বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬

রাজধানীতে বাড়ছে কিশোর গ্যাং দৌরাত্ম্য

রাজধানীতে বাড়ছে কিশোর গ্যাং দৌরাত্ম্য

ঢাকা শহরের পাড়া‑মহল্লায় কিশোররা ছিনতাই করছে, চাঁদা তুলছে, মাদক বিক্রি করছে, কখনো কখনো খুন পর্যন্ত করছে; তাদের হাতে চাপাতি, বেলচা, লোহার রড থেকে শুরু করে পিস্তল‑রিভলবারও দেখা যায় এবং এই তরুণদের নাম শুনলেই মানুষ আতঙ্কে পড়ে যায়। গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাংগুলো শুধু সংখ্যায় বাড়েইনি, তাদের অপরাধের মাত্রাও বেড়েছে। এখন রাজধানীর বিভিন্ন থানায় সক্রিয় একশো বিশটির মতো গ্যাংয়ের কথা বলা হচ্ছে এবং সারাদেশে এই সংখ্যা কয়েকশোর ঘরে পৌঁছেছে- মোট সদস্যের সংখ্যা আনুমানিক পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। এই কিশোরদের অধিকাংশই ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে; পড়ার টেবিলে বসার কথা তাদের, কিন্তু তারা রাস্তায়, অন্ধকারে, অপরাধের জগতে ঢুকে পড়েছে।

জানা যায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হলে গ্যাংগুলো দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে। সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয় ও হিরোইজমের ভাবনা কিশোরদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে; তারা নিজেদের ‘হিরো’ হিসেবে দেখতে চায়, শক্তি প্রদর্শন করে সম্মান পেতে চায়- এটাই অপরাধে পরিণত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও তেজগাঁওয়ের মতো এলাকায় এই সমস্যা সবচেয়ে তীব্র; মোহাম্মদপুর‑আদাবর এলাকায় সন্ধ্যার পর দৃশ্যপট বদলে যায়, পথরোধ, ছিনতাই ও অস্ত্রধারী হামলার ঘটনা বাড়ে, গত এক বছরে সেখানে অন্তত তিনজন খুন এবং পনেরো জনের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন- স্থানীয়রা এখন রাতে বাইরে বের হতে ভয় পায়। ব্যবসায়ীরা বারবার চাঁদাবাজির শিকার; এক পর্যায়ে তারা থানা ঘেরাও করে প্রতিবাদও করেছে; অভিযোগ আছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় কিশোররা প্রতিদিন দোকান ও কারখানা থেকে চাঁদা তুলছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে ভেঙে দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সূত্র জানায়, গত এক বছরে হাজারের বেশি গ্রেফতার হয়েছে; বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী কিশোর গ্যাং শনাক্তকরণ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করার কাজ করছে; মোহাম্মদপুরে বিশেষ নজরদারি, টহল ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে; গ্রেফতারকৃতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়- তারা বলছে, কিশোরদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন, পরিবারিক সমর্থন ও সামাজিক পুনর্গঠন প্রয়োজন।

গ্রেফতারকৃতরা জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে লিপ্ত হলে পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়; পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধী চক্র অব্যাহত থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্বাসন বেশি কার্যকর; তাদের সুপারিশগুলো হলো- পুনর্বাসন কেন্দ্র ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ চালু করা, পরিবারিক সমর্থন ও কাউন্সেলিং, স্কুলে ফেরানো ও ভোকেশনাল ট্রেনিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে কিশোরদের যুক্ত করা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা এবং পৃষ্ঠপোষকদের আইনি দায় নিশ্চিত করা। তারা মনে করেন, কিশোররা এখনও পরিবর্তনশীল; সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ দিলে তারা সমাজে ফিরে আসতে পারে।

রাষ্ট্রের করণীয়ও বহুমুখী- পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, জামিন‑প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি যেখানে প্রয়োজন, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা, মাদক সরবরাহ চেইন ভাঙতে সমন্বিত অভিযান, স্থানীয় সমন্বয় কমিটি গঠন এবং কিশোর অপরাধের ডেটা সংগ্রহ ও মনিটরিং সিস্টেম চালু করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের মানসিক অবস্থা বোঝা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং স্কুল‑শিক্ষার প্রতি উৎসাহ দেয়া; স্কুলগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শনাক্ত করে অতিরিক্ত সহায়তা ও পরামর্শ দিতে পারে; স্থানীয় ইমাম, শিক্ষক ও মুরুব্বিরা যদি সক্রিয়ভাবে কাজ করে চাঁদাবাজি ও অপরাধ প্রতিরোধে সোচ্চার হন, তাহলে গ্যাংগুলোর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। তবে বাস্তবতা কঠিন- অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা নিজেই কিশোরদের আশ্রয় দেয় বা তাদের ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে; এই চক্র ভাঙতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়‑প্রশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

সম্পাদক : আবদুল মাতিন