দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোশেডগুলোয় প্রায় এক মাসের জ্বালানি তেল মজুদ থাকে। তবে বর্তমানে রেলের কাছে যে পরিমাণ মজুদ আছে তা দিয়ে ১৫-২০ দিনের মতো ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।
মজুদ কমে আসায় সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন রেলের কর্মকর্তারা। তবে তারা বলছেন, মজুদ কিছুটা কম থাকলেও ট্রেন পরিচালনায় আপাতত কোনো জ্বালানি তেলের সংকট নেই।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালন কার্যক্রম পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভক্ত। যাত্রী ও পণ্যবাহী মিলে এ অঞ্চলে নিয়মিত ১২৬টি ট্রেন পরিচালনা করা হয়।
পূর্বাচল রেলের তথ্য বলছে, ট্রেনগুলো পরিচালনার জন্য পূর্বাঞ্চলে প্রতি মাসে ২৫ লাখ লিটার হাইস্পিড ডিজেল প্রয়োজন হয়। এ হিসেবে প্রতিদিন জ্বালানি লাগে ৮৩ হাজার লিটার। ট্রেন পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রয়োজনে পূর্বাঞ্চল রেলের নিয়মিত প্রায় এক মাসের জ্বালানি মজুদ থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে পূর্বাঞ্চলের জ্বালানির মজুদ কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ১৫-১৬ দিনের বা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ লিটার ডিজেল মজুদ আছে। তবে কিছুটা অনিয়মিত হলেও বিপিসির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন পূর্বাঞ্চল রেলের কর্মকর্তারা।
ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে গত মঙ্গলবার পূর্বাঞ্চলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ থেকে জ্বালানি সরবরাহকারী তিন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়।
বর্তমানে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন গণমাধ্যমকে বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিলেও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান গণপরিবহন হিসেবে রেলের মধ্যে সংকট নেই। নিয়মিত জ্বালানি পাওয়া গেলেও মজুদ কিছুটা কমে গেছে। এর পরও যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমরা বিপিসির তিন বিতরণ কোম্পানির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। এখনও ১৫-১৬ দিনের ডিজেল মজুদ রয়েছে। আশা করি, রেলের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির কোনো সংকট হবে না।
তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে রেলের পশ্চিমাঞ্চলে প্রতিদিন চলে ১৭১টি যাত্রীবাহী ট্রেন। ট্রেনগুলো পরিচালনার জন্য প্রতিদিন ডিজেল প্রয়োজন প্রায় ৯০ হাজার লিটার। এ অঞ্চলের পাঁচটি লোকোশেডে বর্তমানে তেলের মজুদ আছে প্রায় সাড়ে ১৯ লাখ লিটার, যা দিয়ে ২০ দিনের মতো ট্রেন পরিচালনা করা যাবে। পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি শেডের মধ্যে ঈশ্বরদী লোকোশেডের মোট জ্বালানি ধারণক্ষমতা এবং মজুদ সবচেয়ে বেশি। সেখানে ১২ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে সাড়ে ৬ লাখ লিটার তেল মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী ২৪ দিন কাজ চালানো সম্ভব। পার্বতীপুর লোকোশেডে বর্তমানে আট লাখ লিটারের মতো তেল মজুদ আছে, যা দিয়ে ২৫ দিন ট্রেন পরিচালনা করা যাবে। খুলনা লোকোশেডে চার লাখ লিটারের বেশি তেল মজুদ আছে, যা দিয়ে ট্রেন চলবে প্রায় ২০ দিন। অন্যদিকে রাজশাহী ও লালমনিরহাট লোকোশেডে যথাক্রমে ২৪ হাজার লিটার এবং লালমনিরহাটে প্রায় ৩১ হাজার লিটার তেল মজুদ রয়েছে। উভয় শেডেই এ মজুদ দিয়ে সাতদিন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।
রেলের দুই অঞ্চল মিলিয়ে বছরে ৫০ হাজার টনের মতো জ্বালানি লাগে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেলের জ্বালানি ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেছে। ওই অর্থবছর রেল ইঞ্জিন পরিচালনায় ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৪৫ হাজার ২০৭ টন। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫৯৯ টন ডিজেল রেলের পূর্বাঞ্চলে আর ২৪ হাজার ৬০৮ টন ডিজেল ব্যবহার করে রেলের পশ্চিমাঞ্চল।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা এবং সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট তেল মজুদে কিছু প্রভাব ফেললেও তা ট্রেন পরিচালনার জন্য কোনো বিঘ্ন ঘটাবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন। এ প্রসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে আমাদের কাছে গড়ে ১৫-২০ দিনের ডিজেল মজুদ রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় এ মজুদের পরিমাণ ২০-২৫ দিনের মতো থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ কিছুটা কমায় তা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে ঈদের পর থেকে সরবরাহ পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের যে মজুদ ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে অন্তত ১৫ দিনের রিজার্ভ নিশ্চিত আছে। ফলে ট্রেন পরিচালনায় আপাতত কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম





















