স্বাগত ২০২০

বাংলাবাজার ডেস্ক
ঘরের দেয়ালে টাঙানো, অফিসের ডেস্কে রাখা ইংরেজি বর্ষপঞ্জিটি পুরোনো হয়ে গেল। অথচ বছরের শুরুতে কী যত্নেই-না সেঁটে দেয়া হয়েছিল দেয়ালে, রাখা হয়েছিল টেবিলে। সরিয়ে নেয়ার আগে একবার ভাবা হলো সে কথা! কী মনোরম দৃশ্য আঁকা, শিল্পীর তুলিতে! ওকেও জায়গা ছেড়ে দিতে হলো। নতুন এসে গেছে। নতুনকে জায়গা দিতে হবে। পেছনে তাকানোর সময় কি আর আছে? বিদায় ২০১৯। স্বাগত ২০২০।

এদিকে ২০২০-২১ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন করবে। মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু হবে ১০ জানুয়ারি।

জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন সংক্রান্ত প্রস্তুতিমূলক সভায় জানানো হয়, বছরব্যাপী অনুষ্ঠেয় ‘মুজিব বর্ষ’র জাতীয় অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন হবে আগামী ১৭ মার্চ রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে।

অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান নতুন বছর ২০২০ সাল বরণে প্রস্তুত সারা বিশ্ব। কী হয়নি, কী হতে পারত, এই সমীকরণ তো থাকবেই। তার মাঝেই এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা লুকিয়ে।

২০১৯ সালটা নানা কারণে আলোচিত বছর। রাজনীতিই ছিল কেন্দ্রে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদ ক্ষমতায়। বছরের শুরুতে ছিল চলতি মেয়াদের নতুন মন্ত্রিসভার যাত্রা।

চমক আসছে, শোনা যাচ্ছিল আগে থেকেই। এসেছেও। ভালোমন্দ সে বিচার পরে। তবে এবারের সরকারে নতুন অনেক মুখ উঠে এসেছেন।

পুরোনোদের মধ্যে আছেন হাতে গোনা কয়েকজন। নতুনরা কেমন করছেন, সেই পর্যালোচনা নিত্য হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু রদবদলও হয়েছে। নতুন বছরে আরো কিছু পরিবর্তনের আভাস আছে।

রাজনীতিতে শুদ্ধির বছরও ছিল ২০১৯। আগে থেকে ভাবা যায়নি, এমন সব ঘটনা ঘটে গেছে কয়েক দিনের ব্যবধানে। দল ক্ষমতায় থাকতে সেই দলের ফুলেফেঁপে ওঠা নেতাদের এমন করে ধরা হবে, কেউ কি আগে থেকে ভাবতে পেরেছেন? ক্যাসিনো কী, যারা জানতেন না, তাদের কাছে বিস্ময় ছিল ঢাকার ক্যাসিনোতে প্রতি রাতের শতকোটি টাকার বাণিজ্যের খবর।

যুবলীগের ডাকাবুকো নেতাদের হাতে হাতকড়া, হাজার হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ এক হাতে, সেই হাতেও আইনের বেড়ি, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনীতিকদের তালিকা সম্পদের অনুসন্ধান, দেশত্যাগে বারণ, নজিরবিহীন সব ঘটনা ঘটেছে গত কয়েক মাসে।

এক মঞ্চেই হয়েছে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর জাতীয় সম্মেলন। পুরোনোদের হটিয়ে এসেছে নতুন নেতৃত্ব। খোলনলচে বললেও ভুল হবে না।

সবশেষে আওয়ামী লীগের একুশতম সম্মেলন শেষে পর্দা নেমেছে দল গোছানোর আয়োজনের। শীর্ষ দুই পদ ঠিক থাকলেও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে পরিবর্তন এসেছে। বাদ পড়েছেন কেউ কেউ। আরও নতুনের জায়গা হতে পারে অন্য পদগুলোতে, দলের নেতারা এমনটাই জানিয়েছেন।

রাজনীতির বাইরে, দেশব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়েছিল গুজব। বড় নির্মম সময় কেটেছে মানুষের। ‘পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে’ এমন গুজবে গণপিটুনিতে মরেছে মানুষ। সন্তানরা হারিয়েছে মাকে। মা হারিয়েছেন সন্তান। নেহাত একটা আজগুবি খবর কতটা ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে সমাজে, মানুষ দেখেছে। আন্দোলনে আন্দোলনে উত্তাল ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

উপাচার্যদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগে পদত্যাগের দাবিতে সরব ছিলেন শিক্ষার্থীরা। বাধ্য হয়ে পদ ছাড়তে হয়েছে গোপালপঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিনকে। শক্তপোক্ত দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে এখনো টিকে আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলাম।

লাগাতার আন্দোলনের মুখে দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসটি বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্র্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার পর ফেটে পড়েছিলেন ছাত্রসমাজ। আন্দোলনের মুখে হত্যায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিচার চলছে।

ক্যাম্পাসে ছাত্র- রাজনীতিতে এসেছে নিষেধাজ্ঞা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্র সংসদ-ডাকসু। ২৮ বছর পর নির্বাচিত প্রতিনিধি এসেছে ডাকসুতে। সচল হয়েছে ছাত্র সংসদ। কিন্তু কাজ হয়নি কিছুই। উল্টো এ নিয়ে চলমান অসন্তোষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভেতরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ডাকসুর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর একের পর এক হামলা হয়েছে। ভাঙচুর হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনায় বছরজুড়ে বারবার আলোচনায় ছিল ডাকসু।

বছরের শেষ সময়ে সবকিছু ছাপিয়েছে রাজাকারের তালিকা। বিস্ময়কর ঘটনা! রাজাকারের তালিকায় এসেছে বীরমুক্তিযোদ্ধাদের নাম। কঠোর সমালোচনার দায় মাথায় নিয়ে তালিকা স্থগিত করা হয়েছে। ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। ভুল স্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। দায়িত্বজ্ঞানহীনতার নজির হয়ে থাকলো ঘটনাটি।

আবার জাতীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক খ্যাতিমানকে হারিয়েছি আমরা। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ, রাজনীতিক ও সাংসদ মঈনউদ্দিন খান বাদল, সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী, সাংসদ ডা. মো. ইউনূস আলীসহ অনেকের বিদায় আমাদের শোকার্ত করেছে। তবে এর মধ্যেও প্রাপ্তির সংযোগ হয়েছে অনেক।

বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ অর্জন, রেকর্ড গড়েছে। দেশের অর্থনীতি যে এগিয়ে যাচ্ছে, এটি তার উদাহরণ। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি হয়েছে। একের পর এক বসছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ইস্পাত-কঠিন পথ। প্রমত্তায় ঢেউ তুলছে যোগাযোগের বড় বিপ্লব।

ফেলে আসা সময়ের অপ্রাপ্তি, হতাশা ভুলে এখন কেবল এগিয়ে যাওয়ার সময়। নতুনকে বরণ করার সময়। কেবল স্বপ্ন দেখা নয়, স্বপ্ন পূরণের সময়। কোটি কোটি প্রাণে সঞ্চারিত হোক নতুনের উদ্যম।