আগামী বছরের (২০২৭ সাল) ২ আগস্ট সৌদি আরবের আকাশে ঘটতে যাচ্ছে শতাব্দীর অন্যতম বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা। সেদিন কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো মিলিয়ে যাবে, সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে চাঁদ, দিনের আকাশে দেখা যাবে তারা, তাপমাত্রা কমে আসবে এবং সূর্যের রহস্যময় বহিঃস্তর করোনা খালি চোখে দেখা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম পূর্ণ সূর্যগ্রহণগুলোর একটি এবং ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পর সৌদি আরবের ওপর দিয়ে অতিক্রম করা প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
সৌদি স্পেস এজেন্সি এটিকে ‘এই শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কেন সৌদি আরবেই দেখা যাবে এই বিরল সূর্যগ্রহণ?
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে তখনই, যখন সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে এবং মাঝখানে থাকে চাঁদ।
প্রকৃতির এক বিস্ময়কর কাকতালীয় কারণে চাঁদ সূর্যের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ ছোট, আবার পৃথিবী থেকে ৪০০ গুণ বেশি কাছে। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। যখন তারা নিখুঁতভাবে এক সরলরেখায় আসে, তখন চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে এবং পৃথিবীর ওপর একটি সরু ছায়াপথ সৃষ্টি করে।
এই ছায়াপথকে বলা হয় ‘পাথ অব টোটালিটি’ । এই পথের ভেতরে থাকা মানুষই কেবল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে পান, অন্য এলাকায় দেখা যায় আংশিক সূর্যগ্রহণ।
২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণের ছায়াপথ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু হয়ে উত্তর আফ্রিকা, মিসর, লোহিত সাগর অতিক্রম করে সৌদি আরবের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকে চলে যাবে। সৌদি আরব এই ছায়াপথের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় দেশটি বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্যবেক্ষণস্থলে পরিণত হবে।
কেন এত দীর্ঘ হবে এই সূর্যগ্রহণ?
এই সূর্যগ্রহণের দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে মহাজাগতিক অবস্থানের বিশেষ সমন্বয়।
আগস্টের শুরুতে পৃথিবী সূর্য থেকে বছরের সবচেয়ে দূরের অবস্থানের কাছাকাছি থাকে। ফলে সূর্যকে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা ছোট দেখায়। একই সময়ে চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানের কাছাকাছি থাকবে, ফলে সেটিকে তুলনামূলক বড় দেখাবে।
বড় চাঁদ যখন অপেক্ষাকৃত ছোট দেখানো সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়, তখন গ্রহণের স্থায়িত্ব বেড়ে যায়।
বিশ্বের সর্বোচ্চ সময়, ছয় মিনিটের কিছু বেশি, দেখা যাবে প্রতিবেশী মিসরে। তবে সৌদি আরবেও এই অন্ধকার থাকবে প্রায় ছয় মিনিট, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বিরল সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সৌদি স্পেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী-
• আভা অঞ্চলে অন্ধকার থাকবে প্রায় ৬ মিনিট।
• জেদ্দা ও পশ্চিম উপকূলের কিছু এলাকায় থাকবে প্রায় ৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।
তুলনামূলকভাবে বিশ্বের অধিকাংশ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দুই মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়।
যেসব শহরে দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ
সৌদি জ্যোতির্বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী মাজেদ আবু জাহরার মতে, পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে-
• মক্কা
• জেদ্দা
• তায়েফ
• আল-বাহা
• খামিস মুশাইত
• জিজান
• নাজরান
এছাড়াও তুওয়াল, দাহবান, খুলাইস, আল-লিথ, আল-কুনফুদাহ, তানুমা, বারিক, সাবিয়া, সারাত আবিদাহসহ আরও অনেক শহর ও জনপদ এই পূর্ণ গ্রহণের আওতায় থাকবে।
অন্যদিকে রাজধানী রিয়াদ, পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে পূর্ণ গ্রহণ দেখা যাবে না। সেখানে সূর্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চাঁদ ঢেকে দেবে।
কখন শুরু হবে গ্রহণ?
পুরো গ্রহণ প্রক্রিয়া চলবে তিন ঘণ্টারও বেশি সময়।
• প্রথম আংশিক গ্রহণ শুরু: বেলা ১১:৪১ টা (সৌদি সময়)
• পূর্ণ গ্রহণ: দুপুর ১:২১ টা থেকে ১:৪৪ টা
• গ্রহণ শেষ: বিকাল প্রায় ৩টা
প্রধান শহরগুলোর সময়সূচি
জেদ্দা
• আংশিক গ্রহণ: দুপুর ১২:০০টা
• পূর্ণ গ্রহণ: ১:২৫ টা
• শেষ: ২:৪৩ টা
মক্কা
• আংশিক গ্রহণ: ১২:০১ টা
• পূর্ণ গ্রহণ: ১:২৬ টা
• শেষ: ২:৪৪ টা
তায়েফ
• আংশিক গ্রহণ: ১২:০৩ টা
• পূর্ণ গ্রহণ: ১:২৮ টা
• শেষ: ২:৪৫ টা
খামিস মুশাইত
• আংশিক গ্রহণ: ১২:১৩ টা
• পূর্ণ গ্রহণ: ১:৩৭ টা
• শেষ: ২:৫৪ টা
কেমন হবে সেই মুহূর্ত?
পূর্ণ গ্রহণ শুরুর ঠিক আগে দিনের আলো রূপালি আভা ধারণ করবে। ছায়া আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠবে। তারপর হঠাৎ করেই নেমে আসবে অন্ধকার।
দিগন্তে দেখা দেবে গোধূলির মতো পরিবেশ, বাতাস কিছুটা শীতল হবে এবং দিনের আকাশেই ফুটে উঠবে উজ্জ্বল তারা ও গ্রহ।
ঠিক মাঝখানে থাকবে একটি কালো বৃত্তের মতো সূর্য, যার চারপাশে ছড়িয়ে থাকবে সাদা আলোর মুকুট- সূর্যের করোনা। সাধারণ সময়ে সূর্যের তীব্র আলোয় এই করোনা দেখা যায় না; কেবল পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়ই এটি দৃশ্যমান হয়।
কোথায় সবচেয়ে ভালো দেখা যাবে?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা পূর্ণ অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাদের পাথ অব টোটালিটির কেন্দ্ররেখার যতটা সম্ভব কাছাকাছি অবস্থান করা উচিত।
সবচেয়ে উপযুক্ত স্থানগুলো হলো-
• জেদ্দা ও লোহিত সাগরের উপকূল- অধিকাংশ পর্যটকের জন্য এটি সবচেয়ে সহজ বিকল্প। এখানে একটি বড় বিমানবন্দর, প্রচুর হোটেল এবং প্রায় পাঁচ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের অন্ধকার থাকবে। উন্মুক্ত সৈকতগুলো থেকে আকাশের বিস্তৃত ও নির্মল দৃশ্য দেখা যাবে।
• আভা ও খামিস মুশাইতের পার্বত্য এলাকা- রাজ্যের দীর্ঘতম অন্ধকার, প্রায় ছয় মিনিট, থাকবে এখানে। উচ্চতার কারণে সাধারণত বাতাস সেখানকার পরিষ্কার থাকে। তারপরও আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কেননা, আগস্ট মাসে বিকালে পাহাড়ের উপর মেঘ জমতে পারে।
• তায়েফ ও আল-বাহা- পাহাড়ি এই অঞ্চলের আবহাওয়া শীতল। সেখানকার পথের ভেতরে আরামদায়ক পরিবেশ বজায় থাকে। যারা গ্রীষ্মের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে চান, তাদের জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প।
• মরুভূমির খোলা এলাকা- এটি ফটোগ্রাফারদের জন্য আদর্শ স্থান। সেখানে দিগন্তজুড়ে চাঁদের ছায়া অগ্রসর হওয়ার দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাবে।
এ উপলক্ষে জেদ্দা অ্যাস্ট্রোনমি সোসাইটিসহ বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞান সংগঠন বিশেষ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে কী দেখা যাবে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। দুবাইসহ পুরো দেশেই দেখা যাবে আংশিক সূর্যগ্রহণ।
দুবাইয়ে স্থানীয় সময় দুপুর ১:৩৩ টা থেকে ৩:৪৮ টা পর্যন্ত সূর্যের প্রায় ৫৩ শতাংশ চাঁদ ঢেকে ফেলবে। দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে এই হার ৬১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
তবে সেখানে দিনের অন্ধকার, সূর্যের করোনা কিংবা দিনের আকাশে তারা দেখার সুযোগ থাকবে না।
নিরাপদে সূর্যগ্রহণ দেখার নির্দেশনা
সৌদি স্পেস এজেন্সি সতর্ক করে বলেছে, বিশেষ সুরক্ষাচশমা ছাড়া কখনওই সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো যাবে না। এতে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
নিরাপদ পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দেশনাগুলো হলো-
• আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সোলার ইক্লিপস গ্লাস ব্যবহার করতে হবে।
• সাধারণ সানগ্লাস কখনওই যথেষ্ট সুরক্ষা দেয় না।
• ক্ষতিগ্রস্ত বা আঁচড়যুক্ত গ্রহণের চশমা ব্যবহার করা যাবে না।
• সোলার ফিল্টার ছাড়া দূরবীন, টেলিস্কোপ বা ক্যামেরা দিয়ে সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক।
• সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যাওয়ার কয়েক মিনিট ছাড়া বাকি সব সময় সুরক্ষাচশমা পরে থাকতে হবে। সূর্যের আলো ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার চশমা ব্যবহার করতে হবে।
বিরল মহাজাগতিক প্রদর্শনীর অপেক্ষায় বিশ্ব
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৭ সালের ২ আগস্ট সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থান হয়ে উঠবে এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য। গবেষক, আলোকচিত্রী এবং আকাশপ্রেমীদের জন্য এটি হবে এক অসাধারণ সুযোগ, কারণ এত দীর্ঘ সময়ের পূর্ণ সূর্যগ্রহণ এক জায়গা থেকে দেখা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ৭৫ বছরের অপেক্ষার পর সৌদি আরবের আকাশে এই মহাজাগতিক প্রদর্শনী নিঃসন্দেহে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। সূত্র: গালফ নিউজ
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম






















