শুক্রবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৪

জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়ার হিড়িক

পুরো রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দ্বারপ্রান্তে বিদ্রোহীরা

❏ মিয়ানমারের পাসপোর্ট অফিসে পদদলনে নিহত ২ ❏ পুরো রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দ্বারপ্রান্তে বিদ্রোহীরা ❏ ৩ ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে মৃত্যুদণ্ড দিলো জান্তা ❏ গোলাগুলির শব্দে কাঁপছে টেকনাফ

চলমান সংঘাতে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিকরা। বিভিন্ন প্রদেশে সরকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাওয়ায় দেশজুড়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার মিয়ানমারের মান্দালায়ের পাসপোর্ট অফিসে পদদলিত হয়ে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে মিয়ানমারের তিন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধে হারছে জান্তা বাহিনী। ব্রাহারহুড অ্যালায়েন্স একটি বিবৃতি জানিয়েছে, জান্তা বাহিনী একের পর এক সেনা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

বিদ্রোহীদের এ জোট আরও দাবি করেছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছোট ও বড় ক্যাম্পের সেনারা বিদ্রোহীদের কাছে খুব দ্রুতই আত্মসমর্পন করবে। যেসব ক্যাম্পের সেনারা এখনো আত্মসমর্পণ করেনি; তাদের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির (এএ) যোদ্ধারা হামলা অব্যাহত রেখেছে।

ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স আরও জানিয়েছে, জান্তাবাহিনী তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তারা আরাকান আর্মির যোদ্ধাদের অগ্রসর হওয়া ঠেকাতে পথে পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি বেশ কয়েকটি ব্রিজও ধ্বংস করেছে তারা।

বান্দরবানের ঘুমধুম ও তুমব্রুর বিপরীতে মিয়ানমার সীমান্তের ঘাঁটিগুলো এখন আরকান আর্মির দখলে। সেখানে আপাতত গোলাগুলি বন্ধ হলেও এবার টেকনাফের সীমান্তের ওপারে চলছে তুমুল লড়াই। মর্টারশেল ও গোলাগুলির শব্দে ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠছে এপাড়ের ঘরবাড়ি। নিরপাত্তার কারণে শাহপরীর দ্বীপ জেটিতে স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের ভ্রমণে চলাচল বন্ধ রেখেছে বিজিবি। সোমবার সকালেও ভারী গোলার শব্দ পাওয়া গেছে। আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের।

টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, সীমান্তে গোলাগুলিতে নিরাপত্তার কারণে নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপ জেটিতে মানুষের চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আজকেও সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেটি মিয়ানমারের অনেকে ভেতরে। তবে নতুন করে যাতে কেউ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থানে রয়েছি।

অন্যদিকে জান্তাবিরোধী ৩ সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট থ্রি বাদারহুড অ্যালায়েন্সের কাছে আত্মসমর্পণের অভিযোগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৩ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং এক জন কমান্ডারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন সেখানকার সামরিক আদালত। সেনা বাহিনীর সূত্রের বরাত দিয়ে সোমবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি।

সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ঠেকাতে দুই সপ্তাহ আগে মিয়ানমারে সব নাগরিকের সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেয় সামরিক জান্তা। সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে বাঁচতে এরপর দেশটির মানুষের মধ্যে দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। যাদের পাসপোর্ট নেই; তারা পাসপোর্ট অফিসে ভীড় করা শুরু করেন। এমনই সোমবার মান্দালায়ে পাসপোর্ট অফিসে ঢোকার জন্য লাইন ধরেন হাজার হাজার মানুষ। সেখানেই পদদলনের ঘটনা ঘটে।

ইয়াঙ্গুনের এক ভিসা ও পাসপোর্ট এজেন্ট সংবাদমাধ্যম ইরাবতিকে জানিয়েছেন, গত ১০ ফেব্রুয়ারি সামরিক জান্তার এমন ঘোষণার পর বিপুল সংখ্যক মানুষ পাসপোর্ট তৈরির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। মান্দালায়ের এক বাসিন্দা— যিনি পাসপোর্ট অফিসের কাছেই থাকেন— তিনি বলেছেন, প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ পাসপোর্টের জন্য লাইন ধরছেন। কিন্তু দিনে মাত্র ২০০টি আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। জান্তা বাহিনীর এমন ঘোষণার আগে পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি।

অপর এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, পাসপোর্ট অফিসে লাইন ধরার জন্য ছোট একটি জায়গা রয়েছে। কিন্তু সেখানে অনেক মানুষ ভীড় করেন। এরপর ঠেলাঠেলিতে পড়ে গিয়ে দুই নারী পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান। সোমবার রাত ২টার দিকে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়।

স্থানীয় একটি দাতব্য সংস্থা জানিয়েছে, মানুষের চাপাচাপিতে শ্বাস বন্ধ হয়ে তিন নারী জ্ঞান হারান। এরপর তাদের দ্রুত একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যার মধ্যে দুই নারীর মৃত্যু হয়।

নিহত দুজনের মধ্যে একজনের বয়স ৫২; আরেকজনের বয়স ৩৯। আহত অপর নারীর বয়স ৫৩ বছর। তিনি হাসপাতালে এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মান্দালায়ের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ইয়াঙ্গুনে প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ এবং মান্দালায়ে ২০০টি আবেদন নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ পাসপোর্টের আবেদন ফরম পেতে মধ্যরাত থেকে ভীড় করছেন। এছাড়া সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যক্তিও পাসপোর্ট অফিসে লাইনে দাঁড়াতে ভীড় করছেন। তারা আগে থেকে অপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়ান; এরপর সেই স্থানটি অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেন। শুধুমাত্র এই স্থান কেনার জন্য কেউ কেউ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ কিয়াট (মিয়ানমারের মুদ্রা) খরচ করছেন।

সম্পাদক : জোবায়ের আহমেদ