নার্সিং পেশার বাড়ছে জনপ্রিয়তা

ফাইল ফটো - ইন্টারনেট

আলম শামস
ওটি নার্স পারুল আক্তার। মানব সেবায় ব্রত হয়ে এসএসসি পাস করার পর সলিমুল্লাহ নার্সিং ইনস্টিটিউট ভর্তি হন। ৪ বছরের ডিপ্লোমা নার্সিং কোর্স শেষ করে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টরিয়া জেনারেল হাসপাতালে মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

সেবার মাঝেই আনন্দ-বিনোদন, সেবার মাঝেই আয়-রোজগার, সেবার মাঝেই সুখ-দুঃখ। অসুস্থ রোগীদের সেবার মাধ্যমে সুস্থ করার মাঝেই আনন্দ খুঁজে পান তারা।

অচেনা অজানা মানুষদের পরম মমতায় আপন করে নেন এই পারুলরা। ইট পাথরের এই শহরে কিছু মানুষ এখনও আছেন যারা অপরকে নিয়ে ভাবেন।

অপরের উপকারে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চান। মানব সেবায় যারা পেশা হিসেবে বেছে নেন, তারা হলেন সেবিকা। আমরা তাদেরকে নার্স হিসেবেই জানি। বিভিন্ন হাসপাতালে কিংবা ক্লিনিকে মানবসেবা পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নারীদেরই কাজ করতে দেখা যায়।

নার্সিং এমন একটি পেশা যা সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এ পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত, দক্ষ কিংবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি নার্স বা সেবিকা নামে পরিচিত। পেশা হিসেবে নার্সিং হালআমলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

এর পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও রয়েছে। যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করলে কাজের পর্যাপ্ত ক্ষেত্র নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, তার মধ্যে নার্সিং অন্যতম।

নার্সিং শব্দটির সাথেই জড়িয়ে আছে অসুস্থ মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকার অনুষঙ্গটি। নার্সিং শব্দের আভিধানিক অর্থ তত্ত্বাবাবধান বা সেবা করা।

নার্স বা সেবিকা রঙে সাদা, পোশাকে সাদা, মনে সাদা, মানে সাদা। সাদায় যেন একাকার নার্সিং পেশা। সাদা সেতো শান্তির প্রতীক।

জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয়ভাবে সাদা রঙের গুরুত্ব আছে। এ পেশায় আসতে হলে অবশ্যই সেবামনস্ক হতে হয়। হয়তোবা সাদামনের মানুষ বলে শান্তির রঙ সাদা ইউনিফর্মের নার্স পেশাকে গ্রহণ করে সমাজের কিছু আপনজন।

যাদের সেবায় মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠি আমরা। নার্সরা পেশা ও সেবাকর্ম দিয়ে মানুষের মন জয় করে। জয় করে জীবন ও বিশ্ব।

নার্সিং একটি সেবামূলক পেশা। অনেক পেশার মধ্যেও পেশা হিসেবে নার্সিং দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশেই রয়েছে নার্সদের চাহিদা।

আসলে এটি এমন একটি পেশা, যার চাহিদা নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একদিকে যেমন বিদেশে এ পেশায় কাজ করার সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে দেশেও কাজ করার অপার সুযোগ রয়েছে।

কারোনাকালে নার্সদের চাহিদা ও গুরুত্ব বেড়েছে কয়েক গুণ। দিন দিন মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে হাসপাতাল ও ক্লিনিক। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগ।

সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নার্সের চাহিদা। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৬ হাজার ৩৫০ জন নার্স সৌদি আরব, লিবিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ১৩টি দেশে কর্মরত রয়েছেন।

এ ছাড়াও দেশে সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, হোটেল-মোটেল, এনজিও এমনকি পর্যটন করপোরেশনেও ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে।

নার্সিংয়ের ওপর স্নাতক পর্যায়ের পড়ালেখা করার সুযোগ কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশে ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে নয়টি বেসিক বিএসসি নার্সিং কলেজে এ কোর্স চালু রয়েছে।

এদের প্রতিটিতে আসন সংখ্যা ১০০টি করে। কলেজগুলোতে বিএসসি ইন নার্সিংয়ের ওপর চার বছরের অনার্স কোর্স করার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সরকারি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কলেজ আছে ৪৩টি। আর বেসরকারি কলেজ আছে প্রায় ৭০টি।

এ ছাড়া সরকারি বিএসসি ইন নার্সিং কলেজ আছে ৯টি, বেসরকারি ২১টি। বিদেশি কারিকুলামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই দেশের বিএসসি ইন নার্সিংয়ের পাঠ্যসূচি তৈরি করা হয়।

নার্সিং পেশায় আসতে চাইলে আবেদনকারীকে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত যেকোনো নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং বা বিএসসি ইন নার্সিং কোর্স পাস করতে হবে।

আর ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা যেকোনো বিভাগ থেকে ন্যূনতম এসএসসি। অন্যদিকে বিএসসি ইন নার্সিং কোর্সের জন্য বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জীববিদ্যাসহ এইচএসসি পাস হতে হবে।

এ ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় মোট জিপিএ-৬ পয়েন্ট এর বেশি থাকতে হবে। বর্তমানে এই ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সগুলো তিন বছরমেয়াদি এবং বিএসসি কোর্সটি চার বছরমেয়াদি।

গতবছর গাজীপুরের কাশিমপুরের সারাবোর তেঁতুইবাড়ি এলাকায় শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে নার্সিং কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা করেছিলেন, নার্সিং শিক্ষা পর্যায়ক্রমে স্নাতক, মাস্টার্স এবং পিএইচডিসহ উচ্চতর ডিগ্রি করার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে, যা নার্সিং পেশায় নিয়োজিতদের জন্য সুখবর।

নার্সিং পেশার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত আন্তরিক। বিশ্বের অনেক দেশের সহযোগীতাও রয়েছে। আমাদের অনেক সুযোগ আছে।

এগুলোকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স প্রয়োজন। আমাদের ডাক্তার আছে ৩০ হাজার।

এক্ষেত্রে নার্স প্রয়োজন ৯০ হাজার। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নার্স ও মিডওয়াইফাদের জন্য নতুন পদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে একটি অর্গানোগ্রাম করা হয়েছে। সেখানে ৭৫ হাজার নার্সের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩২ হাজার ৫৯১ জন নার্স ও ১ হাজার ১৪৯ জন মিডওয়াইফার কর্মরত আছেন।

মিডওয়াইফদের জন্য ১ হাজার ৮৫০টি শূন্য পদ পূরণের চাহিদাপত্র পিএসসির কাছে পাঠানো হয়েছে। এ বছরের মাসের মধ্যে শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ প্রদান করা হবে।

এছাড়া নার্স ও মিডওয়াইফদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। দ্রুতই এ কাজ শেষ হবে। তখন তাদের মেধা ও কাজের পরিধি কেমন তার ওপর ভিত্তি করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের ডাক্তার স্পেশালিস্ট আছে, ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে নার্সদেরও স্পেশালিস্ট করে গড়ে তোলা হবে।

দেশে এখন প্রায় সব জেলা উপজেলা শহরগুলোতেই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, আরও হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছরই নার্সের প্রয়োজন হয়, করোনায় তা আরো বেড়েছে। করোনাকালে সরকার পাঁচ হাজারের বেশি নার্স নিয়োগ দিয়েছে।

সামনে আরো নার্স নিয়োগ করা হবে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারদের উন্নয়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের ত্রিমুখী উন্নয়ন, জেন্ডার সমতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব রাখা সম্ভব, যা টেকসই উন্নয়নে লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

নার্সিং জনসেবামূলক পেশা। এ পেশায় আসতে হলে মানুষের সেবার মানসিকতা থাকতে হবে। একজন নার্সকে সাধারণত চিকিৎসকের নানা কাজের সহকারী হিসেবে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের আউটডোর ও ইনডোর, অপারেশন থিয়েটারে কাজ করতে হয়।

এ ছাড়া রোগীকে ওষুধ গ্রহণে সহায়তা করাসহ নানাভাবে সেবা করার কাজ করতে হয়। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল থেকে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে তো বটেই, বিদেশেও নার্সিং পেশার দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। তাই এ পেশায় বর্তমানে যেমন রয়েছে সম্মান, তেমনি রয়েছে সম্ভাবনা। এখানেও অন্যান্য চাকরির মতো ভালো বেতন ও অন্যান্য সুবিধার পাশাপাশি পদোন্নতির ব্যবস্থা আছে।

দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নার্স থেকে সিনিয়র স্টাফ নার্স ও সুপারিনটেনডেন্ট, নার্সিং ট্রেনিং কলেজের প্রশিক্ষক হওয়ার সুযোগ আছে। এ ছাড়া সরকারের সেবা পরিদপ্তরের উচ্চপদস্থ পদে যেতে পারেন নার্সরা।

বর্তমান সরকার নার্সদের পেশাগত মান উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও জীবনমানের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিতে খুবই আন্তরিক।

এ জন্য নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, নার্সিং কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বেতন ভাতা বাড়নো হয়েছে। যা অতীতে যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

মানব সেবার মানসিতা নিয়ে যে কোনো নারী এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। মানবসেবার পাশাপাশি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে এ পেশায়।

লেখক : সাংবাদিক