পাসপোর্ট হয়রানি আর কতদিন!

আলম শাইন
মধ্যযুগীয় ইসলামিক খেলাফতের সময়, শুল্ক প্রদানের রসিদ ছিল এক ধরনের পাসপোর্ট। যেই মুসলিম ব্যক্তি যাকাত ও জিজিয়া কর প্রদান করত, শুধু সেই মানুষগুলো খেলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করার সুযোগ পেত। এইভাবে শুল্ক প্রদানের রসিদটাই ভ্রমণকারীদের জন্য পাসপোর্ট হিসাবে পরিণত হয়। যা এখন বিশ্ব ভ্রমণের অনুমতির দলিল দস্তাবেজ বা পাসপোর্ট নামে পরিচিত। পাসপোর্ট হচ্ছে এক ধরনের ভ্রমণ নথি। এটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাহকের জাতীয়তা ও পরিচয় বহন করে। পাসপোর্ট যে কোন দেশের সরকারকৃত জারি করা হয়ে থাকে। যুগ যুগ ধরেই পাসপোর্টের প্রচলন বিশ্বব্যাপী।

সূত্রেমতে জানা গেছে, ৪৫০ খ্রিস্টাব্দে হিব্রু বাইবেলে পাসপোর্টের অনুরূপ কাগজের নথির উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও সেই তথ্যটি পাসপোর্টের প্রচলনের সন-তারিখ প্রমাণ করেনি। কিন্তু ইঙ্গিতে বুঝা যাচ্ছে এ ধরনের কিছু একটা ছিল তখনও। বাংলাদেশের পাসপোর্ট সাধারণত তিন ধরনের মলাটে বন্দী । যথাক্রমে: লাল, নীল ও সবুজ মলাটের। লাল মলাট হচ্ছে, কূটনৈতিক পাসপোর্ট।

নীল মলাট হচ্ছে, সরকারি কর্মজীবিদের পাসপোর্ট। অপরদিকে সবুজ মলাটের পাসপোর্ট হচ্ছে সর্ব সাধারণনের জন্য। যা সংগ্রহ করতেই পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে দেশের নিরিহ সাধারণের। শরীরের ঘাম ঝরে সেই পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে। যা কোন মতেই কাম্য নয়। কারণ সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্যই পাসপোর্ট প্রাপ্তি হচ্ছে নাগরিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি অধিকার।

যেই অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের শিকার হচ্ছেন আমাদের দেশের হাজারো-লাখ মানুষ। পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই এ ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। বিষয়টাকে উন্নীত করার প্রয়াসে সরকার সচেষ্ট হলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অপকৌশলের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মানুষ হয়রানির কবলে পড়ছেন নিয়মিত।

সূত্রমতে জানা যায়, এ পর্যন্ত দেশের ২ কোটির অধিক মানুষকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও বিদেশে অবস্থানরত ৬ লাখ বাংলাদেশিকে পাসপোর্ট দেয়া হয়েছে। তুলনামূলক বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে।

সেই তূলনায় দেশে অবস্থানরত মানুষ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন খানিকটা বেশি। বিবিধ কারণও রয়েছে এর। তন্মধ্যে প্রথম কারণটি হচ্ছে আর্থিক লেনদেন। প্রবাসীদের তুলনায় দেশের মানুষ দালালের হাতে ঝটপট অর্থ-কড়ি সঁপে দিতে পারেন না। ফলে যথাসময়ে পাসপোর্টও হস্তগত হয় না তাদের।

এখানে বলতে হয় পাসপোর্ট আর দালাল দু’টি একই সূত্রে গাঁথা; সমার্থক শব্দের মতোই যেন। ভূক্তভোগী মাত্র জানেন ব্যাপারটা কত কঠিনতর। কত কষ্টেসৃষ্টে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হচ্ছে একেকজনকে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রধান বাধা হচ্ছে পুলিশ ভেরিফিকেশন।

ভেরিফিকেশেনের কারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে দেখেছি আমরা। আর এটি হচ্ছে প্রকৃত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেই। পাসপোর্ট গ্রহন দু:সাধ্য না হলেও খুব সহজেও মিলছে না কিন্তু এটি। পদে পদে বাধাবিগ্ন অতিক্রম করে পাসপোর্ট গ্রহন করতে হচ্ছে দেশের প্রকৃত নাগরিকদেরকে।

দালাল না ধরলে যথাসময়ে পাসপোর্ট হস্তগত হয় না। কর্মরত অফিসার ফিরে তাকান না। কথা বলেন অনত্র্য তাকিয়ে। নানান অজুহাত দেখিয়ে কষে প্যাঁচ মারেন। এই কাগজ সেকাগজ জমা দেওয়ার ফিরিস্তি দেন। কোনমতে সেসব কাগজপত্র জমা দিতে পারলেও ডেলিভারির তারিখ পেছাতে থাকে ক্রমান্বয়ে।

ফলে যথাসময়ে পাসপোর্ট না পেয়ে অনেকেই বিপাকে পড়ে যান। ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে এ ধরনের ঘটনার। সেসব ফিরিস্তি টানা সম্ভব নয় এখানে। আগেই বলেছি, পাসপোর্ট প্রাপ্তি হচ্ছে নাগরিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবায়নে সরকার ইচ্ছে করলে জোরাল পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারেন বোধকরি।

প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয় পত্রের মতো পাসপোর্ট ঘরে ঘরে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। নিতে পারেন পাসপোর্ট ফি-ও। তবে সেটি যেন হয় সহনীয় মাত্রার ফি। (প্রয়োজনে ভতুর্কি দিয়ে হলেও পাসপোর্ট ফি কমিয়ে নেওয়া উচিত)।

উল্লেখ্য বর্তমানে বিভিন্ন রকম খরচাদি মিলিয়ে এক একটি পাসপোর্ট গ্রহন করতে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকার মতো পড়ে যায়। অবশ্য এটি নর্মাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে।

আর যদি একটু আর্জেন্ট প্রয়োজন পড়ে তাহলে তো কথাই নেই। সংস্থার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন জনকে খুশি করিয়ে তবে পাসপোর্ট গ্রহন করতে হয়। এতদসব ঝক্কি ঝামেলা পোহানোর কারণে সর্ব সাধারণ বিরক্ত হন যেমনি, তেমনি ভড়কেও যান। ফলে দেশের বাহিরে যাওয়ার পরিকল্পনা অঙ্কুরে বিনষ্ঠ হয়ে যায় অনেকেরই।

আর চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনে পাসপোর্ট গ্রহন করেন যারা তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা কেমন হতে পারে তা অনুমেয়। অপরদিকে ভিনদেশিদের এত ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় না। ভূয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করে কিংবা কেউ কেউ বৈবাহিকসূত্রে আবদ্ধ হয়ে নাগরিকত্ব সংগ্রহ করে খুব সহজে পাসপোর্ট হাতিয়ে নিচ্ছেন।

সেক্ষেত্রে তিনি বাড়তি কিছু খরচাদিও করে থাকেন। পরবর্তীতে সেই লোভটি থেকে যায় পাসপোর্ট প্রদানকারীদের। যা দেশের সর্বসাধারণের ওপর গিয়ে বর্তায় এবং বাধ্য করানো হয় বাড়তি খরচাদি করিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে। এ বিষয়ে আমাদের আরো সজাগ হতে হবে। পাসপোর্ট গ্রহনের সহজিকরণের পদক্ষেপ নিতে হবে যেমনি, তেমনি ভিনদেশিরা বাংলাদেশের পাসপোর্ট যেন কোন মতেই গ্রহন করতে না পারেন সেই বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।

এ অজুহাতে যেন আবার দেশের প্রকৃত নাগরিক পাসপোর্ট গ্রহনে হয়রানির শিকার না হন সেটিকে সবার আগে বিচেনায়ও রাখতে হবে। ভিসা সংগ্রহের ব্যাপারেও নজর দিতে হবে। মধ্যস্বত্তভোগীরা যাতে অধিক মুনাফার বিনিময়ে ভিসা হস্তান্তর না করতে পারেন সেবিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আমাদের প্রবাসীদের ছোটখাটো ভুলভ্রান্তিগুলোকে অনেক বড় করে দেখছেন সম্প্রতি। এর প্রধান কারণই হচ্ছে ভিনদেশিদের উপদ্রব। তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতিয়ে ওমরা ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে থেকে যাচ্ছেন।

চুরি-চামারিসহ নানা অপকর্ম করে ধরা পড়লে বাংলদেশী বলে পরিচয় দিচ্ছেন। কাগজে কলমেও প্রমাণ মিলছে বাংলাদেশি, ফলে এখানে আর সাফাই গাওয়ার মতো সুযোগ থাকছে না।

এসব বেশি করছে রোহিঙ্গারা। তারা পাসপোর্ট সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, মধ্যপ্রাচ্যে গমন করে অধিক কাজ প্রাপ্তির লোভে নিজেদের শ্রমের মূল্যও কমিয়ে নিচ্ছেন। যাতে করে বাংলাদেশিরাও বাধ্য হচ্ছেন তাদের শ্রমের মূল্য আরো কমিয়ে দিতে। এতে করে বিপাকে পড়ে গেছেন বাংলাদেশি শ্রমিকেরা।

অধিক পরিশ্রম করেও পর্যাপ্ত অর্থকড়ি নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারছেন না। অন্যদিকে আগের মতো বুকটান করে বিদেশের মাটিতে চলাফেরাও করতে পারছেন না। বাংলাদেশি পরিচয় জানলে সন্দেহের চোখে দেখছেন, অথচ আদতেই বাংলাদেশিরা অমন ধাঁচের নয়, সেটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন রোহিঙ্গাদের কারণেই।

রোহিঙ্গারা সত্যমিথ্যা বলে বিদেশিদের কানভারি করছেন, সে রকম তথ্যও আমরা খবরের কাগজ মরাফত ইতিপূর্বে জানতে পেরেছি। অথচ রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরেই বাংলাদেশে লালিত-পালিত হচ্ছেন; তদুপরি দেশের পাসপোর্টও হাতিয়ে নিচ্ছেন, বিদেশ গিয়ে বদনামও দিচ্ছেন।

বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের খুব দ্রুত। বিশেষ করে মাথায় রাখতে হবে পাসপোর্টের সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহের যোগসূত্রটা। রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা নজর দিতে হবে সর্বাজ্ঞে। বছর দুই আগে দেশে রেমিট্যান্স ভাটা দেখা দিয়েছিল। যদিও সেটি এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রণোদনা দেয়ার কারণে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি বছর (২০১৯-২০) রেমিট্যান্স ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। পেছনের দীর্ঘদিন সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখীর কারণ অনুসন্ধান করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তারা প্রথমত, দায়ী করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দীর্ঘ অস্থিরতার কারণে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুতিসহ আয় কমে যাওয়া।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য কম থাকায় প্রবাসীরা অর্থ পাঠাতে গড়িমসি করছেন। তৃতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের ফলে হুন্ডিওয়ালারা অবৈধভাবে প্রবাসীদের নিকটজনের কাছে টাকা দ্রুত পৌঁছে দেয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়াও পাসপোর্ট গ্রহনের হয়রানির কারণেও দ্রুত শ্রমিকরা ভিসা সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিগ্ন হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পাসপোর্ট প্রাপ্তির জটিলতা দীর্ঘদিনের হলেও বিষয়টি আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। যদি আমরা মনে রাখতে পারি যে, একটি পাসপোর্ট বিতরণ মানে একজন বাংলাদেশির বহির্গমনের সুযোগ লাভ করা এবং পরে তার মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পৌঁছানো -বিষয়টি এভাবে ভাবলে বোধকরি অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে অতি সহজে।

লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

আরও পড়ুন…
বায়ুদূষণে আমাদের করণীয়