছেন।

এর ঠিক বিপরীত চিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়েন সবচেয়ে কম, মাত্র ২৯ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তার আচরণ এবং কর্মকাণ্ড নিয়েও ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে।

এ ছাড়া ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ভবনে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় ট্রাম্পের দায় কিছুটা হলেও আছে বলে মনে করেন তিন-চতুর্থাংশ মানুষ।

৫২ শতাংশ মানুষ মনে করেন ট্রাম্প ওই ঘটনার জন্য অনেকখানি দায়ী। আর তাকে দায়ী মনে করেন না মাত্র ২৪ শতাংশ মানুষ।

আবেগে কেঁদেছেন বাইডেন
অভিষেক অনুষ্ঠানের আগে বাইডেনকে দেখা গেছে অনেকটাই আবেগপ্রবণ। ওয়াশিংটনে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ডেলাওয়্যারে নিজ শহরে প্রয়াত ছেলের স্মৃতিচারণ করতে দেখা গেছে তাকে।

ডেলাওয়্যার ছাড়ার আগে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছেন তিনি। ভাষণে তিনি বলেছেন, এখন সময়টা অন্ধকার, কিন্তু আলো সব সময়ই আছে।

প্রথম দিনই ১৫ নির্বাহী আদেশ, অভিবাসনে অগ্রাধিকার
অভিষেকের আগেই বাইডেন এক বিবৃতিতে জানিয়ে দেন, শপথের পরই ১৫টি নির্দেশে সই করছেন তিনি। তার মধ্যে অন্তত ৬টিই থাকছে অভিবাসন নিয়ে।

যার মধ্যে প্রথমত, ট্রাম্প যে সাত মুসলিমপ্রধান দেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার পথ বন্ধ করেছিলেন, সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন বাইডেন। ট্রাম্প দেশের নিরাপত্তার রক্ষার যুক্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন।

আর বাইডেন তা তুলে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের ইচ্ছাই জানান দেন। এরপর বাইডেন অবিলম্বে বন্ধ করবেন যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের দেয়াল নির্মাণ।

যে দেয়াল ট্রাম্প নির্মাণ করছিলেন অবৈধ অভিবাসী আটকাতে। দেশে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দিতে বাইডেন একটি ইমিগ্রেশন বিলও ঘোষণা করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অপ্রাপ্ত বয়সে প্রবেশ করা ১০ লাখের বেশি অভিবাসীর জন্য চালু করা ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভ্যাল (ডাকা) কর্মসূচিতে ট্রাম্প যে কড়াকড়ির পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বাইডেন তারও অবসান ঘটাবেন।

এই কর্মসূচির সুরক্ষিত রাখার জন্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়ে একটি স্মারক সই করবেন তিনি।

অভিবাসন ছাড়াও বাইডেনের প্রথম অগ্রাধিকার করোনা ভাইরাস। সংক্রমণ রুখতে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ববিধি মেনে চলাসহ সিডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী সব স্বাস্থ্যবিধি কেন্দ্রীয় সরকারি ভবন, কর্মচারীর ক্ষেত্রে মেনে চলার নির্বাহী আদেশ দেন তিনি।

সব গভর্নর, সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, মেয়র, ব্যবসায়িক নেতা ও অন্য সবাইকে মাস্ক পরা, দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্য সব বিধি মেনে চলার আহ্বানও বাইডেন জানান।

বাইডেনের অন্যান্য নির্বাহী আদেশের মধ্যে আছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার বিষয়টিসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং বর্ণবাদ, এলজিবিটি সমপ্রদায়ের অধিকার এবং নারী-পুরুষ সমতার মতো আরও কিছু বিষয়।

এদিকে চার বছরের প্রেসিডেন্ট শাসনের অবসানের মুহূর্তে হোয়াইট ছেড়ে মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছে এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বর্তমানের তুলনায় আর কখনো ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৮টার দিকে অ্যান্ন্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আয়োজিত বিদায়ি অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন তিনি।

ঘাঁটিতে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সব সময় আপনাদের জন্য লড়ব। আমি নজর রাখব, আপনাদের কথা শুনব।

আমি আপনাদের বলছি, এই দেশের ভবিষ্যৎ কখনো এর চেয়ে ভালো হবে না। তবে আমি নতুন প্রশাসনের জন্য সফলতা কামনা করছি।’