গরম বাড়লে শুধু অস্বস্তিই বাড়ে না, হৃদযন্ত্রকেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়। হৃদস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললে সাধারণত ব্যায়াম, কোলেস্টেরল বা ধূমপানের বিষয় সামনে আসে। কিন্তু আবহাওয়ার তাপমাত্রাও হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এ বিষয়টি অনেকেরই জানা নেই।
শরীর সবসময় নিজের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। গরমের সময় এ কাজটি আরো কঠিন হয়ে যায়। শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের করে দিতে হৃদযন্ত্রকে ত্বকের দিকে বেশি রক্ত পাঠাতে হয়। একইসঙ্গে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণ না হলে রক্তের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং তখন হৃদযন্ত্রকে আরো বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
ভারতের নয়ডার কৈলাশ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এস. কে. আগারওয়ালের মতে, গরমের সময় শরীর থেকে বেশি পানি ও লবণ বের হয়ে যাওয়ায় হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এ সময় অনেকেই বেশি প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, যেগুলোতে সাধারণত সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে। তার মতে, পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন মিলিয়ে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কাজ করতে হয়।
তবে ভালো খবর হলো, কিছু স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শুধু পানি খেলেই হবে না, শরীরকে রাখতে হবে আর্দ্র
অনেকেই তৃষ্ণা পেলে তবেই পানি পান করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা সবসময় শরীরের পানির চাহিদার সঠিক সংকেত দেয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, পানিশূন্যতা হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। তাই গরমের দিনে নিয়মিত পানি ও অন্যান্য তরল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
শরীরে পানির ঘাটতি হলে রক্তের পরিমাণ কমে যায়। ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দিতে হৃদ্যন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হয়। এ কারণে তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে সারাদিন অল্প অল্প করে পানি পান করা ভালো।
তরমুজ, শসা, টমেটো, কমলা, বাঙ্গি ও স্ট্রবেরির মতো পানিসমৃদ্ধ ফল ও সবজিও শরীরকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এগুলো প্রয়োজনীয় পুষ্টিও জোগায়।
মৌসুমি ফল ও সবজি হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী
গরমের মৌসুমে বাজারে নানা ধরনের ফল ও সবজি পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাবার শুধু সুস্বাদুই নয়, হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। তাজা ফল ও সবজিতে থাকা পটাশিয়াম, আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তনালি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের প্রদাহ কমায়। বিশেষ করে পটাশিয়াম শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
ডা. আগারওয়ালের মতে, বেরি, পিচ, বিভিন্ন ধরনের তরমুজ, শাকসবজি, বেল পেপার ও টমেটোর মতো মৌসুমি খাবারে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
প্রোটিনের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ
প্রোটিন খাওয়া জরুরি, তবে সেটি কোন উৎস থেকে আসছে, তা আরো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও চর্বিযুক্ত লাল মাংসে বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও সোডিয়াম থাকে। অন্যদিকে মাছ, ডাল, ছোলা, শিম, টোফু ও কম চর্বিযুক্ত দুধজাত খাবার হৃদস্বাস্থ্যের জন্য তুলনামূলক ভালো।
প্রোটিন শক্তি জোগানো ও পেশি ঠিক রাখতে সাহায্য করলেও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য স্বাস্থ্যকর উৎস থেকে প্রোটিন নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে চামড়াবিহীন মুরগির মাংস, মাছ, ডাল ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার ভালো বিকল্প হতে পারে।
অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলুন
গরমের দিনে অনেকেই চিপস, ফাস্টফুড বা প্যাকেটজাত খাবার খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এসব খাবারে সাধারণত সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। আর উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। গরমের সময় মানুষ সহজে পাওয়া যায় এমন খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এসব খাবারে অনেক সময় অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে, যা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
সব চর্বি ক্ষতিকর নয়
একসময় মনে করা হতো সব ধরনের চর্বিই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে এখন গবেষণা বলছে, চর্বির ধরনটাই আসল বিষয়।
অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, বাদাম ও বিভিন্ন বীজে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অন্যদিকে ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মিষ্টি খাবার খেতে পারেন, তবে পরিমিত
আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয় বা স্মুদি গরমের দিনের জনপ্রিয় খাবার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এসব খাবারে অনেক সময় অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি থাকে। বিকল্প হিসেবে তাজা ফলের সরবত, ফ্রোজেন ইয়োগার্ট বা ফলের স্মুদি বেছে নেওয়া যেতে পারে।
সহজ খাবারই হতে পারে সবচেয়ে ভালো
গরমের কারণে অনেকেই দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে থাকতে চান না। এতে অনেক সময় অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝোঁক বাড়ে। এ সময় কম রান্নার বা সহজে তৈরি করা যায় এমন স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো। যেমন—ডাল বা কুইনোয়া দিয়ে সালাদ, ঠান্ডা স্যুপ কিংবা হালকা গ্রিল করা মাছ ও সবজি।
এ মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পান, মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়া, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও ভালো চর্বি বেছে নেওয়া এবং লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় উপকার এনে দিতে পারে। এসব অভ্যাস মেনে চললে গরমের সময়ও হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখা সম্ভব।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























