পদ্মা সেতু সক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক

বাংলাবাজার পত্রিকা
ডেস্ক: ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকিয়ে রয়ঃ/জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়’- কবি সুকান্ত বোধহয় আজ বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক।

কোটি বাঙালির প্রাণের আবেগ, দ্রোহ, শক্তি, সাহসের প্রতীক চরণগুলি। খরস্রোতা পদ্মার বুকে দ্রোহের সেতু আজ দেশ-বিদেশের সব আলোচনা-সমালোচনা, ষড়যন্ত্র-কূটমন্ত্রের জবাব।

বাংলাদেশের সাহস। বিশ্বের বিস্ময়। পৃথিবী সত্যি অবাক তাকিয়ে রয়! শনিবার সকালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুরু হয় নতুন পথচলার। সারাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ২১ জেলার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম।

সেতু উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ আজ গর্বিত। অনেক বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে, ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে।

এই সেতু শুধু সেতু নয়, শুধু ইট-সিমেন্ট-কংক্রিটের কাঠামো নয়, এই সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। সক্ষমতার, মর্যাদার প্রতীক।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে মাওয়া প্রান্তে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

এই সেতু বাংলাদেশের জনগণের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, সাহসিকতা, সহনশীলতা।

বাঙালি জাতির জেদ, প্রত্যয়। শেষ পর্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে যাত্রা করেছি। আমরা বিজয়ী হয়েছি।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের ২২ দিনের মাথায় সেতুর নকশা তৈরির জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে টাকা দিতে রাজি হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের প্ররোচণায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যায়।

তাদের চ্যালেঞ্জ করলাম, দুর্নীতির প্রমাণ দেখাতে হবে। আমরা থেমে যাইনি। স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদদের কথা শুনেও মনে হয়েছে, সত্যি বুঝি দুর্নীতি হয়েছে।
অনেক পানি ঘোলা হয়েছে, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে।

ষড়যন্ত্রের কারণে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দুই বছর বিলম্ব হয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হতোদ্যম হইনি। মাথা নোয়াইনি। নিজেদের অর্থায়নে সেতু করার ঘোষণা দিই।

উপদেষ্টা কমিটি হয়েছিল জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে। তারাও বিশ্বাস রেখেছিলেন, আমরা পারব।

নিজস্ব অর্থায়নে সেতু করা নিয়ে অনেকের সন্দেহ ছিল। তারা মনে করেছিলেন, সারা জীবন অন্যের দয়ায় চলব। বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল করার সিদ্ধান্ত নিয়েই এগিয়ে চলেছি।

জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের শক্তি বড় শক্তি। এ শক্তি নিয়েই নির্মাণকাজ শুরু করি।

বাংলাদেশের জনগণকে স্যালুট জানাই। বাবা, মা, ভাই সব হারিয়ে এ দেশের মানুষের ওপর ভরসা রেখেছি। জনগণের অনেকেই অর্থ দিতে চেয়েছিলেন। বাজেটের টাকাও জনগণের টাকা।

ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বলেছিলেন নিজেদের অর্থায়নে সম্ভব নয়, স্বপ্নমাত্র।

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ, অনুযোগ নেই। তাদের চিন্তার, আত্মবিশ্বাসের দৈন্যতা আছে। আজকের পর তাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়বে যে বাংলাদেশ পারে।

অর্থনীতি ধসে পরেনি, সচল আছে। করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মোকাবিলা করেও বাংলাদেশের অর্থনীতি গতিশীল।

যারা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করেছেন, বাধা দিয়েছেন, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। হূদয়ে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে, দেশের মানুষের প্রতি তারা আরও দায়িত্বশীল হবেন।

পদ্মার মতো স্রোতস্বিনী নদীতে সেতু নির্মাণ চ্যালেঞ্জের ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্রোতস্বিনী পদ্মার গতি, পথ ধারণা করা কষ্টকর। এর বাস্তবায়ন ছিল কঠিন, চ্যালেঞ্জের।

গুণগতমানে কোনো আপস করা হয়নি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। গভীরতম পাইল ব্যবহার করা হয়েছে।

পদ্মা নদীকে শাসনে রাখাও চ্যালেঞ্জ। তা মোকাবিলা করেই দুই পাড়কে সুরক্ষিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু আঞ্চলিক যোগাযোগে অবদান রাখবে। এই সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার উন্নতি হবে।

ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে, সহজে যাতায়াত করতে পারবে। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হবে। পদ্মার ওপারের অবহেলিত মানুষ আর অবহেলিত থাকবে না।

জিডিপি বাড়াবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক গড়ে তোলা হবে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্যে এই সেতু বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

এই অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের ঐতিহাসিক দিনে যার যার অবস্থান থেকে দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার শপথ নেয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মাওয়া প্রান্তের সুধী সমাবেশ শেষ করে সেতুতে টোল দিয়ে জাজিরা প্রান্তে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ১২টা ৩৭ মিনিটে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে সেতুর ফলক উন্মোচন করেন তিনি।

ফলক উন্মোচনের আগে মোনাজাত করেন প্রধানমন্ত্রী। মোনাজাত পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

এর আগে বেলা ১১টা ৫৮ মিনিটে মাওয়া প্রান্তের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী গাড়ি বহরটি সেতুর মূল অংশে প্রবেশ করে।

সে সময় গাড়ি থেকে সেতুতে নামেন প্রধানমন্ত্রী এবং সেতুতে দাঁড়িয়ে বিমানবাহিনীর মনোমুগ্ধকর আকাশ পথের মহড়া উপভোগ করেন তিনি।

সেতুর উদ্বোধন করতে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশের মঞ্চে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সে সময় সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী মাওয়া পয়েন্টে স্মারক ডাকটিকিট, স্যুভেনির শিট, উদ্বোধনী খাম এবং বিশেষ সিলমোহর উন্মোচন করেছেন। এরপর তিনি সেতু সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে ছবি তোলেন।