দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন খাতে। ডিজেল সরবরাহে ঘাটতির কারণে সড়কে প্রাইভেটকার, বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাসের চলাচল কমেছে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। এতে রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে অফিস শুরু ও ছুটির সময়ে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে। পণ্য পরিবহন ভাড়া তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। কমেছে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার। নৌযান চলাচল কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে।
রোববার রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেকেই বাস না পেয়ে বিকল্প হিসেবে রিকশা বা রাইড শেয়ারিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ। কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। চালক-শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। অনেকেই বেকার হয়ে গেছেন। দীর্ঘ সময় জ্বালানি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
সকালে পল্টন এলাকায় গাজীপুরের বাসের জন্য অপেক্ষমাণ এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাইফুল ইসলাম বলেন, আগে ৫ থেকে ১০ মিনিটে বাস পেতাম, এখন সেখানে আধা ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় অতিরিক্ত ভাড়াও দিতে হচ্ছে, না হলে বাসে ওঠাই যায় না।
কাকরাইল মোড়ে রামপুরার বাসের জন্য অপেক্ষমাণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, ক্লাসে ঠিক সময়ে পৌঁছানো এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে। বাস কম, আর যেগুলো চলছে সেগুলো এত ভিড় থাকে, ওঠা যায় না।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে পড়েছে দূরপাল্লার পরিবহনেও। দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলো নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম ট্রিপ দিচ্ছে। অনেক পরিবহন সংস্থা সীমিত সংখ্যক ট্রিপ পরিচালনা করছে। ফলে জেলা-জেলা যোগাযোগে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক রুটে বাস ছাড়ার সংখ্যা কমে গেছে। এতে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে টিকিট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা।
শুক্রবার গাবতলীতে রংপুরগামী যাত্রী আব্দুল কাদের বলেন, আগে এক ঘণ্টা পরপর বাস পাওয়া যেত, এখন একটা বাস ধরতেই দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টিকিটের দামও আগের চেয়ে বেশি চাওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সায়েদাবাদে বরিশালগামী যাত্রী শারমিন আক্তার বলেন, জরুরি কাজে বাড়ি যেতে হবে, কিন্তু বাসের সংখ্যা কম। টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক মালিক বাধ্য হয়ে যানবাহন কম চালাচ্ছেন। ডিজেলের সরবরাহ সংকটের কারণে দৈনিক পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে অনেক রুটে ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে দূরপাল্লার ক্ষেত্রে যেখানে জ্বালানি খরচ বেশি।
নীলাচল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাফ উদ্দিন মাসুদ বলেন, জ্বালানি সংকটে গাড়ির ট্রিপ ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ কমেছে ৩০ শতাংশ। আর সিটি পরিবহনে কমেছে ৫০ শতাংশ। তিনি বলেন, আগে একবার তেল নিলেই একটা আসা-যাওয়া মিলে ট্রিপ সম্পন্ন করা যেত। এখন সেখানে দুই থেকে তিনবার তেল নিতে হয়। এতে খরচও বেশি হচ্ছে। সময়ও যাচ্ছে।
প্রভাতী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বুলবুল হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটে ট্রিপ সংখ্যা অর্ধেক হয়েছে।
ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ রুটে চলাচল করা সোনালি পরিবহনের একটি বাস রোববার বিকেল ৩টার দিকে আজিমপুর ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িটির চালক রফিকুল ইসলাম জানান, তারা দুপুর ১টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, এখনও তেল নিতে পারেননি। আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগতে পারে। আগে দিনে চারবার ট্রিপ দিতে পারলেও এখন তা দুবারে নেমে এসেছে।
পণ্য পরিবহন ভাড়া বেড়েছে
জ্বালানি তেলের সরবরাহে টান পড়ায় সারাদেশে পণ্য পরিবহন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া পাঁচ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত বেড়েছে। যেসব ব্যবসায়ীর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, তারা তাও ব্যবহার করতে পারছেন না। ভাড়া গাড়ির সংকটও তীব্র হয়েছে। নিত্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্য– সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত বাজারদরে প্রভাব ফেলবে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম রুটে কাভার্ডভ্যানের ভাড়া তিন গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এবং হান্নান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ১৫ হাজার টাকায় পণ্য পরিবহন সম্ভব ছিল, এখন তা ৪৫-৪৮ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। দাম বাড়লেও পণ্য না পাঠিয়ে উপায় নেই, রপ্তানি আদেশ ধরতে হবে। চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকায় উঠেছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে রপ্তানিমুখী পণ্যের খরচ বাড়ছে।
বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে পাঠাতে ট্রাক ভাড়া ছিল ২৪-২৫ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে ৩৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। সিলেটে পাঠাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা, আগে ছিল ৩০ হাজার টাকা। ঢাকায় পণ্য আনতে এখন গুনতে হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা, আগে ছিল ১৫-১৬ হাজার টাকা। তার পরও ট্রাক পাওয়া মুশকিল।
পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের স্থলবন্দরগুলোতেও। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহন ব্যয় গড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বেড়েছে। চট্টগ্রাম রুটে ১৫ টন পণ্য পরিবহনে আগে গুনতে হতো ২৫ হাজার টাকা ভাড়া। এখন সেখানে গুনতে হচ্ছে ৩০-৩১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ঢাকা রুটে ১৭ হাজার টাকার ভাড়া গুনতে হচ্ছে ২১ হাজার টাকারও বেশি। বেনাপোল স্থলবন্দরেও একই অবস্থা। সেখানে পণ্য ওঠানামা ব্যাহত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, একটি গাড়ির তেল নিতে আট থেকে ১০ ঘণ্টা, কোনো কোনো দিন আরও বেশি সময় লাগছে। আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেখানে ছয়-সাত ঘণ্টা সময় লাগত, এখন ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা লাগছে। কখনও কখনও তা দুই থেকে তিন দিনে গড়াচ্ছে। কারণ পাম্পে সিরিয়াল পেতে সময় গচ্চা যাচ্ছে। এতে চালক-শ্রমিকদের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে গেছে, যা পণ্য পরিবহন ভাড়ায় যুক্ত হচ্ছে।
কমেছে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার চোখে পড়ার মতো কমে গেছে। অনেকেই এখন প্রাইভেটকারের বদলে মেট্রোরেল, বাসসহ গণপরিবহনে চলাচল করছেন। এতে ঢাকার সড়কে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম





















