আলোর নিচেই অন্ধকার, কারাগারেই হচ্ছে অপরাধ!

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: কারাগার মূলত অপরাধীদের শোধনের জায়গা। যেখানে তাদের অন্ধকার জীবন থেকে নতুন করে আলোর পথ দেখানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অন্তরীণ করে রাখা হয়। কিন্তু সম্প্রতি সেই অপরাধীদের শোধনের জায়গাটিই হয়ে উঠেছে অপরাধস্থল।

এমনটাই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে অহরহ। অর্থের বিনিময়ে এখানে মাদক, নারী, মোবাইল সুবিধাসহ সব ধরনের আরাম-আয়েশ মিলছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

পদে পদে অনিয়মে ভরা কারাগারগুলোতে পুরনো কয়েদিরা নতুন কয়েদিদের ওপর নির্যাতন চালায়, দাগি আসামি ও ভিআইপিসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চলে রাম রাজত্ব।

দিনের পর দিন অসুস্থ সেজে হাসপাতালে থেকে স্বাভাবিক জীবন যাপনেরও রয়েছে ঢের অভিযোগ। এসব ঘটনায় অনেকের শাস্তিও হয়েছে, তবুও কাঁচা পয়সার মোহে নিজেকে বিকিয়ে দেন কেউ কেউ আর এর ফলেই সুযোগ পায় অপরাধীরা।

এদিকে দেশের কারাগারগুলোতে দিন দিন মাদকসেবী বন্দির সংখ্যাও বেড়ে চলছে। বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৭০ হাজার বন্দি রয়েছে। তার মধ্যে ২৫ হাজার বন্দিই মাদক মামলার আসামি।

মাদক মামলায় বন্দিদের মধ্যে বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। যে কারণে কয়েদি ও হাজতিদের নিয়ে সব সময় বেকায়দায় থাকে কারা কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া বন্দিদের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কারারক্ষীকে বরখাস্ত ও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

কারারক্ষীসহ কারাগারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কারা অধিদপ্তর তাদের ডোপ টেস্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে। কারা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

মাত্র ছয় মাস আগে গাজীপুরের কাশিমপুর-২ কারাগার থেকে দিনদুপুরে মই নিয়ে সীমানাপ্রাচীর পেরিয়ে বেরিয়ে যান আবু বকর ছিদ্দিক নামের এক কয়েদি। ওই সময় ১২ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কারা কর্তৃপক্ষ।

ছয় মাস না যেতেই পাশের কাশিমপুর-১ কারাগারে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাইরের এক নারীর সঙ্গে এক বন্দির অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর সুযোগ হয়।

এ নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে দেশজুড়ে। পুরো কারাগার ব্যবস্থাই দুর্নীতির কারণে অরক্ষিত হয়ে আছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সূত্র জানায়, কারাগারের অনেক কর্মকর্তা ও রক্ষী মাদক কারবারেও জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে ক্যানটিনের খাবার ও দর্শনার্থী নিয়ে বাণিজ্য, বন্দিদের নির্যাতন করে অর্থ আদায়, বন্দিদের মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার করতে দেয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ মিলছে অহরহ।

কারাগারগুলোকে অনিয়মের আখড়া বানিয়ে কারা কর্মকর্তারা গড়ছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বস্তাভরা টাকা নিয়ে ধরাও পড়েছেন ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কারা কর্মকর্তা। তাদের বিচার চলছে। কিন্তু থেমে নেই টাকার বিনিময়ে অপরাধ করার সুযোগ দেয়া।

সর্বশেষ ‘হলমার্ক’ কেলেঙ্কারির কারাবন্দি তুষার আহমেদের কাশিমপুর-১ কারাগারে এক নারীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর বিষয়টি কারাগারে ভয়াবহ অনিয়মকে সামনে এনেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, কাশিমপুরের ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কারা সূত্র জানায়, গত তিন বছরে শতাধিক কারা কর্মকর্তা ও রক্ষীকে অপরাধের জন্য শাস্তি দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারা ক্যাম্পাসে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগে পলাশ হোসেন (৩০) নামের এক কারারক্ষীকে হাতেনাতে আটক করা হয়।

ঘটনার পর থেকে অন্য দুই কারারক্ষী পলাতক। একই বছর ২১ সেপ্টেম্বর মাদক কারবার ও সেবনের অভিযোগে হাই সিকিউরিটিসহ কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ ও ২-এর পাঁচ কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এর মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় কর্মকর্তা ও কারারক্ষী মিলিয়ে অন্তত ৭০ জনের বিরুদ্ধে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায়।

এর মধ্যে তিনজনকে চাকরিচ্যুত এবং দুজনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে মাদকের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে বরিশাল কারাগারের চার রক্ষীকে বরখাস্ত করা হয়।

এদিকে কাশিমপুরে কারাগার রয়েছে চারটি। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে নাশকতার মামলায় কয়েক শ’ কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হন।

অনেকের ছিল জীবনে প্রথম কারাবাস। তাদের কাশিমপুরের বিভিন্ন কারাগারে এনে মানবতাবিরোধী অপরাধ, জঙ্গি ও নাশকতাসহ বিভিন্ন দাগি আসামিদের সঙ্গে রাখা হয়।

ওই সময় অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বন্দি ভিআইপি নেতাদের আরাম-আয়েশে জেলখানায় থাকার সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগ ওঠে কারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ পেয়ে ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ভিআইপি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক কয়েদি ও হাজতিদের কাছ থেকে ১৬টি মোবাইল ফোন, একটি মিনি ল্যাপটপ, ১০টি পেনড্রাইভ, ৫৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, বিপুল পরিমাণ গাঁজা এবং বেশ কিছু রাইস কুকার, ব্লেন্ডার ও টি-হিটার ফ্লাস্ক উদ্ধার হয়।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের কাছেও মোবাইল ফোন পাওয়া গিয়েছিল।

এই কারাগারে শীর্ষ জঙ্গিসহ বন্দিরা নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠে আসছিল।

কাশিমপুর কারাগার থেকে জঙ্গি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন, বোমা মিজান ওরফে জিহাদুল ও রাকিব হাসানকে ময়মনসিংহ আদালতে নেয়ার সময় পথে ত্রিশালে সহযোগীরা প্রিজন ভ্যানে হামলা করে পুলিশ হত্যা করে তাদের ছিনিয়ে নিয়েছিল।

এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে, ছিনিয়ে নেয়া তিন জঙ্গির মধ্যে রাকিব হাসান সহযোগীদের সঙ্গে নিয়মিত মোবাইল ফোনে কথা ও খুদে বার্তা আদান-প্রদান করতেন।

গত ৭ আগস্ট কাশিমপুর-২ থেকে কৌশলে পালিয়ে যান যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আবু বকর সিদ্দিক। তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।

কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি প্রিজনস কর্নেল আবরার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, যে ঘটনা আমাদের চোখে আসছে সেগুলো তদন্ত করে দেখছি। প্রমাণ পেলেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কারাগারের স্টাফ ও কারারক্ষীদের ডোপ টেস্টের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে কারা অধিদপ্তর। মাদকাসক্ত কারারক্ষী ও স্টাফদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে।