দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলবে

বাংলাবাজার পত্রিকা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গত বছর সরকার গঠনের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শোধরানোর আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করি। মানুষের কল্যাণের জন্য আমি যে কোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করব না।

তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। আবারও সবাইকে সতর্ক করে দিতে চাই দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক, যত শক্তিশালীই হোক না কেন— তাদের ছাড় দেয়া হবে না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি আহ্বান থাকবে, যে-ই অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। সাধারণ মানুষের হক যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মানুষ সচেতন হলে, দুর্নীতি আপনা-আপনি কমে যাবে। মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওতে ভাষণটি একযোগে সম্প্রচার করা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের এক বছর পূর্ণ হলো। বিগত এক বছর চেষ্টা করেছি জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে। সবক্ষেত্রে শতভাগ সফল হয়েছি তা দাবি করা যাবে না। কিন্তু এটুকু জোর দিয়ে বলা যায় চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। অতীতের ভুলভ্রান্তি এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। সবার সহযোগিতায় সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদের নেতা শেখ হাসিনা বলেন, সাধারণ মানুষকে ঘিরেই আমার সব কার্যক্রম। আপনাদের (জনগণ) ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রাখি। বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ পরিশ্রমী এবং উদ্ভাবন-ক্ষমতাসম্পন্ন। যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম।

অল্পতেই সন্তুষ্ট এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। জাতির পিতা আজীবন সংগ্রাম করেছেন এসব মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তার কন্যা হিসেবে আমার জীবনেরও একমাত্র লক্ষ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমার ওপর ভরসা রাখুন।

আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকতে চাই। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে কেউ যাতে তরুণদের বিপথে পরিচালিত করতে না পারে, সে জন্য মসজিদের ইমামসহ ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি থাকবে না। সকল ধর্ম-বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। সবাই নিজ নিজ ধর্ম যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে সক্ষম হচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রনীতির সারকথা; সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধান করা হচ্ছে। এটি আমাদের দুর্বলতা নয়, কৌশল।

এ কারণেই মিয়ানমারের দিক থেকে নানা উসকানি সত্ত্বেও সে ফাঁদে পা দিইনি। আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ থেকে সরে যাইনি। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মামলা হয়েছে। আশা করছি, এই আদালত থেকে একটি স্থায়ী সমাধান সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে।

নবমবারের মতো আওয়ামী লীগ সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়া শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে জনগণের রায়ই হচ্ছে ক্ষমতার পালাবদলের একমাত্র উপায়। যে কোনো শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ স্বাগত জানায়। তবে, অযৌক্তিক দাবিতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে বরদাশত করা হবে না। বাংলাদেশের মাটিতে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি আর হতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি-বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদকে প্রাণবন্ত করেছে। জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, গত বছর দু-একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।

এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের প্রশ্রয় দেয়া হইনি। জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনিক এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কোনো কোনো মহল গুজব ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। সেসব অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছি।

এডিস-মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বর গত বছর সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও বেশকিছু মূল্যবান প্রাণহানি ঘটেছে এই রোগে। আমি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।

এডিস-মশার বিস্তার রোধে আগে থেকেই সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, ২০২০ সাল জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বছর।

এ বছর উদ্যাপিত হতে যাচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। আগামী ১৭ মার্চ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভসূচনা হবে।

ইতোমধ্যেই ২০২০-২১ সালকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের অনুষ্ঠানমালা যুগপৎভাবে চলতে থাকবে। এই উদ্যাপন শুধু আনুষ্ঠানিকতা-সর্বস্ব নয়, এই উদ্যাপনের লক্ষ্য জাতির জীবনে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চারিত করা।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসেব মতে, ২০১০ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ১০ দশমিক ৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান দিয়েছে।

বাজেটের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশের প্রমাণ মেলে তার বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায়। ২০০৫-৬ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের শেষ বছরে বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের আকার সাড়ে আট গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায়।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়। বাজেটের ৯০ ভাগই এখন বাস্তবায়ন হয় নিজস্ব অর্থায়নে। গত অর্থবছরে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ শতাংশেরও নিচে।

বছরের শেষ দিকে আমদানিনির্ভর পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়া ছাড়া অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বছরজুড়ে স্বাভাবিক ছিল।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিষয়টি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানেও উঠে আসছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটখাটো অভিঘাত এই অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী পিপিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থান ৩০তম। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ২৩তম স্থান দখল করবে।

এইচবিএসসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, ২০২০-এ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এগিয়ে থাকবে।

বক্তৃতার শেষপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালি জাতি বীরের জাতি। এমন জাতি পৃথিবীতে কোনো দিন পিছিয়ে থাকতে পারে না। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। আসুন, দলমত-নির্বিশেষে সবাই মিলে তার স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নতুন করে শপথ নেই।