মিনিকেট, এক ফাঁকির নাম

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: ফসলের ক্ষেতে মিনিকেট নামে কোনো ধানের অস্তিত্ব যেখানে নেই, সেখানে বাজার সয়লাব মিনিকেট নামের চালে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. কৃষ্ণ পদ হালদার বলেন, মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত নেই।

তাহলে এই নাম কী করে এল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারতের কৃষকরা এই নাম দিয়েছে। তবে গবেষণাগারে এই জাতের কী নাম দেয়া হয়েছে, তা আমরা জানতে পারিনি বা জানার চেষ্টা করিনি।

গত মওসুমে দেশে ধানের মোট ফলন ছিল ৩৮৬ লাখ টন; যার মধ্যে কৃষকের কাছে পরিচিত ‘মিনিকেট’ হিসেবে চাষ হয়েছিল মাত্র ৫ লাখ টন।

অথচ বছরজুড়ে বাজারে কিংবা অটো রাইস মিলগুলোর সরবরাহ লাইনে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই থাকছে মিনিকেট চাল।

ড. কৃষ্ণপদ বলেন, মূলত মিনিকেট নামে প্রচলিত ধানের আবাদ বাংলাদেশে খুব বেশি একটা হয় না। ধান গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল ধান থেকে চাল তৈরি করে সেটাই মিনিকেট হিসেবে বিক্রি করছে মিল মালিকরা।

এখন এমন আধুনিক যন্ত্রপাতি এসেছে যে, যে কোনো ধানকে কেটে যে কোনো আকৃতি দেয়া হয়। ফলে ধান যাই হোক, মিনিকেট চাল তৈরিতে মিলগুলোর কোনো সমস্যা হয় না।

দেশে মিনিকেটের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা রশিদ এগ্রোর প্রতিষ্ঠাতা রশিদ এ বিষয়ে বলেন, আমরা যারা হাস্কার, আমরা প্রথমে ধানের ওপর থেকে খোসা ছাঁটাই করি।

তারপরে এটাকে হোয়াইটনারে দিয়ে সাদা চকচকে করি। বাজারের চাহিদার কারণে আমরা বাড়তি প্রযুক্তি ও শ্রম ব্যবহার করে চালকে আরও উজ্জ্বল করে থাকি।

কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বোরো মওসুমে ‘মিনিকেট’ ধানের উৎপাদন মাত্র ৫ লাখ ৯৯২ মেট্রিক টন।

মিনিকেটের কাছাকাছি আকৃতির নাজিরশাইল ধানের উৎপাদন ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬২৪ মেট্রিক টন।

অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের মনিটরিং শাখার উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানান, একই মওসুমে চিকন চালের ধান হিসাবে পরিচিত বিআর ২৮ ধান উৎপাদন হয়েছে ৪১ লাখ টন, বিআর ২৯ উৎপাদন হয়েছে ৪৩ লাখ টন।

একইভাবে ব্রি ৫০ উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ টন, ব্রি ৫৮ উৎপাদন হয়েছে ১৬ লাখ টন।

বর্তমানে দেশে ১৯ হাজার ৭৩৪টি চালকল বা চাতাল রয়েছে। এদের মধ্যে যারা বৃহদাকারে চালের আন্তজেলা বাণিজ্য করে থাকে, তারা সবাই মিনিকেট ব্র্যান্ডের চাল উৎপাদন করে থাকে।

বাজারে এখন বিআর আটাশ চালের ৫০ কেজির বস্তার মূল্য ২৩০০ টাকা থেকে ২৪০০ টাকা। আর একই ওজনের মিনিকেট চালের বস্তা ২৯০০ টাকা।

ব্যাপক চাহিদার কারণে মিনিকেটের দাম সারা বছরই অন্যান্য চিকন চালের চেয়ে বস্তায় ৩০০/৪০০ টাকা এগিয়ে থাকে। তাহলে কী অধিক লাভের আশায় মিনিকেট ধান ছাড়াও অন্যান্য জাতের ধান ভেঙে মিনিকেট চাল তৈরি করা হচ্ছে?

উত্তরবঙ্গের মিলগুলোতে ‘মিনিকেট’ ধানের কাছাকাছি মানের ও আকৃতির জিরাশাইল ধান থেকে মিনিকেট চাল করা হয় বলে দাবি করেন রশিদ।

তবে মিনিকেটের বাজার যখন একচেটিয়া হয়েছে, তখন অনেক মিল মোটা ধান কেটে মিনিকেটের নামে বিক্রি করছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।

এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী কম-বেশি সব জায়গাতেই রয়েছে। আমি এটা অস্বীকার করব না। এতে করে ক্রেতারা একটু প্রতারণা শিকার হয়ে থাকেন।

অনেকে হয়ত প্রতি বস্তায় ৫০/৬০ টাকা কমে পেয়ে এই কাটছাঁট করা চালগুলো কিনে থাকেন। কিন্তু মানের দিক থেকে এটা অনেক ডাউন।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রশিদের সঙ্গে আবার দ্বিমত করেছেন এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গের চাল ব্যবসায়ী লায়েক আলী।

জয়পুরহাটের এই চালকল মালিক বলেন, যে ধান থেকে মিনিকেট চাল হয়, তাকে কোনো এলাকায় মিনিকেট আবার উত্তরবঙ্গে বলে জিরাশাইল। মূলত জিরাশাইল ধান থেকেই মিনিকেট চাল তৈরি করা হয়। উত্তরবঙ্গে জেলাগুলোতে এর ব্যাপক আবাদ রয়েছে।

লায়েক বলেন, উত্তরে দিনাজপুর থেকে শুরু করে নওগাঁ, বগুড়া, আর দক্ষিণে খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর সর্বত্র এই মিনিকেট ধান জিরাশাইল নামে আবাদ হচ্ছে। অন্যান্য ধানের তুলনায় এই ধানের ফলন ভালো, বাজার মূল্য বেশি।

ধানের খোসা ছাড়ানোর পর বেশি ঘষে কমিয়ে ফেলা চাল খেলে তাতে ক্ষতিকর হয় কি না, সে প্রশ্ন করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক তাসনিম জারার কাছে।

তিনি বলেন, মিলগুলোতে অধিক পরিমাণে ঘষে ফেলার ফলে চালে ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদন কমে যায়, সেখানে কার্বোহাইড্রেটের বড় একটা অংশ অবশিষ্ট থাকে।

মেশিনে চালকে ঘষামাজা করে সরিয়ে দেয়া ফাইবার কোলস্টেরল স্বল্পতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করতে পারে।

দেশের প্রধান খাবার চালের একটি ধরনে এই ফাঁকি নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের মন্ত্রীরা কথা বললেও এনিয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও ‘মিনিকেট’ সমস্যা নিয়ে আপাতত ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপরেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ বলেন, বর্তমান আইন দিয়ে এই কাজটি প্রতিরোধ করার সুযোগ নেই।

প্যাকেটের গায়ে ‘মিনিকেট’ লিখে ভেতরে অন্য জাতের চাল সরবরাহ করলে তা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর ৩২তম ধারা অনুযায়ী অপরাধ।

এ বিষয়ে মঞ্জুর বলেন, এটা হতে পারে; কিন্তু বিষয়টি আগে আমাদেরকে প্রমাণ করতে হবে। তবে সেই আইনের প্রয়োগ ঘটানোর জন্য উদ্যোগটি কোন সংস্থা থেকে কীভাবে কতটুকু নেওয়া হবে, সেটা ঠিক করা প্রয়োজন।

চাল ঘষে চিকন করলে হয়ত চালের পুষ্টিগুণ কমে, কিন্তু সেটা ভেজাল খাবার বলা যায় না। নিরাপদ খাদ্য আইনে আপাতত ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ধরুন অধিক তেলে ভাজা মোগলাই খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু সেটা তো আর নিষিদ্ধ করা যায় না।

ভোক্তাদেরকেই পরিস্থিতি বুঝে এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। মিনিকেট চালের নামে ভোক্তা ঠকানোর বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে এনিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। খবর বিডিনিউজ২৪ ডটকমের।