তিতাসে ৭৭০ কোটি টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন!

বাংলাবাজার ডেস্ক
গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস এক বছরে প্রায় ৭৭০ কোটি টাকা সিস্টেম লসের যে হিসাব দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক বছরে এক লাফে সিস্টেম লস প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে অডিট প্রতিষ্ঠানের দাবি, ‘গ্রহণযোগ্য’ সিস্টেম লস ২৩৮ কোটি টাকা হওয়া উচিৎ ছিল।

এদিকে ভোক্তা অধিকার রক্ষার সংগঠন ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলছেন, সিস্টেম লস বা পদ্ধতিগত ক্ষতি নিয়ে তিতাসের হিসাবের সঙ্গে কোনোভাবেই একমত হতে পারছেন না তারা।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিস্টেম লস বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিলের পরিবর্তে প্রকৃত ব্যবহারের হিসাব আওতায় আনা, হাইয়ার হিটিং ভ্যালু, লাইন ফুটো হয়ে গ্যাস বের হয়ে যাওয়া এবং ট্রান্সমিশন লাইন থেকে বিতরণ লাইনে আসার সময় সঠিকভাবে হিসাব না করার বিষয়গুলোকে দেখাচ্ছেন।

দুই বছর আগে আবাসিকে নতুন সংযোগ দেয়া বন্ধের সময়ও গ্রাহক সংখ্যা এক লাফে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্য দিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডাটাবেইজে হালনাগাদের কারণে এই সংখ্যা বেড়ে যায়। তখনও তিতাসের সেই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল।

নানা অভিযোগ পেয়ে তদন্ত চালিয়ে তিতাসে দুর্নীতি ও অনিয়মের ২২টি উৎস চিহ্নিত করার কথা সম্প্রতি জানায় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। গত ২২ ডিসেম্বর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় ২০১৮-১৯ বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস হয়েছে ২০১৮-১৯ বছরে। এবছর সিস্টেম লসে পড়েছে ১০০৩ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস, যা তিতাসের কেনা মোট গ্যাসের ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। এই গ্যাসের মূল্য ৭৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

অথচ এর আগের অর্থবছর (২০১৭-১৮) সিস্টেম লস ছিল মোট কেনা গ্যাসের ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ২০১ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ঘনমিটার, ২০১৬-১৭ বছরে ছিল ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বা ২৩২ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ঘনমিটার, ২০১৫-১৬ বছরে ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বা ৪৭৯ দশমিক ২২ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং ২০১৪-১৫ বছরে সিস্টেম লস ছিল ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ বা ৬২৫ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ঘনমিটার।

২০১৪-২০১৫ অর্থবছর থেকে পরপর চার বছর ক্রমাগত কমতে থাকা সিস্টেম লস হঠাৎ করেই গত অর্থ বছরে এক লাফে পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে।

সিস্টেম লস বেড়ে যাওয়ার ব্যাখ্যায় তিতাসের আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর বিইআরসির আদেশ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর হতে বিলড কনজাম্পশনের পরিবর্তে অ্যাকচুয়াল কনজাম্পশন বিবেচনা করা হয় এবং হাইয়ার হিটিং ভ্যালুর সমতুল্য গ্যাসের পরিমাণ গ্যাস বিক্রয়ের হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গ্যাস বিক্রয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত গ্যাসের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় সিস্টেম লস (অংশ বিশেষ) এর বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে।”

তবে এ দাবি নাকচ করে দিয়ে শামসুল আলম বলেন, “তিতাসের দাবি কোনোভাবেই সঠিক নয়। কারণ গ্যাসের প্রকৃত ভোগের (অ্যাকচুয়াল কনজাম্পশন) হিসাব বের করার সক্ষমতা তিতাসের নেই।

তিতাস দাবি করছে, তাদের মোট গ্যাসের ১৬ ভাগ ব্যবহৃত হয় আবাসিকে। এ দাবি সঠিক নয়। আবাসিকে এর থেকে অনেক কম গ্যাস ব্যবহৃত হয়। তার মানে, গ্যাসের প্রকৃত হিসাবের কারণে কোম্পানি রাজস্ব হারাচ্ছে, কোম্পানির এমন দাবি সঠিক নয়।

তিতাসের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান অ্যাকচুয়ারি জেড হালিম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস আর্থিক প্রতিবেদনের বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর মন্তব্য করেছে।

বিইআরসির আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করেই সিস্টেম লসের বিষয়ে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটি বলছে, “আদেশ অনুযায়ী বিতরণযোগ্য গ্যাসের জন্য তিতাস গ্যাসের নিজস্ব লাইন ও জিটিসিএলের লাইন দ্বারা সঞ্চালিত গ্যাসের উপর গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিগত ক্ষতি যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ২ দমমিক ২৫ শতাংশ। সে হিসেবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিগত ক্ষতি ২৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা হওয়া উচিৎ ছিল।

Courtesy: BDNews24