বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী না বুঝে সরকারকে কোনও সহযোগিতা করবে না বলে মন্তব্য করেছেন দলটির আমির ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি হলে বিরোধীদলের সংসদীয় দলের এক সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে বিরোধীদলের সব সংসদ সদস্য নিয়ে আমরা বৈঠকে বসেছিলাম। জাতির প্রত্যাশা পূরণে বিরোধীদল হিসেবে এবং নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দেশ ও জাতির জন্য আমাদের ভূমিকা কী হবে, সেই বিষয়েই মূলত আমরা পরামর্শ করেছি।
তিনি বলেন, আমাদের সংসদীয় জোটের নির্বাচিত এমপিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছি। আমরা চাই, জাতীয় সংসদ দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। ইতোমধ্যেই আমরা ঘোষণা করেছি, বিরোধীদল হিসেবে আমরা একটি দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে চাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের সব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবো না আমরা। আবার না বুঝে কোনও সহযোগিতাও করবো না। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকার যে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেসব ক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। তবে, দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়, সরকার এমন পদক্ষেপ নিলে দায়িত্ব অনুযায়ী ভূমিকা পালন করবো।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, প্রথমে আমরা সরকারকে ভুল ধরিয়ে দেবো, সংশোধনের সুযোগ দেবো এবং পরামর্শ দেবো। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে আমরা প্রতিবাদ করবো। প্রতিবাদেও যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াব। আমরা চাই, প্রথম ধাপেই সমস্যার সমাধান হোক। এটি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। যেহেতু তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অনেক কিছু করা সম্ভব। কিন্তু, আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেটিই জাতির জন্য উত্তম হবে।
তিনি আরও বলেন, এই সংসদ হঠাৎ করে গঠিত হয়নি; এটি একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ বহুবার তার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর প্রথমবার ১৯৯১ সালে গঠিত সংসদ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করে। এরপর ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু, অন্য অনেক সংসদ জনগণের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং তাদের নৈতিক বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই নির্বাচন মূলত ২০২৬ সালে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান অনুযায়ী, এটি ২০২৯ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, ২০২৪ সালের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, অসংখ্য শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়েছে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের সংগ্রাম, নির্যাতন, গুম-খুন, কারাবরণ, আয়নাঘর এবং দেশান্তরের মতো বহু কষ্টের বিনিময়ে এ পরিবর্তন এসেছে।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা যেমন ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক বাঁকবদলগুলোকে ধারণ করি, তেমনই ২০২৪ সালের ঘটনাকেও আমরা গভীরভাবে ধারণ করি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরও এ দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারেনি। বারবার স্বৈরশাসন জাতির ঘাড়ে চেপেছে, দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয়েছে এবং মানুষের অধিকার খর্ব হয়েছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেই ফলাফল মেনে নিয়েছি।
শফিকুর রহমান বলেন, এই দুটি নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তারাই আবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কারণেই একই অর্ডিন্যান্সের প্রতি সম্মান রেখে আমরা প্রথম দিন দুটি শপথ গ্রহণ করেছি, প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং পরে সংসদ সদস্য হিসেবে।
তিনি বলেন, জুলাইকে সম্মান করলেই ২০২৪ এর চেতনা বেঁচে থাকবে এবং ২০২৬ অর্থবহ হবে। ২০২৪ এর চেতনাকে অস্বীকার করলে ২০২৬ এর অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আমরা প্রত্যাশা করি সংসদের স্পিকার নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করবেন এবং বিরোধীদলকে যথেষ্ট সুযোগ দেবেন। তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ফুটে উঠবে এবং গণতন্ত্র টেকসই হবে।
সবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি কার্যকর ও টেকসই গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন জামায়াত আমির।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম


















