কমেছে মাতৃমৃত্যুর হার

সেলিনা আক্তার
বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা রাশিদা আক্তার (২৫) প্রসব বেদনা ওঠে। খবর দেয়া হয় গ্রাম্য দাই জরিনা বেগমকে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব হচ্ছিল না।

তখন জরিনা বেগম জোর করে প্রসব করানোর চেষ্টা করেন। দাইয়ের নিরাপদ সন্তান প্রসবের ওপর কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। এতে রাশিদার ব্যাপক রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

রাশিদাকে নেয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার ১৫ মিনিটের মধ্যে মারা যান রাশিদা। এটি ২০১৫ সালের জুলাই মাসের ঘটনা।

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় রাশিদার জীবনে এ করুন পরিণতি ঘটেছে। শুধু রাশিদাই নন, গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসবোত্তর সেবা সম্পর্কে সচেতনতা না থাকায় বহু নারী এভাবে অকালে মৃত্যুবরণ করছেন।

অথচ এই মৃত্যু পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। গর্ভকালীন অথবা প্রসবকালীন যেকোনো জটিলতায় কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে।

নিরাপদ মাতৃত্ব বলতে বোঝায়, যেখানে একজন নারী নিজের সিদ্ধান্তে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, যত্ন ও পুষ্টিকর খাবার পাবেন।

যেমন কমপক্ষে চারবার প্রসবপূর্ব চেকআপ, সন্তান প্রসবের সময়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার, দক্ষ দাই (স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট বা মিডওয়াইফারি) দ্বারা সন্তান প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সঠিক পরিচর্যা।

এরপরও যদি গর্ভকালে ও প্রসবকালে কোনো জটিলতা দেখা দেয়, প্রসব বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তাকে জরুরি সেবার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গর্ভকালীন, প্রসবকালীন বা প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে গর্ভজনিত কারণে কোনো মায়ের মৃত্যু হলে তাকে মাতৃমৃত্যু বলা হয়।

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর ব্যাপারে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো নিরাপদ মাতৃত্ব পুুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি এক লাখে ১৭০ জন মা মারা যাচ্ছেন। তবে গত তিন দশকে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

১৯৯০ সালে যেখানে ৫৭৪ জন মায়ের মৃত্যু হতো, ২০১৫ সালে ১৯৪ জনে নেমে আসে। আর বর্তমানে ১৭০। অধিক জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ।

মধ্যম আয়ের এ দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ছিল এক সময় উন্নতির অন্তরায়। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা, স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক অগ্রগতি এবং স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সবার ঐকান্তিক শ্রমে এ সমস্যা অনেকখানি সমাধান হয়েছে।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, করোনায় টিকাদান কর্মসূচিসহ করোনা মহামারি সফলভাবে মোকাবিলা করা সবই এ সরকারের কৃতিত্ব। গত দশ বছরে বাংলাদেশ বিভিন্ন সূচকে অনেক এগিয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশে এক দশকে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ, আন্তরিক প্রয়াস, উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার ও জনবান্ধব জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির কারণে। পাশপাশি চিকিৎসকদের আন্তরিক সেবায় এ ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে সফলতা।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায়, মাতৃমৃত্যু বা মাতৃত্বজনিত অসুস্থতার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।

এর মধ্যে, বাাড়িতে অদক্ষ দাইয়ের মাধ্যমে সন্তান প্রসব, মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে সঠিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, যত্ন, পুষ্টির অভাব, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ না করা, অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। এছাড়া সময়মতো স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোতে না যাওয়া ইত্যাদি। তবে গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক গর্ভকালীন মায়েদের দুর্দশা অনেকখানি লাঘব করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধের চারটি কারণ হলো- গর্ভকালীন যত্ন। কোনো নারী গর্বভতী হলে কমপক্ষে চার বার প্রসবকালীন চেকআপ করতে হবে; দ্বিতীয়ত, এই সময় ডাক্তার, সেবিকা এবং ধাত্রীদের জরুরি প্রয়োজনে যেনো উপস্থিতি হয় সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনা করা এবং অন্যান্য জটিলতার সনাক্ত করতে হবে; তৃতীয়, মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণগুলি মোকাবেলার জন্য কিছু বিষয় যত্নশীল হতে হবে যেমন রক্তক্ষরণ, অনিরাপদ গর্ভপাত, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে; ৪র্থ প্রসবের পর ছয় সপ্তাহ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, ১০৭ মেডিকেল কলেজ, ৫ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও অন্যান্য হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ৫ লক্ষাধিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মী দেশের সব প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যসেবায় সদা নিয়োজিত রয়েছেন।

করোনাকালেও স্বাস্থ্যসেবা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে লক্ষ্যে সরকার জরুরিভিত্তিতে দুই হাজার ডাক্তার এবং ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩০ প্রকারের ঔষধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। হাতের নাগালেই এখন কিমিউনিটি ক্লিনিক, চব্বিশ ঘন্টাই খোলা থাকে। স্বাস্থ্যকর্মীদেরও পাওয়া যায় খুব সহজেই। এসব উদ্যোগের ফলে নারীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া হার অনেক বেড়েছে।

এছাড়া ঘরে বসে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করেও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে। সরকার দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের সহায়তার জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্যক্রম চালু করেছে। বর্তমানে ৮ লক্ষ দরিদ্র নারীকে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

প্রতিটি মা মাতৃত্বকালীন ভাতা হিসাবে প্রতিমাসে ৮০০ টাকা করে পাচ্ছেন। ২০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের একজন দরিদ্র মা প্রথম এবং দ্বিতীয় সন্তান গর্ভধারণকালে এই ভাতা পেয়ে থাকেন। মাতৃত্বকালীন ভাতা হলো দরিদ্র মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম।

এ ভাতা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া ছিল সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার তা ভালোভাবে অর্জন করতে পেরেছে।

গণমাধ্যমের নানারকম প্রচারের ফলে জনসচেতনতা তৈরি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন করা সকলের দায়িত্ব।

মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে সাফল্য অর্জন করায় বাংলাদেশ এমডিজি পুরস্কার লাভ করেছে। স্বাস্থ্যখাতে যে সফলতা এসেছে, তা আরো এগিয়ে নিতে আমাদের প্রত্যেকেরই সচেতনতা প্রয়োজন।

আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে এবং প্রসবকালীন মৃত্যুর হার শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

লেখক : সাংবাদিক