মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ভিপি নুর কথন

ওয়াসিম ফারুক
মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি অহংকার ও গর্বের জায়গা। এই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রে স্বাধীনতা কেউ ই আমাদের আপ্যায়ন করে মুখে তুলে দেয় নি। আমাদের অগ্রজদের আত্মত্যাগের ফসল-ই আমাদের স্বাধীনতা আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যারা যে ভাবেই আত্মত্যাগ করেছেন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে দেশকে স্বাধীন করে আমাদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মদিয়ে গেছেন তারাই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী আমাদের অহংকার তারাই আমাদের মাথার মুকুট। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্যি আমাদের অহংকারের ঐ জায়গাটিকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্যে একেক সংগঠন বা দল ও গোষ্ঠী একেক ভাবে নিজেদের ইচ্ছে মত অপব্যবহার করে আসছে।

স্বাধীনতার দীর্ঘ চার যুগ পরে ও আমাদের একটি সঠিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকার জন্য আন্দোলন করতে হয় একটি স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকার জন্য আন্দোলন করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন কেন আমাদের স্বাধীনতার দীর্ঘ চার যুগ পরে ও এই আন্দোলন? উত্তরটা আগেই দিয়ে রেখেছি রাজনৈতিক স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার-ই একটি ফর্মুলা।

সাম্প্রতি অর্থাৎ বিজয়ের মাসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যা করা হয়েছে তা সত্যি আমাদের শুধু ব্যথিত-ই করে না, আতংকিতও করেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের দেশের ভিতরে থাকা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে যার মধ্যে দশ হাজারের বেশি মানুষের নাম আছে। কিন্তু ঐ তালিকা রীতিমত আমাদের মুক্তিযোদ্ধা তথা জাতির মান সম্মান ইজ্জতের উপর আঘাত বলেই আমি মনে করি। ঐ তালিকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নাম উঠে এসেছে। যদিও এই তালিকা নিয়ে মক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ঠেলা ঠেলি চলছে। চলছে ষাট কোটি টাকা ও পেনড্রাইভ বিতর্ক।

সবচেয়ে বড় কথা এমন একটি তালিকা কোন বিচার বিবেচনা না করে শুধু মাত্র বাহবা নেয়ার জন্য দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে আমরা অনেক চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধীর নাম দেখেছি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। অনেক সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে চাকরিতে যোগদান বা চাকরিতে পদোন্নতি নিয়েছেন। আবার একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে ও একজন সরকারী কর্মচারীর বাসার ব্যক্তিগত কাজ না করার জন্য চাকরি হারাতে হয়েছে। ছেলে চাকরির জন্য অনুরোধ করতে গিয়ে আবার ঐ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাকে অপমানিত হয়ে ফিরে এসে বলতে হয়েছে তাকে যেন মরার পরে কোন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেয়া হয়। আর ঐ যন্ত্রণা নিয়েই তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।

একটি প্রবাদ আছে ‘বেঁচে থাকতে দেয় না দুধ ভাত, মরলে দেবে গাই বাছুর’ জীবিত অবস্থায় যদি ঠিকভাবে দুই মুঠো ভাত-ই পেটে না যায়, মরার পরের আর ঐ সবের কী দরকার। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কী পাবেন কী পাবেন না সেই চিন্তায় তারা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন নি। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে প্রতিটি মানুষ স্বাধীনভাবে স্বাধীনচেতনায় বাঁচবে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কেরা ১৯৭১-এ স্বার্থক হলেও পরবর্তীতে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বার্থক হয়েছিল চারটি মুলনীতি বা চেতনার উপর ভিত্তিকরে। যা হলো- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। স্বাধীনতার চার যুগ পার হলে ও সেই চেতনার কোনটাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটে নি।

শুধুমাত্র ক্ষমতাসীনদেন সমালোচনা করা ও ভিন্নমত পোষণ করায় ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের মত দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদের একজন নির্বাচিত ভিপিকে তার কার্যালয়ে ঢুকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুকুরের মত পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। অথচ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাই আমাদের ভাষা আন্দোলন গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতাযুদ্ধ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের স্বার্থে নানান আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরের উপর নানান সময়ে হামলার কথা টানতেই চলে আসে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রসংগ। নুরের উপর হামলাকারীরাও সেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে আসছে। নুরের উপর হামলাকারীরা ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ নামের তথাকথিত একটি সংগঠনের সদস্য। সারাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটাসংস্কারের আন্দোলন যখন তুংগে তখন ই ২০১৮ সালে ৪ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ হয় তথাকিত এই সংগঠনটির যার আহ্বায়ক করা হয় ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামালউদ্দিকে আর সদস্যসচিব করা হয় সাবেক নৌ- পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খাঁনের ছেলে আসিবুর রহমান খাঁনকে।

যদিও অধ্যাপক আ ক ম জামালউদ্দিনের পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না তারপরেও নাকি তার সম্মান স্বরুপ তাকে এই সংগঠনের এমন একটি পদে অলংকিত করা হয়। জন্মের কিছুদিন না যেতেই তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধমঞ্চ’ নামের এই সংগঠনে ভাঙ্গন ধরে যার একটি অংশ পক্ষ নেয় দুর্নীতির দায়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক থেকে পদ হারানো ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীর।

মূলত রাব্বানীর মদদেই তথাকথিত ঐ সংগঠনের একাংশের নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানান অপকর্ম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২২ ডিসেম্বর ২০১৯ ডাকসুর ভিপি নুরসহ আরো ২৪ জন ছাত্রকে হত্যার উদ্দেশ্যে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার মূলেও তার ইন্ধন ছিল বলে জানা গেছে। এর পর ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী ভিপির নুরের আহত হওয়া নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা কোন সাধারণ মানুষের মুখে মানায় না। নুরকে পিটিয়ে যখম করার পর গোলাম রাব্বানী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন ‘ভিপি নুরুল হক নুরকে আর ডাকসুতে ঢুকতে দেয়া হবে না’

একই সঙ্গে ‘নুর আহত হয়েছে নাকি নিহত হয়েছে, এটা ডাজ নট ম্যাটার’। স্বাভাবিক ভাবেই আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রশ্ন রাখতে পারি নুর কে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেয়া বা না দেয়ার অধিকার রাব্বানীকে কে দিয়েছে? কারণ নুর ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের ভোটেই নির্বাচিত একজন ভিপি।

আমার প্রশ্ন গোলাম রাব্বানীকে যেই অভিযোগের ভিত্তিতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বাদদেয়া হয়েছে তার পর ও কি গোলাম রাব্বানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদের জিএস পদের থাকার কোন নৈতিক অধিকার আছে?

এমন কি মুক্ত বাতাসে ও কি ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আছে? এত বড় দুর্নীতির অভিযোগ আসার পর ও রাব্বান্নীদের জন্য আইনের চোখ বন্ধ! ভিপি নুরের উপর হামলার মূল কারণই হলো ক্ষমতাসীনদের মতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। নুরের উপর হামলা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর হামলা। কারণ নুর নিজের মত প্রকাশের চেষ্টা করেছে মাত্র। আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি ছিল গণতন্ত্র অর্থাৎ স্বাধীন মত প্রকাশ।

আগেই বলেছি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অনেকেই রাজনৈতিক ও ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করে ব্যক্তি দল বা গোষ্ঠী কেন্দ্রিক করে ফেলেছে। ভুলে গেলে চলবেনা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোন দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয় এটা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের আনন্দ উৎসাহ প্রেরণার মূল জায়গা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র দেশের মানুষের সম্পত্তি। তাই কারো ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙ্গানো মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এটা বাংলাদেশের মানুষ কখনোই মেনে নিতে পারবে না।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে হাজারো ভুয়া সংগঠন ফুটপাত, রাস্তা থেকে শুরু করে জমি মার্কেট দখল করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে । রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধু কন্যা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের আপমান অবহেলা ও অপব্যবহার তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

ডাকসুর ভিপি নুরসহ অন্যান্য ছাত্রদের উপর ডাকসু ভবনে হামলাকারীদের তিনজনকে এরইমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই, সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে বা অপব্যবহার করে কেউ যেন দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে না পারে সে দিকে সংশ্লিষ্টদের আরও কঠোর হওয়ার আহবান জানাই।

ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট