প্রায় তিন বছর আগে বিএনপি নেতা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীনের করা এক মামলায় জামিন পেয়েছেন সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী।
তবে অন্য মামলায় বিচারাধীন থাকায় এখন তার মুক্তির সুযোগ নেই বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন।
চুরি, জমি দখল ও ভাংচুরের মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন, সেই মামলার সময় চিন্ময় দাশ হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নের পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ ও ইসকন চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
ওই এলাকার জমি নিয়ে পুণ্ডরীক ধাম পরিচালনাকারীদের সাথে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন ও তার ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের বিরোধ ছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাখাওয়াত হোসেনের আদালতে ওই মামলায় আসামি চিন্ময় দাশের পক্ষে জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী কৃষ্ণ প্রসাদ শর্মা।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “বাদী পক্ষ ও আসামি পক্ষে শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেছেন।”
জামিন শুনানিতে চিন্ময় দাশ উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
এ মামলায় গত বছর চিন্ময় দাশের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আদালত। তবে বিষয়টি নজরে আসার পর তার পক্ষে আইনজীবী গত ৭ এপ্রিল তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন।
৭ এপ্রিল চিন্ময় দাশের আইনজীবী কৃষ্ণ প্রসাদ শর্মা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, “এতদিন বিষয়টি জানা ছিল না। যেহেতু তিনি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার আছেন তাই আমরা এই মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছি।”
সেদিন শুনানি শেষে গত সপ্তাহে এই মামলায় চিন্ময়কে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেয় আদালত। তারপর বৃহস্পতিবার মামলাটিতে তার জামিনের আবেদন করা হয়।
এ মামলা ছাড়াও রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা, ভাংচুর, পুলিশের উপর হামলাসহ আরো পাঁচটি মামলা আছে চিন্ময় দাশের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে।
বিএনপি নেতা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন ২০২৩ সালের ৪ জুন চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ‘চুরি, জমি দখল ও ভাংচুরের অভিযোগে’ চিন্ময় দাশসহ সাতজনের বিরুদ্ধে এ মামলা দারে করেন।
ওই বছরের ১৮ জুন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পুণ্ডরীক ধাম মন্দিরের ‘লহ্মী জনার্দন সরোবর’ এর জমি দখলের অভিযোগ করেছিল আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)।
সেই সংবাদ সম্মেলন থেকে ইসকন নেতৃবৃন্দ মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন ও তার ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘জমি দখলের’ অভিযোগ তুলেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলাও করেছিল পুন্ডরীক ধাম কর্তৃপক্ষ।
তবে সেসময় ওই অভিযোগ অস্বীকার করে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন দাবি করেছিলেন, যে জমি নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটির মালিকানা ক্রয় সূত্রে তাদের পরিবারের। তিনি পাল্টা দেয়াল ভেঙে ফেলা ও ওই জমিতে থাকা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ করেছিলেন।
পুণ্ডরীক ধামের সেসময়ের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে গড়ে ওঠা সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র হন। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে এসব দাবিতে সমাবেশ হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেন।
পরে ওই মামলায় চিন্ময়কে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামে আনা হয়। জামিন নামঞ্জুর হলে তার অনুসারীদের হট্টগোলের মধ্যে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে সংঘর্ষ হয়। আড়াই ঘণ্টা পর পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে চিন্ময়কে কারাগারে নিয়ে যায়।
বিক্ষোভকারীরা আদালত সড়কে রাখা বেশ কিছু মোটরসাইকেল ও যানবাহন ভাঙচুর করে। এরপর আদালতের সাধারণ আইনজীবী ও কর্মচারীরা মিলে তাদের ধাওয়া করে। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে রঙ্গম কনভেনশন হল সড়কে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ওই ঘটনায় ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন। মামলায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫/১৬ জনকে আসামি করা হয়।
সেদিন আইনজীবীদের ওপর হামলা, বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন আলিফের ভাই খানে আলম, যেখানে ১১৬ জনকে আসামি করা হয়।
এর বাইরে আদালত এলাকায় সংঘর্ষ, ভাংচুর ও পুলিশের কাজে বাধার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি মামলা করে। ওই তিন মামলায় মোট ৭৬ জনের নামসহ অজ্ঞাত ১ হাজার ৪০০ জনকে আসামি করা হয়।
আদালত এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় সবশেষ ৩ ডিসেম্বর মোহাম্মদ উল্লাহ নামের এক ব্যক্তি ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ ২৯ জনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেন।
এরপর ২০২৫ সালের ৫ মে চিন্ময় দাশকে আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তারপর ওই ঘটনায় হওয়া অন্য মামলাগুলোতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেয় আদালত।
সেই থেকে কারাগারে আছেন চিন্ময়। আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলার তদন্ত শেষে পুলিশের অভিযোগপত্রে চিন্ময়কে প্রধান আসামি করা হয়। ইতোমধ্যে সেই হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম


















