বায়ুদূষণে আমাদের করণীয়

আলম শাইন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের সর্বশেষ তথ্যমতে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী হচ্ছে ঢাকা। এয়ার ভিজ্যুয়াল প্রতি ঘণ্টায় বিশ্বের ৯১টি বড় শহরের বায়ুদূষণের তথ্য প্রদান করে।
ওই রিপোর্ট অনুযায়ী নভেম্বর মাসের ৮দিন কোন কোন সময় ঢাকা ছিল বায়ুদূষণের শীর্ষস্থানের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম।

অতীতের রেকর্ড অতিক্রম করে ২৫.১১.২০১৯ তারিখ (সকাল ৯টা থেকে ১০টা) এক ঘন্টার জরিপে বেরিয়ে এসেছে বিশ্বের বায়ু দূষিত শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান প্রথমস্থানে। ইতিপূর্বে পঞ্চমস্থানে ছিল ঢাকার অবস্থান। ওই সময় শহরের বায়ুদূষণের পরিমাণ ছিল ১৭১ পিএম।

অন্যদিকে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে ১৮২ পিএম, ভারতের কলকাতায় ১৮৭ পিএম, পাকিস্তানের লাহোরে ১৯২ পিএম ও ভারতের দিল্লিতে ২০৯ পিএম ছিল।

প্রচার মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবেশবিদেরা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা, মোটরযানের কালোধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, ধুলাবালি ও নির্মাণ কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়িকে দায়ী করেন।

সমীক্ষায় জানা যায়, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের প্রধান উৎস ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সাইউ অব সালফার। যা নির্গত হওয়ার ফলে রাজধানীর প্রায় ৫৮ শতাংশ বায়ুদূষণ ঘটছে।

এছাড়াও রোড ডাস্ট, সয়েল ডাস্ট ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস ও শিল্প-কারখানার দূষিত ধোঁয়ার মাধ্যমে ঘটছে ৬ শতাংশ। বিশেষ করে ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের প্রভাবে ঢাকা এবং আশপাশের বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইটভাটার প্রভাবে আশপাশে তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপাতও কমে গেছে।

এর অন্যতম কারণই হচ্ছে চিমনি দিয়ে নির্গত কালোধোঁয়া প্রবাহিত হওয়া। কালোধোঁয়া এবং অধিক কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাসের প্রভাবে আকাশে কোন ধরনের মেঘ পুঞ্জীভূত হতে পারেনা বরং আকাশের মেঘটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বৃষ্টিপাতে বিঘ্ন ঘটায়।

ইটভাটার সারি শুধু ঢাকা জেলার সাভার, কেরানীগঞ্জ নয়, এ সারি দেখা যায়, গাজীপুর নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জসহ দেশের অন্য জেলাগুলোতেও। তবে রাজধানীর আশপাশের জেলা-উপজেলাগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি নজরে পড়ে।

২০১৮ সালের জরিপে জানা গেছে, সমগ্র দেশে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ৯০২টি। তার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৪৮৭টি। ভাটাগুলোতে বছরে কয়লা পোড়ানো হয় এক মিলিয়ন টনেরও বেশি। আর এ থেকে প্রতিবছর কার্বন মনোঅক্সাইড নির্গত হয় প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ টন। এ ছাড়াও ইটভাটা থেকে নির্গত হয় বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ধোঁয়া। যা থেকে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া ঘটে ব্যাপকভাবে।

ইটভাটার মালিকরা যদি একটু সতর্ক বা সচেতন হতেন, তাহলে এ ক্ষতিকর দিক থেকে দেশ, জাতি কিংবা পরিবেশকে বাঁচাতে পারেন অবলীলায়, সাশ্রয় করতে পারেন নিজেদের অর্থনৈতিক দিকটাও।
এর থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে ইটভাটাগুলোকে ইট কারখানায় রূপান্তরিত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ পরিচালিত যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার রাস্তার ধুলায় উচ্চমাত্রার ক্যাডমিয়াম, সিসা, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি রয়েছে।

ফলে ঢাকায় বসবাসরত ২ কোটি মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত ৬ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন। তার মধ্যে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন রোগে ভোগছেন।

অনেকে আবার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হেরেও যাচ্ছেন, তার পরেও রোগের কারণ বুঝতে সক্ষম হননি সর্বসাধারণ। তারা জানেন না, বায়ুদূষণের কারণে মানুষ শ্বাসজনিত সমস্যা, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

উল্লেখ্য, বড়দের তুলনায় শিশুরা ৩০ শতাংশ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণায় জানা গেছে, মাটির কাছাকাছি বাতাসের সর্বনিম্ন স্তরে থাকে বিষাক্ত ধোঁয়াশা।
শিশুরা উচ্চতায় খাটো বিধায় নিশ্বাসের সঙ্গে ওই ধোঁয়াশা দ্রুত ফুসফুসে প্রবেশ করায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের গবেষণায় জানা যায়, ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে বায়ুদূষণ। এছাড়াও প্রতিনিয়ত লিভারের ক্যন্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে বায়ুদূষণের কারণে। ২০১০ সালের এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানা গেছে, বায়ুদূষণের ফলে ফুসফুস ক্যান্সারে প্রায় ২লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

শুধু ঢাকা নয় বিশ্বের অধিকাংশ বড় শহরগুলো বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী বছরে ৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুও ঘটছে। এছাড়াও বায়দূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু ১ বছর কিংবা তারও বেশি কমে যাচ্ছে।

উপরোক্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হচ্ছে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে এই দূষণ থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নিতে হবে দ্রুত। ঢাকার আশপাশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দিতে হবে তাৎক্ষণিকভাবে। শহরের রাস্তাগুলোকে দিনে অন্তত ১/২ বার পানি ছিটিয়ে ধুলিদূষণ কমাতে হবে।

সম্ভব হলে সপ্তাহে একদিন রাস্তার পাশের গাছপালাকে পানি দিয়ে ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি দায়ী বিষয়গুলোকে শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে হয়তো শতভাগ সমাধান না হলেও খানিকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোর বায়ুদূষণ।

বলে রাখা ভালো, ধুলাবালি গাছগাছালিতে জমার কারণে যেন আবার শহরের বৃক্ষরোপন অভিযানে ভাটা না পড়ে সেটিও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

সুতরাং গাছগাছালি রক্ষা করে শহরের পরিচ্ছন্নতায় নজর দিতে হবে। তাহলে বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পাবে আমাদের প্রিয় শহরগুলো।

লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।