বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

‘নিষিদ্ধ’ যে দ্বীপে তেলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে ইরান

‘নিষিদ্ধ’ যে দ্বীপে তেলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে ইরান

পারস্য উপসাগরের গনগনে রোদের নিচে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল প্রতিদিন সমুদ্রের তলার পাইপলাইন দিয়ে ছুটে চলে। এই খার্গ দ্বীপে একসময় দাঁড়িয়ে ইরানের বিখ্যাত লেখক জালাল আল-এ-আহমাদ এটিকে বলেছিলেন ‘পারস্য উপসাগরের এতিম মুক্তো।’


বুশেহর প্রদেশের এই ২২ বর্গকিলোমিটারের প্রবালদ্বীপটি ইরানিদের কাছে পরিচিত ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কড়া পাহারায় এখানে প্রবেশ করতে হলে সরকারি নিরাপত্তা ছাড়পত্র লাগে।


খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং ইরানি মূল ভূখণ্ড থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে এই দ্বীপের মাধ্যমে ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ হয়। প্রতি বছর প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এখান থেকে যায়।


দ্বীপটি মাত্র ৮ কিলোমিটার লম্বা ও ৪-৫ কিলোমিটার চওড়া। তবে গভীর সমুদ্রের কারণে বিশাল সুপারট্যাংকার এখানে সহজে ভিড়তে পারে। এই তেলের বেশিরভাগ যায় এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে।


ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই টার্মিনাল আবুজার, ফুরুজান ও দুরুদ — এই তিনটি বড় অফশোর ক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনে তেল পায়। সেই তেল প্রক্রিয়া করে সংরক্ষণ করা হয় বা বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়।


আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান এই দ্বীপের পরিকাঠামো বাড়াতে থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালের মে মাসে এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল জানিয়েছে, দুটি ট্যাংক সংস্কার করে টার্মিনালের ধারণক্ষমতায় আরও ২০ লাখ ব্যারেল যোগ হয়েছে।


এই দ্বীপের ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু তেলে নয়। হাজার বছর ধরে মানুষ এখানে বাস করে এসেছে। এলামাইট, আকিমিনিড ও সাসানিড যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখানে রয়েছে।


দ্বীপে রয়েছে সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত মির মোহাম্মাদ মাজার। কাছেই আছে মির আরাম মাজার যেখানে ১২ মিটার লম্বা একটি পাথরে ইসলামি লেখা রয়েছে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন এখানে নবী নূহের বংশধর মির আরামের সমাধি আছে।


পুরনো একটি কবরস্থানে জরথুস্ত্রধর্মী, খ্রিষ্টান ও সাসানিড যুগের কবর পাশাপাশি রয়েছে। দ্বীপে ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ডাচ বাগান, খার্গ বাগান, পুরনো রেললাইন ও গুরুত্বপূর্ণ আকিমিনিড শিলালিপি রয়েছে। ৮৫ বাই ১১৬ সেন্টিমিটার এই প্রবালশিলার খোদাই ‘পারস্য উপসাগর’ নামের সবচেয়ে পুরনো নথিগুলোর একটি।


ঔপনিবেশিক যুগে পর্তুগিজরা প্রথম এই দ্বীপ দখল করে। এরপর ডাচরা আসে। ১৭৫২ সালে ডাচ ব্যারন নিফহাউসেন স্থানীয় শাসকের সঙ্গে চুক্তি করে এখানে ব্যবসাকেন্দ্র গড়েন। পরের বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি দুর্গ বানায়। কিন্তু ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে বন্দর রিগের শাসক মির মুহান্না দুর্গ আক্রমণ করে ডাচদের তাড়িয়ে দেন।


বিংশ শতাব্দীতে রেজা শাহ পাহলভি এই দ্বীপকে রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসনস্থলে পরিণত করেন। ১৯৫৮ সালের পর এর আধুনিক তেল যুগ শুরু হয়। ১৯৬০ সালের আগস্টে প্রথম বড় তেল চালান পাঠানো হয়। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে এই দ্বীপে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়। পরে ইরান সরকার তা আবারও গড়ে তোলে।


আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, দ্বীপটি আরও কড়া সামরিক পাহারায় রয়েছে। পর্যটকদের প্রবেশ নেই বলে প্রকৃতিও এখানে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। সুপারট্যাংকারগুলো নীরবে তেল নিয়ে চলে যায়। ‘এতিম মুক্তো’ খার্গ দ্বীপ এভাবেই ইরানের তেলের সাম্রাজ্য আগলে রাখছে।


সূত্র- আল জাজিরা

সম্পাদক : আবদুল মাতিন